ঢাকা শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬

চট্টগ্রামে এনআইডি জালিয়াতি

সংঘবদ্ধ অপরাধ, রেহাই পেতেও ইসির ১৭ কর্মচারী একজোট

সংঘবদ্ধ অপরাধ, রেহাই পেতেও ইসির ১৭ কর্মচারী একজোট
×

 আহমেদ কুতুব, চট্টগ্রাম 

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৯ | আপডেট: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ১০:২৩

| প্রিন্ট সংস্করণ

জালিয়াতির মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) তৈরি করে টাকার বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের সরবরাহের ঘটনায় নির্বাচন কমিশনের (ইসি) ১৭ কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা হয়। একে একে গ্রেপ্তারও হন সবাই। তাদের ব্যাংক হিসাবে লাখ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পায় দুর্নীতি তদন্ত কমিশন (দুদক)। তদন্তে উঠে আসে ইসির বরখাস্ত অফিস সহায়ক জয়নাল আবেদীনের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধভাবে অপরাধে জড়ান তারা। 

এনআইডি জালিয়াতি, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও ডিজিটাল প্রতারণার মামলা থেকে রেহাই পেতে আবার তারা একজোট হয়েছেন। বরখাস্ত ১৭ ইসি কর্মচারী একযোগে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করেছেন। আবেদনগুলো গ্রহণ করে গত ২১ জুন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক মতামতের জন্য চট্টগ্রাম মহানগর পিপিকে চিঠিও দিয়েছেন। 

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ১৭ আসামির ৩২টি আবেদনে যোগাযোগের জন্য শুধু জয়নালের নিজের একটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। দেশের ভিন্ন ভিন্ন এলাকার বাসিন্দা, আলাদা আসামি, আলাদা আবেদন হলেও সব নথিতে জয়নালের একটি মোবাইল ফোন নম্বর ব্যবহার নিয়ে রহস্য দানা বেঁধেছে। সত্যিই তারা রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার, নাকি এনআইডি জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধ থেকে বাঁচতে রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের সুযোগকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। 

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ মাহবুবুল হক বলেন, ‘সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের সুযোগ দেওয়ার পর অনেকেই আবেদন করছেন। এনআইডি জালিয়াতি মামলার ৩২টি আবেদন গ্রহণ করেছি কিনা, এ মুহূর্তে বলতে পারছি না।’

চট্টগ্রাম মহানগর পিপি মফিজুল হক ভূঁইয়া বলেন, ‘অনেকগুলো মামলার বিষয়ে মতামত চেয়ে আমার দপ্তরে জেলা প্রশাসন থেকে চিঠি এসেছে। এখনও কোনো মামলার মতামত দেওয়া হয়নি।’ 

প্রধান অভিযুক্ত জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘বিএনপি করতাম, তাই আমাদের সবাইকে ষড়যন্ত্র করে মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। আমরা কেউ এনআইডি জালিয়াতিতে জড়িত নই। দুর্নীতি করিনি, অবৈধ সম্পদের মালিকও হইনি।’ 

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, ‘রোঙ্গিহাদের বাংলাদেশি নাগরিক করার ঘটনাটি বড় ধরনের অপরাধ। যারা জড়িত তারা যদি পার পেয়ে যায়, তাহলে রাষ্ট্রে দুর্নীতি প্রতিরোধ কঠিন হবে।’ 

কার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ
২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইসির বরখাস্ত ১৭ কর্মচারীর বিরুদ্ধে এনআইডি জালিয়াতিসহ গুরুতর অপরাধে পাঁচটি মামলা হয়। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মামলা থেকে রেহাই পেতে তদবিরে নামেন ৩২ আসামি। এদের মূলহোতা জয়নাল আবেদীনের বিরুদ্ধে এনআইডি জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিং ও ডিজিটাল আইনের পাঁচটি মামলা প্রত্যাহারে নিজে আবেদন করেন। এ ছাড়া তাঁর স্ত্রী আনিছুম নাহারের বিরুদ্ধে থাকা এনআইডি জালিয়াতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানি লন্ডারিংসহ তিনটি, টেকনিক্যাল এক্সপার্ট সত্য সুন্দর দে, বিজয় দাশ, মো. জাফর ও সীমা দাশের বিরুদ্ধে এনআইডি জালিয়াতি ও মানি লন্ডারিংয়ের দুটি মামলা, অস্থায়ী ডেটা এন্ট্রি অপারেটর মোস্তফা ফারুক, মোহাম্মদ জাহেদ, শাহানুর মিয়া, মো. শাহীন ও পাভেল বড়ুয়ার বিরুদ্ধে থাকা এনআইডি জালিয়াতি ও প্রতারণার দুটি করে মামলা, অফিস সহায়ক সাগর চৌধুরী, বয়ান উদ্দিন, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, নাজিম উদ্দিন, আবুল খায়ের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে এনআইডি জালিয়াতি এবং অস্থায়ী অফিস সহায়ক ঋষিকেশ দাশের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিংয়ের মামলা প্রত্যাহার চেয়ে তারা একযোগে আবেদন করেন। 

রহস্যঘেরা ৩২ আবেদন 
প্রধান অভিযুক্ত জয়নালের বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে। আরেক আসামি সত্য সুন্দর দে’র বাড়ি রাঙামাটি সদরে। এভাবে ১৭ আসামির একেকজনের বাড়ি ভিন্ন ভিন্ন এলাকায় হলেও সবাই একজোট হয়ে মামলা থেকে বাঁচতে ৩২টি আবেদন করেন। এক আবেদনকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চাকরি করার সময় জয়নালের নেতৃত্বে আমরা কাজ করতাম। এখন চাকরি ফেরত পেতে তাঁর নেতৃত্বেই সবাই একসঙ্গে আবেদন করেছি। সবার সুবিধার জন্য আবেদনে তাঁর মোবাইল ফোন নম্বরটি ব্যবহার করেছি। আমি রাজনীতি না করলেও বিএনপির সমর্থক।’ 

জয়নালের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
এনআইডি জালিয়াতি মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জয়নাল আবেদীন নিজে এক হাজার ৮৪০ রোহিঙ্গাকে এনআইডি করিয়ে দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। জবানবন্দিতে জয়নাল বলেন, ‘মোস্তফা ফারুকের মাধ্যমে ৩০০ জন, সত্য সুন্দরের মাধ্যমে দেড় হাজার, নাজিমের মাধ্যমে ৪০ রোহিঙ্গাকে ভোটার করিয়েছি। জনপ্রতি ভোটার করার জন্য পাঁচ হাজার টাকা করে পেতাম।’ 
 

আরও পড়ুন

×