ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা

দুর্যোগ ও দুর্ভোগের দুষ্টচক্র

দুর্যোগ ও দুর্ভোগের দুষ্টচক্র
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা লইয়া বাগাড়ম্বর ও কর্ম কোনোটাই কম হয় নাই। প্রকল্পের নামে অর্থের পর অর্থ ঢালা হইয়াছে, কিন্তু জলাবদ্ধতা দূরীভূত হয় নাই। চলতি বৎসরের ৩০ এপ্রিল চট্টগ্রাম নগরের বিভিন্ন খাল ও জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা পরিদর্শন শেষে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রের উপস্থিতিতে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ৭০ হইতে ৮০ শতাংশ জলাবদ্ধতা থাকিবে না। বাস্তবে তাহার দুই মাস পর আসিয়া মঙ্গলবারের বৃষ্টিতে তলিয়া গিয়াছে নগরের বেশির ভাগ এলাকা। ডুবন্ত সড়কে যানবাহন চলাচল করিতে না পারায় চরম ভোগান্তিতে পড়িয়াছেন জনসাধারণ। নগরবাসীর প্রশ্ন, জলাবদ্ধতা নিরসনে হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন এইরূপ অবস্থা?

চট্টগ্রামে মঙ্গলবারের ৪৩ বৎসরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি এমন সময়ে হইয়াছে, যখন সেইখানে জলাবদ্ধতা নিরসনে সোয়া ১৪ হাজার কোটি টাকার চারটি মেগা প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে। প্রকল্পগুলোর অধীনে খাল-নালা সংস্কার, স্লুইসগেট, সিল্ট ট্র্যাপ, পাম্পহাউস, সাবস্টেশন, সড়ক ও ফুটপাত নির্মাণ করা হইয়াছে। সেইগুলি যদিও সম্পূর্ণ চালু হয় নাই, প্রশ্ন অসংগত নহে, প্রকল্পগুলি জলাবদ্ধতা নিরসনে কতটা সহায়ক হইবে? চট্টগ্রামে একাধিক কর্তৃপক্ষ থাকায় সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রকল্পভিত্তিক খণ্ডিত পরিকল্পনা, কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহির অভাব স্পষ্ট। চট্টগ্রাম উন্নয়ন করপোরশন-সিডিএ, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সমান্তরাল কাজ করিলেও উহাদের মধ্যে সমন্বয় না থাকিবার কারণে নগরবাসী দুর্ভোগ পোহাইতেছে।

সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মঙ্গলবারের বৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় রেলপথ ডুবিয়া যায়। সেইখানে বৈরী আবহাওয়ায় সংগত কারণেই উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। সমকাল অনলাইনের খবর, বুধবারও চট্টগ্রামে বৃষ্টি হইতেছে। টানা বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরীর নিম্নাঞ্চল যদ্রূপ ডুবিয়াছে, তদ্রূপ বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটেও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরপানি। জলাবদ্ধতায় চলাচলের পাশাপাশি রান্নাবান্না ব্যাহত হওয়ায় খাদ্য সংকটে পড়িয়াছেন বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা। এমনকি নিচু এলাকায় টয়লেট পানিতে তলাইয়া যাওয়ায় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও অচল হইয়া পড়িয়াছে। জলাবদ্ধতায় শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগে সেইখানে চরমে। 

চট্টগ্রামে আরও কয়েক দিন বৃষ্টি থাকিবে বলিয়া আবহাওয়া অধিদপ্তরের তরফ হইতে বলা হইয়াছে। ফলে সেইখানকার পরিস্থিতির আরও অবনতি হইতে পারে। স্বস্তির বিষয় হইল, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন টিমসহ সেনাবাহিনীর ২০টি দল কাজ করিতেছে। ভারী বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ভূমিধসের শঙ্কা জানাইয়া আবহাওয়া অফিস থেকে সতর্কবার্তা জারি করা হইয়াছে। চট্টগ্রামে ভূমিধসের উল্লেখযোগ্য খবর না আসিলেও কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধস হইয়াছে এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই প্রাণ হারাইয়াছেন।
আমরা জানি, জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হলো খাল ও নালা দখল, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। এই ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি নগরের দ্রুত সম্প্রসারণও কম দায়ী নহে। সম্প্রসারণের পাশাপাশি সেই অনুপাতে ড্রেনেজ অবকাঠামোর উন্নয়ন না হইবার কারণে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হইলে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের সুযোগ থাকে না।

চট্টগ্রাম দেশের অর্থনীতির প্রবেশদ্বার হিসাবে এইখানে বারংবার জলাবদ্ধতা কেবল স্থানীয় সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির জন্যও বড় ঝুঁকি। এইভাবে প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি মানিয়া লওয়া যায় না। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, শীঘ্রই প্রকল্পগুলি শেষ হইবার মাধ্যমে জনদুর্ভোগ লাঘব হইবে। কিন্তু প্রকল্পগুলি হইতে সফলতা পাইতে হইলে সমন্বিতভাবে সেইগুলির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। উহা না হইলে প্রতি বৎসর বর্ষা আসিবে, আর চট্টগ্রামের মানুষকে একই দুর্ভোগের বৃত্তে আটকাইয়া থাকিতে হইবে। সদিচ্ছা থাকিলে দুর্যোগ ও দুর্ভোগের দুষ্টচক্র ভাঙা কঠিন নহে।
 

আরও পড়ুন

×