ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

আন্তর্জাতিক

মার্ক্সের ভূত এবং ট্রাম্পের আতঙ্ক

মার্ক্সের ভূত এবং ট্রাম্পের আতঙ্ক
×

আখতার সোবহান মাসরুর

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩৫

| প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জনের ২৫০ বছর উদযাপন উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ডাকোটার মাউন্ট রাশমোরে ৪ জুলাই স্বাধীনতা দিবসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর ভাষণে জাতীয় ঐক্যের দিনকে মতাদর্শগত বিদ্বেষ ও নির্বাচনী প্রচারণার মঞ্চে পরিণত করেছেন। ট্রাম্পের ভাষণে ‘কমিউনিস্ট হুমকি’, ‘মার্ক্সিস্ট’, ‘নবাগত’ ও ‘আমেরিকার শত্রু’– এসব শব্দের ব্যবহার একটি রাজনৈতিক আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। তাঁর ভাষণের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক ছিল রাজনৈতিক বিরোধীদের কমিউনিস্ট ও শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা। বিরোধী মতকে দেশের শত্রু ও অপরাধে পরিণত করা। 
১৮৪৮ সালে মার্ক্স তাঁর কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে বলেন, ‘ইউরোপ ভূত দেখেছে– কমিউনিজমের ভূত।’ কমিউনিজমের এই ভূত একুশ শতকেও ট্রাম্পকে পর্যন্ত তাড়া করে ফিরছে। শীতল যুদ্ধের সমাপ্তি ও বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর অনেকেই ঘোষণা করেছিলেন– মার্ক্সবাদ শেষ হয়ে গেছে; উদার পুঁজিবাদই ইতিহাসের চূড়ান্ত বিজয়। মার্কিন রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসে কমিউনিজম কোনো বাস্তব শত্রু নয়; ট্রাম্পের ফ্যান্টাসিমূলক ‍নির্মাণ। তিনি সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব সমস্যার সমাধান না করে একটি কল্পিত শত্রু তৈরি করেছেন। স্বাস্থ্যসেবা সংকট, আবাসন সমস্যা, বেকারত্ব, ন্যূনতম মজুরি, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি জরুরি প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে কেন কমিউনিজম জাতীয় দিবসের প্রধান আক্রমণের বিষয় হয়ে উঠল? 

ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমাদের দেশে আবার কমিউনিস্ট হুমকির পুনরুত্থান ঘটেছে’… ‘কমিউনিজম… প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিংবা ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের চেয়ে বড় হুমকি। ...সর্বোপরি এটি ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাইয়ের শত্রু,... হয় তুমি মার্ক্সবাদী নয়তো দেশপ্রেমিক হতে পারো– তুমি দুটো একসঙ্গে হতে পারো না।’ এই বক্তব্য গণতান্ত্রিক বহুত্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী মতপ্রকাশ, চিন্তা, রাজনৈতিক সংগঠন ও আদর্শগত স্বাধীনতাকে সুরক্ষা দেয়। একজন নাগরিক মার্ক্স, অ্যাডাম স্মিথ কিংবা অন্য যে কোনো চিন্তাবিদ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারেন। এটি তাঁর সাংবিধানিক অধিকার। রাষ্ট্রের কাজ কোনো নির্দিষ্ট মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়া নয়; বরং মতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।

ট্রাম্প আমেরিকায় ‘নবাগত অভিবাসীদের’ কমিউনিজমের সম্ভাব্য বাহক হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এটি অভিবাসনবিরোধী জাতীয়তাবাদের পরিচিত কৌশল, যেখানে অর্থনৈতিক বৈষম্য, কর্মসংস্থানের সংকট বা সামাজিক অসন্তোষের প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণের পরিবর্তে দোষ চাপানো হয় অভিবাসীদের ওপর। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ শত্রু নির্মাণ প্রায়ই বর্ণবাদ, বিদেশ-বিদ্বেষ এবং গণতান্ত্রিক অধিকারের সংকোচনের পথ প্রশস্ত করে। ট্রাম্পের বক্তব্য বহুত্ববাদী ধারণার পরিবর্তে দেশপ্রেমকে একটি একমাত্রিক রাজনৈতিক আনুগত্যে সীমাবদ্ধ করেছে।

বিশ শতকের পঞ্চাশের দশকে ম্যাকার্থিবাদের সময়ে ‘কমিউনিস্ট’ ট্যাগিং দেওয়ার ফলে হাজার হাজার মানুষ চাকরিচ্যুত, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ও রাষ্ট্রের নজরদারির শিকার হয়েছিল। আজকের প্রেক্ষাপটে মার্কিন মুলুকে ‘মার্ক্সিস্ট’ শব্দকে প্রায় একটি রাজনৈতিক অপবাদে পরিণত করা করেছে, যার লক্ষ্য নির্দিষ্ট কোনো অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা নয়; বরং বিরোধী কণ্ঠকে শত্রুরূপে চিহ্নিতকরণ ও বিপজ্জনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। 

জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি প্রায়ই জনগণ বনাম শত্রু– এ দুই বিপরীত দ্বিত্ব নির্মাণের মাধ্যমে নিজের সমর্থন সংগঠিত করে। ট্রাম্পের ভাষণে সেই একই কৌশল স্পষ্ট। এখানে তিনি ‘সত্যিকারের আমেরিকান’ জনগণের বিপরীতে দাঁড় করিয়েছেন ‘কমিউনিস্ট’, ‘মার্ক্সিস্ট’, ‘নবাগত’ ও ‘আমেরিকার শত্রু’দের। ফলে তিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নাগরিক ধারণা থেকে সরে গিয়ে বর্জনমূলক রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি করতে চেয়েছেন।

সমকালীন জাতীয় পরিচয়বাদী রাজনীতি উপনিবেশবাদ, আদিবাসী উচ্ছেদ, ভূমি দখল, দাস প্রথাকে ইতিহাস থেকে বাদ দিতে চায়। ট্রাম্প যখন বলেন, ‘যারা আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে মার্ক্সবাদী মিথ্যা প্রচার করে; আমাদের শিশুদের বলে যে আমরা চুরি করা জমির ওপর বাস করি…’– এ কথা কি একেবারে মিথ্যা? দেশের ইতিহাস ও পরিচয়ের মধ্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ, তাদের জমি দখল কি হয়নি? দাস প্রথা ও বর্ণবাদী আইনের ইতিহাস জাতীয় গৌরবের আড়ালে কি লুকিয়ে ফেলা হবে?   

ট্রাম্পের ভাষণে বহুত্ববাদী গণতন্ত্র নয়; বরং দেশপ্রেমকে শত্রু নির্মাণের অস্ত্রে পরিণত করা হয়েছে। তাঁর ভাষা বিভাজন ও কর্তৃত্ববাদী জাতীয়তাবাদের ভাষা। এই ভাষণে জনগণকে বর্ণবাদী পরিচয়ের ভিত্তিতে আরও বিভক্ত করবে। ভাষণে চরম ডানপন্থি জাতীয়তাবাদী আধিপত্য নির্মাণের চেষ্টা করা হয়েছে।

ঢাকায় স্থানীয় মার্কিন দূতাবাস দিবসটি পালন করেছে। এতে যোগ দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি ও বিএনপি। জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে বিতর্ক উঠেছে। কেবল সংসদের বাইরেই নয়; সংসদের ভেতরেও মার্কিনের পক্ষে ককাস অব আমেরিকা গঠন করা হয়েছে। জামায়েতের আমির অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পরীক্ষিত বন্ধু।’ ক্ষমতার সঙ্গে পুরোনো বন্ধুত্বেরও নবায়ন হচ্ছে। জনগণ ইতিহাসের অভিজ্ঞতা থেকে জানে, মার্কিনের সঙ্গে কবে আমাদের কী ধরনের বন্ধু ছিল।

ড. আখতার সোবহান মাসরুর: 
সাবেক ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন

×