ঢাকা শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

বিহঙ্গ কথা

পদ্মায় ছোট কালোপিঠ গঙ্গাকৈতরের দেখা

পদ্মায় ছোট কালোপিঠ গঙ্গাকৈতরের দেখা
×

রাজশাহীতে উড়ন্ত ছোট কালোপিঠ গঙ্গাকৈতর- লেখক

ড. আ ন ম আমিনুর রহমান

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:২৫

শীতের পরিযায়ী পাখির খোঁজে পক্ষী আলোকচিত্রী আফজালকে নিয়ে রাজশাহী পুলিশ লাইনের বটতলা ঘাট থেকে নুরু মাঝির নৌকায় পদ্মার চরের উদ্দেশে রওনা হলাম। সকাল ১০টা বাজে, কিন্তু কুয়াশা কাটার কোনো চিহ্ন দেখছি না। কুয়াশার মধ্যেই নৌকা ধীরে ধীরে বুলনপুর, হারুপুর ও নবগঙ্গা হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলেছে। ইতোমধ্যে কুয়াশার চাদর কাটতে শুরু করেছে। এমন সময় হঠাৎই নদীর মাঝ থেকে উঁকি দেওয়া একচিলতে চরে কয়েকটি কালো পাখির সঙ্গে দুটি কালচে সাদাটে পাখি নজরে এলো। দ্রুত মাঝিকে নৌকা সেই চর বরাবর নিতে বললাম। নৌকা চরের যতই কাছে যেতে থাকল পাখি দুটির চেহারা ততই স্পষ্ট হতে লাগল। ক্যামেরার ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে ধীরে ধীরে শাটারে ক্লিক করে গেলাম। নৌকা চরের কাছাকাছি আসতেই একে একে দুটি কালচে সাদাটে পাখি উড়াল দিল। আর আমাদের দিয়ে গেল গোটা কয়েক ঝকঝকে উড়ন্ত ছবি। পাখি দুটিকে এই প্রথম বাংলাদেশে দেখলাম। ২২ বছর আগে ওদের সর্বপ্রথম দেখেছিলাম মূল আবাস কানাডার অন্টারিও প্রদেশের গুয়েলপ সিটির এক পার্কে।

রাজশাহীর পদ্মার চরে সম্প্রতি দেখা পাখি দুটির ইংরেজি নাম  Lesser Black-backed Gull। ওদের কোনো প্রচলিত বাংলা নাম নেই। অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ছোট কালোপিঠ গঙ্গাকৈতর। ওরা এ দেশের দুর্লভ পরিযায়ী পাখি। বৈজ্ঞানিক নাম Larus fuscus|। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপ উপকূলের আবাসিক এই পাখি শীতে আফ্রিকা ও বাংলাদেশসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পরিযায়ন করে।

পদ্মার চরে পাখিটির অবাধ বিচরণ- লেখক

ছোট কালোপিঠ গঙ্গাকৈতরের আকার মাঝারি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ৫১-৬৮ সেমি, প্রসারিত ডানা ১২৪-১৫৮ সেমি ও ওজন ০.৫৫-১.২০ কেজি। দেহ মোটাসোটা, মাথা বড় ও গোলাকার, ঘাড় চওড়া ও চঞ্চু মজবুত। প্রজননকালীন পাখির মাথা সাদা, দেহের ওপরটা গাঢ় ধূসর ও নিচটা সাদা। ওড়ার সময় ডানার প্রাথমিক পালকের প্রান্তের কালোর ওপর সাদা ফোঁটা চোখে পড়ে। প্রজননহীন পাখির ঘাড়ে গাঢ় দাগ ছোপ থাকে। চোখের রং হলুদ। চঞ্চু হলুদ, নিচের চঞ্চুর আগায় লাল দাগ রয়েছে। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথায় গাঢ় দাগ ও দেহের ওপরের অংশে গাঢ় ছোপ রয়েছে।

শীতকালে চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের উপকূল, সিলেট বিভাগের হাওরাঞ্চল এবং রাজশাহী বিভাগের বড় নদীতীরে ওদের দেখা মেলে। ছোট থেকে বড় দল কিংবা অন্য প্রজাতির গঙ্গাকৈতরের মিশ্র দলে ওরা বিচরণ করে। পানির সামান্য ওপরে ও মাঠের পানিঘেঁষা পাড়ে উঠে বা মাটিতে নেমে মাছ, ছোট পাখি ও ডিম, অমেরুদণ্ডী প্রাণী, অন্যান্য প্রাণিদেহের অবশিষ্টাংশ, মরা প্রাণী ইত্যাদি খায়। পানির ওপর লম্বা সময় উড়তে পারে। গভীরভাবে ও নাকি সুরে 'গা-গা-গা্ত-' শব্দে ডাকে।

মে থেকে জুন প্রজননকাল। এ সময় একগামী পাখিগুলো একসঙ্গে কলোনি বাসা তৈরি করে। যে কোনো কিছু দিয়ে বাসা বানাতে পারে। একগাদা ঘাস-লতা বা পালক দিয়ে যেমন বানায়, তেমনি সামান্য মাটি আঁচড়েও বাসা বানাতে পারে। সচরাচর তিনটি ডিম পাড়ে, রং খয়েরি ছিটসহ হালকা বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয়। ডিম ফোটে প্রায় ২৮ দিনে। ছানারা ৩০-৪০ দিনে উড়তে শেখে। এরপর ওরা অপ্রাপ্তবয়স্ক ও প্রজননহীন পাখিদের দলে যোগ দেয় এবং সারাদিন বিশ্রাম নিয়ে ও পালক পরিপাটি করেই সময় কাটায়। ছানারা প্রায় চার মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়। আয়ুস্কাল ১১-১২ বছর।

লেখক: অধ্যাপক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

আরও পড়ুন

×