চোখের সামনে বাবাকে ধরে নিয়ে যায় খান সেনারা
এসএম আলমগীর বাবলু
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০২:০০ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ০২:১৪
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে অসহযোগ আন্দোলনের সময় রাজশাহীর 'সাংবাদিক শিল্পী সাহিত্যিক সংগ্রাম পরিষদ'-এর আহ্বায়ক ছিলেন বাবা। ১৯৭১ সালের ২৮ জুন সামরিক বাহিনীর লোকেরা বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়
আমার বাবা শহীদ এমএ সাঈদ রাজশাহীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি পরিচিত নাম। তিনি শুধু সাংবাদিকই ছিলেন না; একজন নাট্য সংগঠক ও নাট্যশিল্পীও ছিলেন। তিনি মূলত একজন কৌতুকাভিনেতা। রাজশাহীতে প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মুক্তিযুদ্ধের সূচনালগ্নে অসহযোগ আন্দোলনের সময় রাজশাহীর 'সাংবাদিক শিল্পী সাহিত্যিক সংগ্রাম পরিষদ'-এর আহ্বায়ক ছিলেন বাবা। ১৯৭১ সালের ২৮ জুন সামরিক বাহিনীর লোকেরা বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পর ভুবন মোহন পার্কে স্বাধীনতার পক্ষে যেসব মিছিল-সমাবেশ হতো, সেখানে উপস্থিত থাকতেন বাবা। আমার বয়স তখন ১৫ বছর। আমরা তখন থাকতাম শিরোইলে মাড়োয়ারিদের কোয়ার্টারে। মানুষ বাড়িঘর ফেলে চলে যাচ্ছে। পুঠিয়ায় ছিল চাচার বাড়ি। শহর ছেড়ে পুঠিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো।
কৃষি বিভাগে চাকরির সুবাদে আব্বা এসেছিলেন রাজশাহীতে। ১৯৪৯ সাল। কৃষি বিভাগে চাকরি করলেও আব্বা ছিলেন মনেপ্রাণে সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তি। তিনি দৈনিক আজাদ ও কলকাতা থেকে প্রকাশিত লোকসেবক পত্রিকার নিজস্ব সংবাদদাতা ছিলেন। পরে তিনি দৈনিক পাকিস্তান, ডেইলি অবজারভার, পয়গাম, জেহাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। আব্বা ভুবনমোহন পার্ক, পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিলে (বর্তমানে পদ্মা রঙ্গমঞ্চ) নিয়মিত নাটক করতেন।

২৫ মার্চের পর পুলিশ লাইন্স আক্রান্ত হলো। কিছু কাপড় নিয়ে আমাদের যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো পুঠিয়ায়।
জুন মাসের মাঝামাঝি। পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক। আমাদের সবাইকে নিয়ে আব্বা শহরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন। সুলতান চাচা, মনতাজ চাচা ওই সময় শহরে না যেতে খুব অনুরোধ করলেন। কিন্তু আব্বা শুনলেন না। বললেন, 'যেতেই হবে।' শহরে ফিরে দেখলাম শিরোইল এলাকার বাড়িটি ভেঙে চুরমার। স্থানীয়রা জানালেন, বাড়িটি দেখাশোনার জন্য দায়িত্বে থাকা ফজল হিন্দু বাড়ি লুটের মাল এ বাড়িতে এনে রেখেছিলেন। খবর পেয়ে খান সেনারা আমাদের এ বাড়িটি মাইন বিস্টেম্ফারণে উড়িয়ে দেয়। ষষ্ঠীতলায় হিন্দুদের ফাঁকা বাড়িগুলোর একটিতে উঠলাম আমরা। ওই সময় পাকিস্তানিরা সিনেমা হল খোলা রাখার নির্দেশ দিল। তখন হল খুলে পাকিস্তানি ছবি 'নাজমা' চালানো হলো। হল খোলার দু'দিন পর হল মালিক মকবুল চৌধুরীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেল পাকিস্তানিরা। আব্বা মাকে বললেন, 'মকবুল চৌধুরীকে খান সেনারা নিয়ে গেছে; আমাকেও ওরা ছাড়বে না।' আমি ওই সময় মাছ ধরতে বড়শি নিয়ে যাচ্ছিলাম; খান সেনাদের একটি বড় গাড়ি এলো। তারা আমাকে বলল, 'সাঈদ রিপোর্টার কা মাকান কিধার হ্যায়?' তখন আমি অন্য একটি বাসা দেখিয়ে দিলাম। গাড়ি ওইদিকে চলে গেল। সামনে পড়ল এক পিস কমিটির সদস্য। নাম কাইয়ুম। তাকে আবারও জিজ্ঞেস করল। তখন আমি ভয়ে মসজিদের পাশে লুকিয়ে গেলাম। সব দেখছি। আটজন খান সেনা বাড়িতে ঢোকে। চোখের সামনেই আব্বাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। বাড়িতে এসে দেখলাম মা কাঁদছেন। মায়ের কাছে জানলাম, খান সেনারা এসে মেজর পারভেজ ডেকেছেন বলে সার্কিট হাউসে নিয়ে গেছে। ওইদিন আমি যদি সঙ্গে সঙ্গে আব্বাকে গিয়ে বলতাম, খান সেনারা খুঁজছে- তাহলে হয়তো আব্বা বেঁচে যেতেন। তারপর মা সবাইকে জানালেন। এখানে-সেখানে খোঁজ করলেন। অনেকে মিলে বাবাকে খুঁজতে বের হলাম। কোথাও পেলাম না তাকে। তারপর মা আমাকে সঙ্গে নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলেন। গেটেই আর্মিরা আটকাল। জানালাম, 'রেলের টিটি নোমানী সাহেবের জামাই ডাক্তার সাহেবের কাছে যাব।' তিনি আর্মিদের ডাক্তার ছিলেন। তাকে জানানো হলে তিনি আর্মিদের গাড়ি নিয়ে চলে এলেন। এসে আব্বার ছবি নিয়ে গেলেন খোঁজ করতে। ফিরে এসে জানালেন, আব্বা জোহা হলে নেই। তাকে নাটোরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটা ছিল মিথ্যা কথা। দু'দিন পর শাহমখদুম ইনস্টিটিউটের পিয়ন কাদের মিয়া এসে জানালেন, 'সাঈদ ভাইকে আর খুঁজবেন না। তাকেসহ ১৩ জনকে জোহা হলে খান সেনারা গুলি করে। সেখানে আমিও ছিলাম। গুলি লাগার আগেই আমি মাটিতে পড়ে যাই। তারপর সবাইকে গর্তে ফেলে দেয়। খান সেনারা চলে গেলে আমি লাশভর্তি গর্ত থেকে পালিয়ে আসি।' এরপর থেকে আমরা জেনেছি, বাবা আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের জোহা হলের বধ্যভূমিতে। সেই বধ্যভূমিতে শহীদের নামের তালিকায় আমার বাবার নামও রয়েছে।
একজন শহীদ বুদ্ধিজীবীর সন্তান হয়েও বড় অসহায় অবস্থায় দিন যাপন করছি আমরা। চা বিক্রি করে সংসার চালাই। শহীদ সাংবাদিকের ছেলে হলেও আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই। শহীদ কামারুজ্জামানের সহচর হিসেবে আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছেন। এখন আমাদের কেউ চেনেন না।
লেখক :এমএ সাঈদের সন্তান
অনুলিখন : সৌরভ হাবিব, রাজশাহী ব্যুরো
- বিষয় :
- বুদ্ধিজীবী দিবস
- এমএ সাঈদ
