বিহঙ্গ
দুর্লভ কালো-মাথা মুনিয়া
অনন্যা আবাসিক এলাকার নলখাগড়ার ওপর ছানাসহ কালো-মাথা মুনিয়া -লেখক
ড. আ ন ম আমিনুর রহমান
প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৯:১৮ | আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬ | ০৯:৩৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
বন্যপ্রাণী চিকিৎসা বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে (সিভাসু) গেলাম ছয় দিনের সফরে। পরীক্ষা প্রতিদিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত। পুরো সকাল অবসর। কাজেই সকালটা শহরের আশপাশের প্রাকৃতিক স্থানগুলো দেখে কাটানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। শহরের ভেতরে পাখি দেখার একটি চমৎকার জায়গা আছে। ওখানে কিছু দুর্লভ ও বিরল পাখির বাস।
জায়গাটির নাম অনন্যা। শহরের এক প্রান্তে অবস্থিত আবাসিক প্রকল্প। একসময় এখানে গ্রাম, বিল ও জলাশয় ছিল। এখনও একটি অংশে গ্রাম ও জলাশয় রয়েছে। পুরো প্রকল্পটি ঘাসবন ও গাছপালায় ছেয়ে গেছে। হাসপাতালের এক পাশের প্লটগুলোতে গজিয়েছে হোগলা গাছ। আর এখানেই আবাস গড়েছে বেশ কিছু বিরল ও দুর্লভ পাখি। যেমন– লালটুপি ছাতারে, হলদে-পেট টুনি, লালবুক ঘুরঘুরি ও হলদে বক।
২১ এপ্রিল ভোরে সিভাসু থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশাযোগে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে গিয়ে ক্যামেরা হাতে অনন্যা হাউজিং প্রকল্পের দিকে হাঁটা দিলাম। দুই বছর আগে যেমনটি দেখেছিলাম, জায়গাটি তেমনই আছে। কিন্তু হোগলা গাছ কমে গেছে। তাই পাখি পাব কিনা, তবে প্লটের সামনে আসতেই কালো-মাথা ও তামাটে দেহের একঝাঁক ছোট্ট পাখি দেখে খানিকটা ভরসা পেলাম।
একসময় হঠাৎ হোগলা বনের পাশে নলখাগড়ার ওপর একজোড়া পাখিকে বসে থাকতে দেখে চুপি চুপি ওদের কাছাকাছি গেলাম। একটি পাখির পালকের রং স্বভাবিক হলেও অন্যটি ছিল একেবারেই ফ্যাকাশে। আসলে সেটি ছিল একটি বাচ্চা পাখি। এই প্রথম এ রকম বাচ্চার ছবি তুললাম। মনটা খুশিতে ভরে উঠল।
কালো-মাথার তামাটে রঙের পাখিগুলো এ দেশের দুর্লভ আবাসিক পাখি কালো-মাথা মুনিয়া। তামাটে মুনিয়া নামেও পরিচিত। ইস্ট্রিলডি (Estrildae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Lonchura atricapilla (লনচুরা অ্যাট্রিক্যাপিলা)। ইতোপূর্বে এটি তিনরঙা মুনিয়ার (Tricolored Munia) একটি উপপ্রজাতি হিসেবে বিবেচিত হতো। কিন্তু ২০০০ সালে আলাদা প্রজাতি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বহু দেশে দেখা মেলে।
কালো-মাথা মুনিয়া ছোট আকারের পাখি। দেহের দৈর্ঘ্য ১১-১২ সেন্টিমিটার। ওজন মাত্র ৯ গ্রাম। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির মাথা, ঘাড় ও গলা চকচকে কালো। ডানা-পিঠ-বুক-পেট-লেজ গাঢ় তামাটে। কোনো কোনো বংশধারার (Race) পাখির পেট ও লেজের তলা কালো এবং লেজের পালকে হলদে বা কমলার আভা থাকে। শক্তপোক্ত ত্রিকোণাকার ঠোঁটটি হালকা নীলচে ধূসর। পা, আঙুল ও নখ কালো। চোখের মণি গাঢ় রঙের। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের পালক অনুজ্জ্বল ও ফ্যাকাশে দারুচিনি-বাদামি। বুক-পেট সাদাটে। মাথা-ঘাড়-গলায় কালো রং নেই। ঠোঁট গাঢ় নীলচে-ধূসর।
এরা সচরাচর জোড়ায় বা ছোট দলে থাকে। তবে তিনরঙা মুনিয়ার সঙ্গে মিশ্র ঝাঁকেও দেখা যায়। অন্যান্য মুনিয়ার মতো এরাও বীজ জাতীয় খাদ্য, যেমন– ঘাসবিচি বা অন্যান্য শস্যবীজ খায়। শুধু পুরুষই ডাকে। বারংবার ‘পি .. পি ...’ বা ‘পিট .. পিট ...’ শব্দে ডাকতে থাকে।
এপ্রিল থেকে নভেম্বর প্রজননকাল। এ সময় মাটি থেকে ১-২ মিটার উচ্চতায় নলখাগড়া, ঝোপ, লম্বা ঘাস বা তাল-খেজুর গাছে শুকনো ঘাস ও চিকন কাঠিকুটি দিয়ে গোলাকার বা ডিম্বাকার বাসা গড়ে। ডিম পাড়ে ৫-৬টি, রং সাদা। ছানা ফোটে ১২-১৫ দিনে। ছানারা উড়তে শেখে প্রায় ১৪ দিনে। তবে এর পর আরও ১৪-২১ দিন বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকে। আয়ুষ্কাল তিন-চার বছর।
আজকাল অনেকেই পোষার জন্য এই পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মুনিয়া পরিবেশ থেকে ধরে নিয়ে যায়, যা বন্যপ্রাণী আইনে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। কাজেই প্রকৃতি থেকে এসব পাখি ধরা বা পোষা থেকে বিরত থাকতে হবে। কামনা করি, দুর্লভ কালো-মাথা মুনিয়াগুলো প্রকৃতিতে বেঁচে থাকুক অনন্তকাল।
লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- বিহঙ্গ
