উদয়ের পথে শুনি কার বাণী...
আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ-সমকাল
অমরেশ রায়
প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ১৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৫:৪৭
একাত্তরের ডিসেম্বরে হত্যাযজ্ঞের শিকার বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা এখনও নিরূপণ করা যায়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তথ্য রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে ঠিক কতজন বুদ্ধিজীবী শহীদ হয়েছেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য কোথাও নেই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসেও তাই জানা যায়নি, ঠিক কতজন বুদ্ধিজীবী দেশমাতৃকার মুক্তিসংগ্রামে প্রাণ দিয়েছিলেন।
তবে চলতি বছরই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত যাচাই-বাছাই কমিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে গতকাল রোববার থেকে।
এ বিষয়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, একটু বিলম্বে হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করা গেছে। আশা করছি, এবার নির্ভুল ও গ্রহণযোগ্য একটি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে। আগামী বছর ২৬ মার্চের মধ্যে তালিকার কাজ শেষ হতে পারে বলে মন্ত্রী জানিয়েছেন।
এমন প্রেক্ষাপটেই আবার এসেছে ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। বিজয়ের ঊষালগ্নে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর দুঃসহ যন্ত্রণার দিন। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের শেষলগ্নে বাঙালি যখন চূড়ান্ত বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই একাত্তরের আজকের দিনে এদেশীয় নরঘাতক রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা মেতে ওঠে দেশের বুদ্ধিজীবীদের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে। বিজয়ের চূড়ান্ত মুহূর্তে বাঙালি মেধার সে নৃশংস নিধনযজ্ঞ আনন্দোন্মুখ জাতিসহ গোটা বিশ্বকেই হতবিহ্বল করে দেয়।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ এবং স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পৃথক বাণী দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি বাণীতে বলেছেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রেখে যাওয়া আদর্শ ও পথকে অনুসরণ করতে হবে। অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাভিত্তিক সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়তে পারলেই তাদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
প্রধানমন্ত্রী বাণীতে বলেন, '২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়ে আওয়ামী লীগ সরকার বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় এনেছে। বিচারের রায় কার্যকর করা হচ্ছে। এই কুখ্যাত মানবতাবিরোধীদের যারা রক্ষার চেষ্টা করছে, তাদেরও একদিন বিচার হবে। এসব রায় বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মা শান্তি পাবে। দেশ ও জাতি কলঙ্কমুক্ত হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ জাতি চিরদিন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।'
বুদ্ধিজীবী হত্যা: পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মাত্র দু'দিন আগে ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর রাতের অন্ধকারে কেবল ঢাকা শহরেই প্রায় দেড়শ বুদ্ধিজীবী ও বিভিন্ন পেশার কৃতী মানুষকে চোখ বেঁধে অপহরণ করে নিয়ে যায়।
পরদিন সকালে ঢাকার মিরপুরের ডোবা-নালা ও রায়েরবাজার ইটখোলায় বিক্ষিপ্তভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায় বুদ্ধিজীবীদের নিথর দেহ। কারও শরীর বুলেটবিদ্ধ, কারও বা অমানুষিক নির্যাতনে ক্ষতবিক্ষত। হাত পেছনে বেঁধে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নাড়িভুঁড়িও বের করে ফেলা হয়েছিল অনেকেরই।
বাঙালি জাতির দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামে এসব বুদ্ধিজীবী নিজেদের মেধা, মনন ও লেখনীর মাধ্যমে স্বাধীনতার সংগঠকদের প্রেরণা জুগিয়েছেন। দেখিয়েছেন মুক্তির পথ। গোটা জাতিকেও উদ্দীপ্ত করেছেন অধিকার আদায়ের সংগ্রামে।
১৪ ডিসেম্বরকে বুদ্ধিজীবীদের নিধনযজ্ঞের শিকারের দিন হিসেবে স্মরণ করা হলেও মূলত ১০ ডিসেম্বর থেকেই ইতিহাসের এ ঘৃণ্যতম অপকর্মের সূচনা হয়। সপ্তাহজুড়ে এদের তালিকায় একে একে উঠে আসে অসংখ্য বুদ্ধিদীপ্ত সাহসী মানুষের নাম। পরে কৃতী এসব বুদ্ধিজীবীর তালিকাই তুলে দেওয়া হয়েছিল তৎকালীন জামায়াতে ইসলামীর সশস্ত্র ক্যাডার গ্রুপ কুখ্যাত আলবদর ও আলশামস বাহিনীর হাতে। নেপথ্যে ছিল পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী। মূলত ১০ ডিসেম্বর থেকেই রাতের আঁধারে তালিকাভুক্ত বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে চোখ বেঁধে রায়েরবাজার এবং মিরপুর বধ্যভূমিতে নিয়ে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা শুরু হয়। আর এ অপকর্মের চূড়ান্ত নীলনকশারই বাস্তবায়ন ঘটে ১৪ ডিসেম্বর।
প্রকৃত সংখ্যার অনুসন্ধান: বাংলাপিডিয়ায় শহীদ বুদ্ধিজীবীদের যে সংখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে, সে অনুযায়ী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে ছিলেন ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী এবং ১৬ জন শিল্পী-সাহিত্যিক-প্রকৌশলী।
১৯৭২ সালে জাতীয়ভাবে প্রকাশিত বুদ্ধিজীবী দিবসের সংকলন, পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক নিউজ ম্যাগাজিন 'নিউজ উইক'-এর সাংবাদিক নিকোলাস টমালিনের এক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংখ্যা মোট এক হাজার ৭০ জন।
১৯৭১-এর ২৯ ডিসেম্বর গঠিত বুদ্ধিজীবী তদন্ত কমিটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, 'রাও ফরমান আলী এদেশের বিশ হাজার বুদ্ধিজীবীকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু এই পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যাযজ্ঞ চালানো সম্ভব হয়নি। ফরমান আলীর টার্গেট ছিল শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের গভর্নর হাউসে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে হত্যা করা।'
১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার থেকে নির্মিত 'বাংলাদেশ' নামক প্রামাণ্যচিত্রে বলা হয়, 'স্বাধীনতা যুদ্ধে ৬৩৭ জন প্রাইমারি স্কুলশিক্ষক, ২৭০ জন সেকেন্ডারি স্কুলশিক্ষক এবং ৫৯ জন কলেজ শিক্ষক শহীদ হয়েছেন।' এ ছাড়া বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৮৮ সাল থেকে 'স্মৃতি '৭১' নামে একটি সিরিজগ্রন্থের ১০টি খে ২৩৮ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতিমূলক বিবরণ প্রকাশ করা হয়।
এই অবস্থায় শহীদ বুদ্ধিজীবীর সঠিক সংখ্যা নিরূপণে গত ১৯ নভেম্বর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ১১ সদস্যের যাচাই-বাছাই কমিটি গঠন করা হয়েছে। গবেষক, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটি গতকাল রোববার প্রথমবারের মতো বৈঠক করে এই কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে।
কবে নাগাদ এ তালিকা প্রকাশের চিন্তাভাবনা রয়েছে- এমন প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, আগামী ২৬ মার্চের মধ্যে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় কাজ করেছে। সেই হিসেবে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের তালিকা প্রণয়নের লক্ষ্য আমরা সেটাই নির্ধারণ করেছি। তবে তালিকা প্রকাশের পরও যদি দালিলিক তথ্য-উপাত্তে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নাম পাওয়া যায় তাহলে সেটি যুক্ত করা হবে।
পালিত হচ্ছে ভিন্ন আবহে: বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে এবারের শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হবে ভিন্ন আবহে। সব কর্মসূচিতেই থাকবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা বিধি ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার তাগিদ। বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞের মর্মন্তুদ যন্ত্রার স্মৃতি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্মৃতিস্তম্ভে নিবেদন করা হবে শ্রদ্ধার্ঘ্য। দেশের সর্বত্র জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে। শোকের প্রতীক কালো পতাকাও উড়বে।
দেশব্যাপী বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন গৃহীত কর্মসূচিতে রয়েছে শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল, আলোচনা সভা, গান, আবৃত্তি, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্বেচ্ছায় রক্তদান, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা প্রভৃতি।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে সকাল ৭টা ৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে তাদের সামরিক সচিবরা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্য ও মুক্তিযোদ্ধারা শ্রদ্ধা জানাবেন। রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধেও অনুরূপ শ্রদ্ধা নিবেদন অনুষ্ঠিত হবে।
আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে রয়েছে- সূর্যোদয়ের ক্ষণে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও বঙ্গবন্ধু ভবনসহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, সকাল ৯টায় মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ, সাড়ে ৯টায় বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতি এবং ১০টায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন।
বিএনপি কালো পতাকা উত্তোলন, জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করবে।
এ ছাড়া বাম গণতান্ত্রিক জোট, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, গণফোরাম, বাংলাদেশ জাসদ, ন্যাপ, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, বাসদ (মার্ক্সবাদী), মহানগর আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুব মহিলা লীগ, ছাত্রলীগ, তাঁতী লীগ, মৎস্যজীবী লীগ, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ '৭১, বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) ও আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তানসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে।