ঢাকা বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল-সমকাল অনলাইন গোলটেবিল

ছাত্র রাজনীতি হোক অধিকারকেন্দ্রিক

ছাত্র রাজনীতি হোক অধিকারকেন্দ্রিক
×

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | ০৬:৪৫

শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে পাশে থাকলে অতীতের গৌরব ফিরে পাবে ছাত্র রাজনীতি। এ জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে ইতিবাচক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছাত্র সংগঠনগুলো সক্রিয় ও সম্পৃক্ত হলে নতুন কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা বাড়বে। হানাহানি বন্ধ করে পারস্পরিক সহাবস্থানে বিশ্বাসী হতে হবে। ছাত্র রাজনীতি গঠনমূলক হলে মূলধারার রাজনীতিতেও পরিবর্তন আসবে। ছাত্র সংগঠনকে রাজনৈতিক দলগুলোর লেজুড়বৃত্তি বন্ধ করতে হবে।

শনিবার ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল ও সমকাল আয়োজিত 'শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা' শীর্ষক অনলাইন বৈঠকে আলোচকরা এসব কথা বলেছেন। এতে অর্থায়ন করেছে ইউএসএইড এবং ইউকেএইড।

বৈঠক সঞ্চালনা করেন সমকালের সহকারী সম্পাদক শেখ রোকন। স্বাগত বক্তব্য দেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। আলোচনায় অংশ নেন সাবেক ছাত্রনেতা আওয়ামী লীগের সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, বিএনপির প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ড্যানা এল ওল্ডস, প্রোগ্রাম অফিসার নুর ই জান্নাত মুন, সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী, ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল, ছাত্রসমাজের সভাপতি ইব্রাহিম খান জুয়েল, ছাত্র ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক সুমাইয়া সেতু, তরুণ অধিকার কর্মী অরণী সেমন্তি খান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিদা আমির ইনিসি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান পুষ্পা।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, ভাষা আন্দোলনের মাসে কথা বলছি। ভাষা আন্দোলনে ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রয়েছে। আর এক দিন পর শুরু হচ্ছে স্বাধীনতার মাস। মহান মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাসে ছাত্রদের এবং ছাত্র রাজনীতির কী ভূমিকা ছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে ছাত্র রাজনীতি কোথায় দাঁড়িয়ে! আমরা চাই আমাদের ছাত্র রাজনীতি সেই সুবর্ণ অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের হিরকরেখা তৈরি করুক। ছাত্র রাজনীতির মূল কেন্দ্র হোক শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়। অবশ্যই ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতীয় নেতা তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন ছাত্রদের অধিকারের কথা বলা হবে, তেমনি জাতীয় প্রয়োজনের কথাও বলা হবে। তবে কোনোভাবেই লেজুড়বৃত্তি যেন না হয়।

তিনি বলেন, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলো সে জায়গায় নেই। পত্রিকার পাতায় তাদের নিয়ে শুধু নেতিবাচক খবর ছাপা হয়। আমরা সেই জায়গা থেকে বেরোতে চাই। আপনারা একটি ইতিবাচক ধারা তৈরি করুন। সমকাল সঙ্গে যুক্ত হবে। ছাত্র রাজনীতির বাইরে যারা আছেন, তারাও অভিনন্দিত করবেন। সমকাল ছাত্র সংগঠনের ইতিবাচক খবর ছাপতে আগ্রহী।

অসীম কুমার উকিল বলেন, ষাটের দশকের নেতারা মনে করেন, তাদের সময়ের মতো ছাত্র রাজনীতি হওয়া উচিত। আশির দশকের নেতারা মনে করেন, তাদের সময়ের মতো রাজনীতি হওয়া দরকার। কিন্তু আসল প্রয়োজন হলো, বর্তমান সময় ও বাস্তবতা অনুযায়ী রাজনীতি হওয়া উচিত। এর ব্যত্যয় থাকায় ছাত্র রাজনীতি দানা বেঁধে ওঠেনি। কোটাবিরোধী আন্দোলন সফল হয়েছিল, কারণ ছাত্ররা তাদের নিজের দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছিল। এ ছাড়া আর কোনো বিষয়ে তারা আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। এখানে 'মূল দল'-এরও ভূমিকা রয়েছে। মূল দলগুলোকেও আন্তরিক হতে হবে।

শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী বলেছেন, বাংলাদেশে স্বাভাবিক রাজনীতি নেই। একটা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে। ছাত্র রাজনীতির যে হাল, তা স্বাভাবিকতার মধ্যে পড়ে না। বিশ্ববিদ্যালয়, হল দখল করে রাখা হয়েছে। কোটাবিরোধী ও নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা হয়েছে। ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় নির্বাচনগুলোর মতো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে রেখেছে, যেন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কথা বলতে না পারে; আন্দোলন করতে না পারে। স্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে ছাত্ররা একত্রিত হয়ে তাদের অধিকার আদায়ে আন্দোলন করতে পারে, যা দেশকে পথ দেখাবে।

ড্যানা এল ওল্ডস বলেন, রাজনীতিতে ছাত্রদের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। বিশ্বজুড়েই রাজনৈতিক আন্দোলনে ছাত্রদের গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলাদেশে রাজনীতিতে ছাত্রদের ভূমিকা কেন্দ্রীভূত। আমরা মনে করি, দেশের ভালোর জন্য ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত। রাজনীতি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলেও নতুন প্রজন্মের ছাত্রনেতাদের উচিত রাজনৈতিক সমঝোতা ও ইতিবাচক পদক্ষেপের ভিত্তি গড়তে এক হওয়া। ছাত্ররা রাজনীতিতে কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তার জন্য ইউএসএইড ও ইউকেএইড সহায়তা করতে চায়।

নুর ই জান্নাত মুন বলেন, ছাত্রনেতাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইউএসএইড এবং ইউকেএইডের অর্থায়নে এসপিএল ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান দলগুলোর ৩৭৪ জন তরুণ নেতা নেতৃত্ববিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তারা প্রশিক্ষণ শেষে নিজ নিজ দল ও জেলায় ইতিবাচক গণতন্ত্র চর্চায় ভূমিকা রেখে যাচ্ছেন। তরুণদের একটি বড় অংশের মধ্যে রাজনীতিতে অংশ নিতে অনাগ্রহ ও উদাসীনতা রয়েছে। রাজনীতিতে মেধাবী তরুণ, ছাত্রদের স্বয়ংক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে না পারলে দেশ ও জাতি এগোবে না।

ছাত্র সংগঠনগুলোতে গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি প্রসঙ্গে সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী বলেছেন, বায়ান্ন থেকে একাত্তর পর্যন্ত ছাত্রদের যত আন্দোলন হয়েছে, তাদের দমনে পাকিস্তানে সামরিক জান্তারা গুন্ডাতন্ত্র তৈরি করেছিল, তা বাংলাদেশেও বন্ধ হয়নি। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর সামরিক সরকারের উত্থানে আবার ছাত্রদের হাতে অস্ত্র উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের নিয়ে 'হিজবুল বাহার' ভ্রমণের নামে সরাসরি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সামরিক জান্তা আইয়ুব শাহীর মতো গুন্ডাবাহিনী তৈরি করা হয়। তা করেছিলেন সেই সময়ের সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান। পরবর্তী সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একই পথে হেঁটেছেন।

সাইফ মাহমুদ জুয়েল বলেছেন, কিছু ছাত্র সংগঠন যেমন লেজুড়বৃত্তিক আবার কিছু আদর্শবাদী সংগঠন রয়েছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশমুক্তির আন্দোলন। নিঃসন্দেহে ছাত্র সংগঠনের মূল দায়িত্ব ছাত্রদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া। কিন্তু মূল সমস্যা হলো, সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করা হয়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সংগঠনকে ক্যাম্পাসে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। তাই বাকিরা অসহায় হয়ে পড়ে। ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পাশে দাঁড়াতে পারে না। কারণ, তাদের সঙ্গে ছাত্রদল যোগ দিলে তাদের গুলি করা হবে, গুম করা হবে।

ছাত্রসমাজের সভাপতি ইব্রাহিম খান জুয়েল বলেন, বিরোধী ছাত্র সংগঠনগুলো দমন-পীড়নের শিকার। এরশাদের শাসনামলে ডাকসুসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন হয়েছে। এর পর আর হয়নি। ২০১৯ সালে ডাকসুতে নির্বাচন হলেও তা প্রশ্নমুক্ত নয়। ক্যাম্পাসভিত্তিক রাজনীতি করতে পারছি না। অপরাপর সংগঠন বাধা দিচ্ছে।

অরণী সেমন্তি খান বলেন, ছাত্র সংগঠনগুলো ভূমিকা রাখতে না পারার বড় সমস্য মূল দলের লেজুড়বৃত্তি। জাহাঙ্গীরনগরের বিশেষ দলের নেতারা সংঘর্ষের ঘটনায় দায়মুক্তি পেয়ে গেছে। এর কারণ অদৃশ্য শক্তি। মূল নেতাদের হাতে ছাত্রনেতারা বন্দি। মূল নেতারা ছাত্রদের দিয়ে রাতভর গেস্ট রুম করায়, দিনে মধুর ক্যান্টিনে হাততালি দেওয়ায়। এখন ছাত্র রাজনীতি দুই ধরনের- অধিকার আদায় ও তোষামোদির। লেজুড়বৃত্তি যত দৃঢ় হবে, মেধাবীরা রাজনীতি থেকে তত দূরে চলে যাবে। নিজে ভালো থাকতে দেশ ছেড়ে পালাবে।

সুমাইয়া সেতু বলেন, আজকাল ছাত্র রাজনীতির সংজ্ঞা দাঁড়িয়েছে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হল দখল ও দুর্বৃত্তায়ন। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররা তাদের অধিকারের কথা বলায় বহিস্কার করা হয়েছে। গোপালগঞ্জে ছাত্ররা কৃষকের ধানের দাম নিয়ে দাবি তোলায় তাদের বহিস্কার করা হয়েছে। বর্তমান প্রশাসন ছাত্র রাজনীতিবান্ধব নয়। ছাত্র রাজনীতির বর্তমান চিত্রের কারণে আদর্শবাদী সংগঠনগুলোর প্রতিও সাধারণ ছাত্ররা আকৃষ্ট হচ্ছে না। পরিবারও সন্তানদের ছাত্র রাজনীতিতে আসতে দিতে রাজি নয়।

সানজিদা আমির ইনিসি বলেন, জাহাঙ্গীরনগর ছাত্র সংসদের (জাকসু) শেষ নির্বাচন হয়েছে ১৯৯২ সালে। সংসদ না থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি নেই। ছাত্রদের অধিকারের কথা বলার কেউ নেই। উপাচার্য ও সংশ্নিষ্টরা নির্বাচন দিতে ভয় পান। তারা ঝুঁকি নিতে চান না। সম্প্রতি গ্রামবাসীর সঙ্গে যে সংঘর্ষ হয়েছে, তার কারণ ছাত্র সংগঠনকেন্দ্রিক। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম মারফত জানা গেছে, একটি ছাত্র সংগঠনের কারণে সংঘর্ষ হয়েছে। এ জন্য সাধারণ শিক্ষার্থীদেরই ভুগতে হয়েছে। তারা হলে থাকতে পারছে না, আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের মেসেও যেতে পারছে না।

নুসরাত জাহান পুষ্পা বলেন, হল খুলে দেওয়ার মতো শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক আন্দোলনে ছাত্র সংগঠনকে পাশে পাচ্ছি না। ছাত্র সংগঠনগুলো বিভিন্ন দল ও উপদলে বিভক্ত। তারা ব্যক্তিস্বার্থের রাজনীতি করছে। এ কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে তাদেরকে পাশে পাওয়া যাচ্ছে না।

আরও পড়ুন

×