চারদিক
জনশক্তি আছে, কর্মসংস্থান নেই
এম. রশিদ আলী
প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৪
| প্রিন্ট সংস্করণ
উত্তরাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রামে শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির হার বাড়লেও সে অনুপাতে তৈরি হয়নি কর্মসংস্থান। ফলে জেলার হাজার হাজার কর্মক্ষম যুবক এখন বেকারত্বের অভিশাপ নিয়ে জীবন যাপন করছে। অনেকে কাজের সন্ধানে পাড়ি জমাচ্ছে রাজধানীসহ দূরদূরান্তের শহরগুলোতে।
বিগত কয়েক বছরে কুড়িগ্রামে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে বেশ কিছু কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে উঠেছে। কম্পিউটার অপারেটিং, ইলেকট্রনিক্স, সেলাই, গবাদি পশু, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণের সংখ্যা এখন উল্লেখ করার মতো। কিন্তু জেলায় কোনো বৃহৎ শিল্পকারখানা বা বিসিক শিল্প নগরীর কার্যকর প্রসার না হওয়ায় এই দক্ষতাকে কাজে লাগানোর সুযোগ পাচ্ছে না প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহ স্থানীয়রা।
কুড়িগ্রামের স্থানীয় উদ্যোক্তারা নিজ উদ্যোগে কিছু করতে চাইলেও বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে পুঁজি এবং বাজারজাতকরণ। আলো ছায়া যুব ফাউন্ডেশন কর্তৃক চিলমারীতে টেলারিং
নকশিকাঁথা, পুঁতির কাজসহ নানা আয়মুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে চরের নারীদের দক্ষতা বৃদ্ধির কাজ করছি। কিন্তু এদের কর্মসংস্থান অথবা উৎপাদিত পণ্য বাজারজাতকরণের সুযোগ কুড়িগ্রামে না থাকায় আমরা হতাশ হয়ে পড়ছি।
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কুড়িগ্রামে বিভিন্ন ট্রেডে এ পর্যন্ত ৯৯,৮৩৬ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। কিন্তু তাদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত বা এই বিশাল জনশক্তির কুড়িগ্রামে পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র নেই। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে।
এই জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা, দুধকুমারসহ ১৬টি নদনদীর ভাঙনে প্রতিবছর অসংখ্য পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। এ ছাড়া বন্যায় কৃষিজমি ও ফসল নষ্ট হওয়া এখানকার মানুষের বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ। বছরের পর বছর নদীভাঙন; শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ সংতট; বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে আসা স্থানীয়দের দাবি, স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, স্থায়ী চরের ব্যবস্থা, সঠিক নদী খনন ও দীর্ঘমেয়াদি নদী শাসন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কৃষক ও জেলেদের স্থায়ী কর্মসংস্থান করা।
জেলা শহরের পাশেই ধরলা ব্যারাজ নির্মিত হলে কর্মসংস্থানসহ এই এলাকার মানুষের বিনোদনের চাহিদা পূরণ হবে। ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমার– চারটি নদনদীর বাঁধ স্থায়ীভাবে নির্মাণ সম্পন্ন হলে কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য দূর হবে।
কুড়িগ্রামে কৃষিভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা বড় কোনো কলকারখানা নেই বলে প্রতিবছর বিপুল সংখ্যক মানুষ ঢাকা, চট্টগ্রাম বা সিলেটে পোশাকশিল্প ও নির্মাণকাজে যোগ দিতে বাধ্য হন। এই বিশাল দক্ষ জনশক্তিকে যদি কাজে লাগানো যেত, তবে এ অঞ্চলের দারিদ্র্য বিমোচন আরও দ্রুত হতো।
তাই নাগরিক সমাজের দাবি, কুড়িগ্রামে কৃষিপণ্যভিত্তিক কলকারখানা স্থাপন, নিরাপদে প্রবাসে যাওয়া এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে পারলে একসময় দারিদ্র্যপীড়িত কুড়িগ্রাম থেকে উন্নত কুড়িগ্রাম হবে।
এখন পর্যন্ত কুড়িগ্রাম থেকে প্রবাসীর সংখ্যা ৫৫,৬৪০। স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হওয়ায় বিদেশে কাজের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোই এখানকার দক্ষ জনশক্তির জন্য প্রধান উপায় হতে পারে।
কুড়িগ্রামের দারিদ্র্য বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তা ছাড়াও বেসরকারিভাবে কুড়িগ্রামে দ্রুত ফ্যাক্টরি স্থাপনের কাজ চলছে। সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সেখানে কর্মসংস্থান হতে পারে। কুড়িগ্রামের প্রতি সরকারের বিশেষ নজর দিতে হবে। এখানকার জনশক্তির কর্মসংস্থান করতে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া এবং এলাকার চাহিদা অনুযায়ী শিল্পকারখানা তৈরি হলে কেবল কুড়িগ্রাম নয়, এখানকার মানুষ পুরো দেশের সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এম. রশিদ আলী: চেয়ারম্যান, গ্রিন ভিলেজ ফাউন্ডেশন, কুড়িগ্রাম
- বিষয় :
- চারদিক