ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ডে আরও দুই শিশুর প্রাণহানি

রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড় ধসে ৭ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মৃত্যু

ভূমিধসের সময় ওই মাদ্রাসা ও হেফজখানার ভেতর ৩০ জনের বেশি ছাত্রী ছিল

রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড় ধসে ৭ শিক্ষার্থী ও শিক্ষকের মৃত্যু
×

উখিয়ায় গতকাল বুধবার পাহাড় ধসে চাপা পড়া মাদ্রাসায় উদ্ধার তৎপরতা -সমকাল

সমকাল ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৪৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

টানা বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের তিনটি পৃথক পাহাড় ধসে ৯ শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বুধবার এসব দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে প্রাণ ঝরেছে একটি মাদ্রাসার সাত শিশু শিক্ষার্থী ও এক শিক্ষকের। চট্টগ্রাম ও সীতাকুণ্ডে মারা গেছে দুই শিশু। স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

উখিয়ার ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে উখিয়ার আশ্রয়শিবিরে ওই দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলে ৪ জন, ক্যাম্প-৩ এর জিকে হাসপাতালে ২ জন, ক্যাম্প-৬ এর আইআরসি হাসপাতালে ১ জন এবং ক্যাম্প-৫ এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ১ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

তাদের মধ্যে চার শিশুর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলো ক্যাম্প-৫ এর এ-১১ ব্লকের হাশিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), ক্যাম্প-৩ এর এফ-১ ব্লকের আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে উম্মে নেজাতুল (১৩) ও তার বোন উম্মে সালমা (১২) এবং ক্যাম্প-৫ এর এ-৮ ব্লকের মোহাম্মদ ইলিয়াসের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)।

আহত তিন শিশু-কিশোরীর পরিচয় জানা গেছে। তারা হলো ক্যাম্প-৩ এর বাসিন্দা দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা (৯), নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫), ক্যাম্প-৫ এর বাসিন্দা বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)। অন্য দুজনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

প্রত্যক্ষদর্শী রোহিঙ্গা একে মোহাম্মদ সাদেক জানান, ঘটনাস্থলে মেয়েদের একটি মাদ্রাসা এবং তার ওপরে একটি মক্তব ছিল। মাটি ভরাট করে মাদ্রাসাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের অংশবিশেষ ধসে পড়ে। এতে চাপা পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটে।

ওই ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা (মাঝি) দিল মোহাম্মদ বলেন, ভূমিধসের সময় ওই মাদ্রাসা ও হেফজখানার ভেতর ৩০ জনের বেশি ছাত্রী ছিল। ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা পৌঁছানোর আগেই স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধারকাজ শুরু করেন। 

রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ১৪ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) অধিনায়ক (অতিরিক্ত ডিআইজি) মোহাম্মদ সিরাজ আমীন বলেন, ক্যাম্প-৫ এর ইরানি পাহাড় এলাকায় অবস্থিত খদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ে। ঘটনাস্থল থেকে সাত ছাত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া আহত আরও কয়েকজনকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।  
এর আগে রোববার রাতে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড় ধসে আট রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে একই পরিবারের কয়েকজন সদস্য ছিলেন। আহত হন বেশ কয়েকজন।

চট্টগ্রামে মৃত্যু দুই শিশুর
চট্টগ্রাম নগরের পাঁচলাইশ থানার চশমা পাহাড় এলাকার পাহাড়ধসে মাটিচাপা পড়ে সুমাইয়া (১২) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল দুপুর দেড়টার দিকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা তার লাশ উদ্ধার করেন। সুমাইয়া নগরের চশমা পাহাড় এলাকার বাসিন্দা ফারুক হোসেনের মেয়ে। 

এদিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুরের বাগানবাড়ির ৬ নম্বর সমাজ এলাকায় গতকাল সকাল ৯টার দিকে পাহাড় ধসে ১০ মাসের এক শিশুর মৃত্যু হয়। তার নাম আশরাফুল ইসলাম। একই ঘটনায় শিশুটির মা লামিয়া আক্তার মাটিচাপা পড়ে আহত হয়েছেন। আশরাফুল ইসলাম সলিমপুরের বাগানবাড়ি এলাকার মঈন উদ্দিনের ছেলে।

চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক শাহ ইমরান বলেন, ফায়ার সার্ভিসের একটি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। তারা সুমাইয়া নামে একটি শিশুর মরদেহ উদ্ধার করে। দুর্ঘটনার সময় ঘরে থাকা সুমাইয়ার মা-বাবা বের হয়ে যেতে সক্ষম হন। তবে পাশের কক্ষে থাকা সুমাইয়া মাটিচাপা পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। 

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফখরুল ইসলাম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের ছিন্নমূলের ৬ নম্বর সমাজে পাহাড় ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শিশুটির মায়ের চিকিৎসার জন্য ২৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। গত চার দিন ধরে সীতাকুণ্ডে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড়ধসের আশঙ্কায়  উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাইকিং করা হয়। তবে এখনও অনেক বাসিন্দা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রশাসন। 

ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এখানে এসে দেখেছি, পাহাড় কাটা হয়েছে। পাহাড়টি স্বাভাবিকভাবে থাকার কথা থাকলেও সেটি কেটে প্রায় খাড়া করে ফেলা হয়েছে। এর ফলে পুরো এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু আইন করলেই হবে না; আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।’

রাউজানে স্রোতের টানে শিশুর মৃত্যু
চট্টগ্রামের রাউজানে পানির নালার স্রোতে ভেসে গিয়ে মোহাম্মদ মোস্তাকিম নামে ৩ বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বিকেলে রাউজান উপজেলার ডাবুয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। শিশু মোস্তাকিম ওই এলাকার মোহাম্মদ পারভেজ হোসেনের বড় ছেলে। 

স্থানীয় লোকজন ও পরিবারের সদস্যরা জানান, মোস্তাকিমের দাদা আনোয়ার হোসেন স্থানীয় দোকানে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয়েছিলেন। শিশুটি সবার অগোচরে দাদার পিছু নিয়েছিল। এক পর্যায়ে পা পিছলে সে নালায় পড়ে বৃষ্টির পানির স্রোতে ভেসে যায়। পরে কৃষিজমির হাঁটুজলে গিয়ে পড়ে। সেখানে ডুবে মৃত্যু হয় তার। 
ডাবুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ইয়াছমিন আকতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

নরসিংদীতে দেয়াল ধসে শিশুর মৃত্যু
নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় টানা ভারী বর্ষণে মাটির ঘরের দেয়াল ধসে তানঝুমা নামে আট বছরের এক ছাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল মাইজপাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। তানঝুমা ওই গ্রামের আপেল মিয়ার মেয়ে। সে মাইজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণিতে পড়ত।

খাট থেকে পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু
ময়মনসিংহ নগরীতে ভারী বর্ষণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে আট মাসের এক শিশু। গতকাল সকালে নগরীর ব্রাহ্মপল্লী এলাকায় এ  ঘটনা ঘটে।
শিশুটির নাম আয়াস। সে স্থানীয় বাসিন্দা আবির মিয়ার ছেলে। 

স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, আবির মিয়ার বসতঘরের মেঝেতে বৃষ্টির পানি ওঠে। গতকাল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে শিশু আয়াস তার মায়ের সঙ্গে খাটে ঘুমাচ্ছিল। এক পর্যায়ে সে খাট থেকে গড়িয়ে মেঝেতে পড়ে যায়। সেখানে ডুবে মৃত্যু হয় তার।

বিষয়টি সমকালকে নিশ্চিত করেছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) আশরাফুল করিম। 

[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ, সীতাকুণ্ড ও রাউজান এবং কক্সবাজার ও টেকনাফ প্রতিনিধি]
 

আরও পড়ুন

×