ঢাকা সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

দলিতদের জীবনের বাঁকে বাঁকে লাঞ্ছনা

দলিতদের জীবনের বাঁকে বাঁকে লাঞ্ছনা
×

সাজিদা ইসলাম পারুল

প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:০৯ | আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৯ | ১৫:৪৮

২০১০ সাল। শীতের রাত। সন্তানের জন্য খাবার কিনতে গিয়েছিলেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বোনারপাড়ার হরিজনপল্লির বাসিন্দা রাজেশ বাঁশফোড়। খাবার দোকানের কর্মচারী তাকে ঠান্ডা রুটি দিলে তিনি গরম রুটি দেওয়ার আরজি জানান। কর্মচারী তখন তাকে রুটি ঠান্ডা, না গরম তা ছুঁয়ে দেখতে বলেন। রাজেশ হাতের দুই আঙুল দিয়ে রুটি ছোঁয়ামাত্র তার ওপর নেমে আসে বর্বরতা। রাজেশ এ প্রতিবেদককে বলেন, 'ওই রাতে খাবার ছোঁয়ার অপরাধে বাজারের সবাই আমাকে মারধর করে।' তখন হরিজনপল্লির সবাইকে নিয়ে বোনারপাড়া পুলিশ ফাঁড়িতে গেলে সেখানকার কর্মকর্তা তার অভিযোগ আমলে নেননি। বলেন, চেয়ারম্যানের কাছে যেতে। পরের দিন চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েও ওই ঘটনার বিচার পাননি রাজেশ। বগুড়ার চকসূত্রাপুর চামড়াগুদাম হরিজন কলোনি। প্রায় ১০০টি খুপরি ঘরে পাঁচ শতাধিক মানুষের বসবাস। একেকটা ঘরে ছয় থেকে ১০ জন অমানবিকভাবে বাস করে। কিন্তু অন্য কোথায় বা যাবে? ব্রিটিশ আমলে ভারতের বিভিন্ন জায়গা থেকে এনে পৌরসভা, হাসপাতাল ও রেলওয়েতে পরিচ্ছন্ন কাজে যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, বংশানুক্রমে তাদের সংখ্যা বেড়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে নতুন নিয়োগও বেড়েছে। অথচ বাড়েনি আবাসন। স্থানীয় না হওয়ায় তাদের যাওয়ার অন্য জায়গাও নেই। পল্লির বাসিন্দা দিলীপ কুমার হরিজন সমকালকে জানান, এ পল্লির বেশিরভাগ মানুষ অন্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে মিশতে পারে না। শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য ব্যাপক। বিভিন্ন এনজিও প্রকল্প অনুযায়ী যতদিন পল্লিতে এসে শিক্ষা দেয়, ততটুকুই অর্জন।

এরপর আর এখানকার শিশুরা স্কুলে যেতে পারে না।

তিনি বলেন, 'এখনও অস্পৃশ্য বলে সামাজিক বৈষম্যের শিকার হতে হয় হরিজনদের। হরিজন বলে হোটেলে, দোকানে কাজ পায় না। সবাই ঘেন্না করে আমাদের। ফলে এখানকার বেশিরভাগ কিশোর অপরাধমূলক কাজ বিশেষত, মাদক সেবন ও বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে।'

হরিজনপল্লির রাজেশ কিংবা দিলীপের মতো বাংলাদেশে অন্য যেসব দলিত সম্প্রদায়ের বসবাস বিশেষ করে ঋষি, কায়পুত্র (যারা মাঠে শূকর চরান), বাল্মীকি (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), কলু, বীন, মালা (চা শ্রমিক), ধোপা, শীল (নাপিত), রবিদাস, বাগদি, বাওয়ালি, বাঁশফোড়, ডোম (লাশ সৎকারকারী) তারাও বৈষম্যের শিকার। বাংলাদেশে এমন সুবিধাবঞ্চিত দলিতদের সংখ্যা ৩৫ থেকে ৫৫ লাখ। কারও কারও হিসাবে আরও কম। তাদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা না থাকায় তারা অনেক সরকারি সেবা ও উন্নয়ন পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন না। বিশ্বায়নের এ যুগেও তারা সমাজবিচ্ছিন্ন, হতদরিদ্র এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক সুরক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত।

কলোনি ছাড়লেও 'জাতে' উঠতে পারেননি তারা: গাইবান্ধা শহরের মাস্টারপাড়ার মাতৃসদন এলাকায় দলিত জনগোষ্ঠীর একটি কলোনি রয়েছে। নাম 'সুইপার কলোনি' হলেও সেখানকার সবাই এখন আর পরিচ্ছন্নতাকর্মী নন। অনেকেই পৈতৃক পেশা ছেড়ে অন্য কিছু করার চেষ্টা করছেন। তাদের মধ্যে একটি পরিবার ছিল একেবারেই আলাদা। স্বামী-স্ত্রী দু'জনই রেলওয়েসহ দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। তাদের দুই ছেলে ও এক মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। তারা এখন চাকরি করছেন বেসরকারি বিভিন্ন প্র্রতিষ্ঠানে। দুই ছেলেই এক সময় স্থানীয় একটি নাট্য সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এত কিছুর পরও তাদের প্রতি পরিচিতজনদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। তাদের 'অচ্ছুৎ' মনে করতেন প্রায় সবাই। তারা যে গ্লাসে পানি পান করেছেন, সেই গ্লাস আর কেউ ব্যবহার করতে চাইত না। পরিচিতজনদের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে চা খেতে গেলেও বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হতো। একপর্যায়ে তারা গাইবান্ধার সুইপার কলোনি ছেড়ে চলে যান লালমনিরহাটে। সেখানে জমি কিনে বাড়ি করে বসবাস শুরু করেন। একটাই আশা, সেখানে কেউ তাদের পরিচয় জানবে না। তারা সমাজের আর দশজনের মতো মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারবেন। তবে তাতেও খুব একটা সুফল মেলেনি। ধীরে ধীরে পরিচিতজনদের মাধ্যমে তাদের পরিচয় জেনে যান নতুন প্রতিবেশীরা। শুরু হয় ঘৃণার দৃষ্টিতে দেখা ও এড়িয়ে চলার সেই চিরাচরিত পরিস্থিতি।

সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, দেশে বর্তমান দারিদ্র্যের হার ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে দলিতদের মধ্যে এই হার প্রায় ৯০ শতাংশ। এ জনগোষ্ঠী শিক্ষার অধিকার, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আবাসন সংকট, খাদ্য ও পুষ্টিমানের ঘাটতি, প্রজনন স্বাস্থ্য, বাল্যবিয়ে, বহুবিয়ে, মাদকসহ নানা আর্থ-সামাজিক সংকটে আবর্তিত। উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলোতে তাদের জন্য কোনো অগ্রাধিকারভিত্তিক পরিকল্পনা নেই। অন্যদিকে, সংখ্যায় কম হওয়ায় রাজনীতির মঞ্চেও তাদের দাবিদাওয়াগুলো জোরেশোরে উঠে আসে না।

'বৈষম্য বিলোপ আইন'-এর খসড়া তৈরির উদ্যোগ: ২০০২ সালে জয়পুরহাটে রবিদাস সম্প্রদায়ের একজন আইনজীবী তার সম্প্রদায়ের কয়েকজনকে নিয়ে আইনজীবীদের ক্যাফেটেরিয়ায় খাওয়ার সময় যেসব গ্লাস ও থালাবাসন ব্যবহার করেছিলেন, সেগুলো পরে ওই আইনজীবীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় এবং তাকে মূল্য পরিশোধ করতে বলা হয়। কারণ, অন্য আইনজীবীরা এসব থালাবাসন ব্যবহার করবেন না। এর পরিপ্রেক্ষিতে পরবর্তী সময়ে কয়েক তরুণ আইনজীবীসহ তৎকালীন মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বীরগঞ্জে যান একটি গবেষণা করতে। সেখানে তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন তারা। সে সময় বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যে আইন কমিশন, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, এনজিও ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মিলে একটি শক্তিশালী আইন করার উদ্যোগ নেন। সেই উদ্যোগের জেরে কয়েকটি পরামর্শ সভার পর আইন কমিশন অনগ্রসর নাগরিকের অধিকার সুরক্ষা, সমান সুযোগ ও পূর্ণ অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে ২০১৪ সালের ২৯ এপ্রিল আইন কমিশন 'বৈষম্য বিলোপ আইন' প্রণয়নে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠায়। এর তিন বছর পর ২০১৮ সালের শুরুতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনও 'বৈষম্য বিলোপ আইন' প্রণয়নের সুপারিশ করে।

এ প্রসঙ্গে সাংবাদিক সৈয়দ বোরহান কবীর বলেন, দলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর শক্তি অর্জনের জন্য এ আইন প্রণয়ন জরুরি। আইনটি হলে আন্তর্জাতিক মহলেও বাংলাদেশ সম্মান অর্জন করবে। দলিত ও সমতলের আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কর্মরত উন্নয়ন সংস্থা হেকস/ইপার বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অনীক আসাদ বলেন, 'আইন প্রণয়নের পাশাপাশি সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে মূলধারার মানুষের মনোজগতেও বৈষম্যবিরোধী মনোভাব তৈরি করতে হবে।'

বৈষম্য বিলোপ আইন প্রণয়নে আইন কমিশন সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানোর পাঁচ বছরেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আইন কমিশনের পাঠানো খসড়া সুপারিশে বলা হয়, ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, শারীরিক, মানসিক, লিঙ্গ প্রতিবন্ধীসহ সব ধরনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বৈষম্যমূলক কাজ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে। 'বৈষম্য বিলোপ বিশেষ আদালত' স্থাপন করা করবে। বৈষম্যের শিকার যে কোনো ব্যক্তি প্রতিকার চেয়ে এ আদালতে মামলা করতে পারবেন। মামলার তারিখ থেকে ৬০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বৈষম্যমূলক মামলার তদন্তকারী সংস্থা হিসেবে কাজ করতে পারবে।

এ প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, 'সরকার সব নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এর জন্য যা যা দরকার, সবই করা হবে। অনগ্রসর নাগরিকদের প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপে আইন করার একটি দাবি রয়েছে নানা মহল থেকে। যত দ্রুত সম্ভব এ নিয়ে কাজ করবে আইন মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।'

আরও পড়ুন

×