ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা

ঝরে পড়ার শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সংকট

ঝরে পড়ার শিক্ষা ও কর্মসংস্থান সংকট
×

মাহফুজুর রহমান মানিক

মাহফুজুর রহমান মানিক

প্রকাশ: ০৮ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৩২

| প্রিন্ট সংস্করণ

নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম থেকে শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ঝরে পড়ে। কিন্তু এর স্পষ্ট চিত্র ধরা পড়ে পাবলিক পরীক্ষার সময়। যেমন, সম্প্রতি শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ৩৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী অংশই নেয়নি। দুই বছর আগে এসএসসি পাস করার পর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি হয়েছিল প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী, যাদের মধ্যে এবারের পরীক্ষার জন্য সাড়ে ৯ লাখ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছে। এখানে সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী যেমন আগেই ঝরে পড়েছে, তেমনি অনুষ্ঠিত তিনটি পরীক্ষার প্রতিদিন অনুপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ছে। প্রথম দিন অনুপস্থিত ছিল ২৪ হাজার ৭৮৪; দ্বিতীয় দিন ২৭ হাজার ৩২৭ এবং তৃতীয় দিন ৩৩ হাজার ১২৯ জন। এভাবে শেষ পর্যন্ত কতজন ঝরে পড়ে, সেটি দেখার বিষয়।

ঝরে পড়ার প্রকৃত চিত্র বুঝতে হলে অবশ্য দেখতে হবে দুই বছর আগে এসএসসিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর মধ্যে দুই বছর পর কত শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। ২০২৪ সালের ১২ মে প্রকাশিত এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৩.০৪ শতাংশ, যেখানে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৬ লাখ ৭২ হাজার। এর মধ্যে ১৪ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমান পর্যায়ে ভর্তি হওয়ার মানে তখনই ১ লাখ ৮১ হাজার শিক্ষার্থী ঝরে গেছে। সাড়ে পাঁচ লাখের সঙ্গে এ হিসাব ধরলে ঝরে পড়া সাত লাখ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিনের অনুপস্থিতির হিসাবও যোগ করা যেতে পারে।

এইচএসসি পর্যায়ে এ বছরের ঝরে পড়ার হার সত্যিই উদ্বেগজনক। সংগত কারণেই বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমেও চলছে আলোচনা-সমালোচনা। শিক্ষামন্ত্রী একে ‘খারাপ’ সূচক বললেও সেটি পরিস্থিতি বোঝানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বস্তুত ঝরে পড়া প্রতিরোধের ক্ষেত্রে প্রথম জরুরি হলো প্রকৃত সংখ্যা জানা। এরপর কারণ বের করা এবং সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া। 
ঝরে পড়ার হার প্রাথমিক, মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত আলাদা করে হিসাব করা দরকার, যাতে স্তর অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ২০১০ সালের দিকে প্রাথমিকে ঝরে পড়ার হার উদ্বেগজনক পর্যায়ে ছিল। তখন ৩৯ শতাংশ থেকে ধীরে ধীরে কমে ২০২৩ সালে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত নেমে আসে। এরপর আবার বাড়তি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ২০২৪ সালে ১৬ শতাংশে পৌঁছে। তার মানে, সরকারকে প্রতিটি স্তরের ঝরে পড়াদের নিয়েই চিন্তা করতে হবে।

এবারের এইচএসসির চিত্র আমলে নিয়ে প্রথমেই কারণ খুঁজতে হবে। আমরা এখনও ভাসা ভাসা কিছু কারণ জানি। যেমন বিয়ে হয়ে যাওয়া, আর্থিক অসচ্ছলতা, কাজে ঢুকে যাওয়া ইত্যাদি। নিশ্চয় এসব কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা মাঝপথে থেমে যায়। তারপরও আমরা জানি না, কত শতাংশের কোন কারণে পড়াশোনা থেমে গেছে। সে জন্য গবেষণা জরুরি। সরকারি উদ্যোগে শিক্ষা বোর্ডগুলো যেমন এই গবেষণা পরিচালনা করতে পারে, তেমনি বেসরকারি উদ্যোগেও জেলা বা উপজেলাভিত্তিক গবেষণা করলেও গবেষণার বাস্তব কারণ জানা যেতে পারে। সেই গবেষণার ফল ধরে সরকার ঝরে পড়া প্রতিরোধে পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সেগুলো টেকসই হতে পারে।

তবে শিক্ষা বোর্ডগুলোর জন্য এখন জরুরি, যে ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষার নিবন্ধ করেনি এবং যারা প্রতিদিন অনুপস্থিত থাকছে সেসব শিক্ষার্থীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করা। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট ছকে তথ্য চাওয়া দরকার যে, তাদের শিক্ষার্থী কে কোন কারণে পরীক্ষা দিচ্ছে না। গত বছর এসএসসি পরীক্ষায় অনুপস্থিত শিক্ষার্থীদের নিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড এ ধরনের একটা উদ্যোগের সূচনা করেছিল। যদিও তারা ৬ হাজারের বেশি পরীক্ষার্থী থেকে ১ হাজার ৩৫০ জনের তথ্য নিতে সক্ষম হয়। তাতেও যেসব কারণ উঠে আসে সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ। যেমন প্রায় ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যও কারণ হিসেবে উঠে আসে। তার মানে, এখানে বাল্যবিবাহ সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে। এর বাইরেও অনেক কারণ থাকতে পারে। বিশেষ করে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় দুর্বলতা ইত্যাদি কারণও স্পষ্টভাবে উঠে আসা দরকার। 

এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় শিক্ষার্থী ঝরে পড়লে তাদের পরবর্তী শিক্ষা কিংবা প্রশিক্ষণ এবং কর্মসংস্থানের চিন্তা সরকারকে করতেই হবে। দুঃখজনক হলেও সত্য, সবচেয়ে সম্ভাবনাময় মানবসম্পদ তরুণদেরই আমরা কাজে লাগাতে পারছি না। পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ৪১ শতাংশ তরুণ নিষ্ক্রিয়। কাজ কিংবা শিক্ষা; কোথাও নেই তারা। এমনকি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা-আইএলও বলছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক শ্রমবাজারের বাইরে। কোনো রকম কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে নেই ৩০ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ। এবারের ঝরে পড়ার চিত্র এ সংখ্যাটি আরও বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সরকার ইতোমধ্যে শিক্ষায় নতুন নতুন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। কিন্তু শিক্ষার পুরোনো সংকটের সমাধান অগ্রাধিকার স্পষ্ট নয়। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন যেমন জরুরি, তেমনি ঝরে পড়া প্রতিরোধ এবং শিক্ষার বাইরে থাকা তরুণদের প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে ব্যবস্থা নিতে হবে।

মাহফুজুর রহমান মানিক: 
জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
[email protected]
 

আরও পড়ুন

×