ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

রোহিঙ্গারা ফিরতে চায়, পথরেখা স্পষ্ট নয়

রোহিঙ্গারা ফিরতে চায়, পথরেখা স্পষ্ট নয়
×

 সমকাল প্রতিবেদক, ঢাকা ও টেকনাফ প্রতিনিধি 

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ০৮:৪০ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ০৯:১৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

খিন মং মিয়ানমারের মংডুর বাসিন্দা ছিলেন। ২০১৭ সালে সেখানে রক্তক্ষয়ী সহিংসতা শুরু হলে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেন। তখন তাঁর বয়স ছিল ২৭ বছর। মংডুর জন্মভিটা থেকে কক্সবাজারে আসার সময় তাঁর সঙ্গে মা ও দুই ভাইও ছিলেন। তারা এখন উখিয়ার ক্যাম্প-১৩ তে বসবাস করছেন। 
গতকাল শুক্রবার খিন সমকালকে বলেন, ‘আমরা মিয়ানমারে ফিরতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ২০ মিনিটও এখানে থাকতে চাই না– এমন মানসিকতা রয়েছে। মিয়ানমারের সদিচ্ছার অভাবে আমাদের ফেরত যাওয়া আটকে যাচ্ছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও ব্যর্থতা আছে। রোহিঙ্গারা কীভাবে ফিরতে পারবে– এমন সুনির্দিষ্ট নীতিমালা কেউ তৈরি করেনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ থামাতে পারলে রোহিঙ্গা সমস্যা কেন দূর হবে না? এটা সবার কূটনৈতিক ব্যর্থতা।’ 

ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা নামে সংগঠনের প্যানেল সদস্য হিসেবে রয়েছেন খিন। তিনি আরও বলেন, রাখাইনে মূল সমস্যা নিরাপত্তা, অর্থ এবং খাবার সংকট। 
ওপারে আত্মীয়স্বজন যারা আছেন আতঙ্কে থাকেন। এ ছাড়া রয়েছে আরাকান আর্মির হাতে নির্যাতনের ভয়। 
২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর কয়েক মাসে খিন মংয়ের মতো অন্তত আট লাখ রোহিঙ্গা রাখাইন রাজ্যের জন্মভিটা ছেড়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। 
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বর্তমানে ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩। উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি ক্যাম্পে তারা বসবাস করছেন। এমন পরিস্থিতিতে আজ শনিবার বিশ্ব শরণার্থী দিবস পালিত হচ্ছে। 

শরণার্থী, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কমিশনারের কক্সবাজার কার্যালয়ে কাজ করেছেন এমন একাধিক কর্মকর্তা জানান, ১৯৯০ সালে প্রায় দুই লাখ ৩৬ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার তাদের দেশে ফিরিয়ে নেয়। তখন ১৪ হাজার রোহিঙ্গাকে ফেরত নেওয়া হয়নি। ওই সময় যারা মিয়ানমারে ফেরত যেতে পারেননি তারা ‘শরণার্থী’ হিসেবে আছেন। এরপর বিভিন্ন সময় যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছেন তারা এফডিএমএন (জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক) হিসেবে পরিচিত। 
১২ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে একজনকেও ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। তার ওপর কক্সবাজারের সীমান্ত পেরিয়ে নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। এতে কক্সবাজারে স্থানীয়দের মধ্য অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। এদিকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত নতুন করে আগত ও নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা এক লাখ ৫২ হাজার ২৯। এর মধ্যে গত মে মাসে দুই হাজার ২৬০ জন রোহিঙ্গা নতুন আগত হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। 

টেকনাফের স্থানীয় বাসিন্দা ইবনে আমিন বলেন, প্রায় ৯ বছর পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত থাকায় স্থানীয়রা নিজেদের অস্তিত্ব, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং জীবন-জীবিকা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। 
২০১৭ সালে যারা শিশু ছিল তারা এখন তরুণ। আবার ক্যাম্পে জন্ম নেওয়া হাজারো শিশু কখনও তাদের জন্মভূমি মিয়ানমার দেখেনি। একটি পুরো প্রজন্ম বেড়ে উঠছে নতুন 
পরিচয় নিয়ে। যার ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত। ক্যাম্প-৮ এর বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন, ‘অনেক রোহিঙ্গা তরুণ বেকার। তারা খারাপ কাজের দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে এখানে 
এসে যারা জন্ম নিয়েছে তাদের ঠিকানা কী হবে, আমরা কেউ বলতে পারছি না। বলতে গেলে ঠিকানাহীন মানুষ।’  

সৈয়দ আলম বলেন, ‘প্রায় দেড় বছর পর হঠাৎ আবার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটায় ক্যাম্পজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক চিহ্নিত অপরাধী কারাগার থেকে বের হয়ে পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। বর্তমানে ক্যাম্পে পাঁচ-ছয়টি অস্ত্রধারী গ্রুপ সক্রিয়। তারা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ, মাদক চোরাচালান এবং আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মরিয়া হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই সরকারকে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ড ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।’ 

পুলিশ জানিয়েছে, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের ৩২টি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে প্রায় দেড় বছর তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করলেও সম্প্রতি পুরোনো দ্বন্দ্ব ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে আবারও রক্তক্ষয়ী সংঘাত শুরু হয়েছে। বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ক্যাম্প-২, ৬, ৭, ৮ ইস্ট, ১৪ ও ১৫ নম্বর ক্যাম্পে বিভিন্ন সশস্ত্র গ্রুপের তৎপরতা বেড়েছে। এসব গ্রুপ প্রভাব বিস্তার, মাদক ও অস্ত্র কারবার, চোরাচালান, মানব পাচার, অপহরণসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। 
এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সম্প্রতি সংসদে জানিয়েছেন, বাংলাদেশে অবস্থান নেওয়া ১১ লাখ ৮৯ হাজার ২১৩ জন রোহিঙ্গার মধ্যে দুই লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ জনকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে মিয়ানমার। তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকার এ পর্যন্ত ছয়টি ধাপে মোট আট লাখ ২৯ হাজার ৩৬ জন রোহিঙ্গার তথ্য মিয়ানমার সরকারের কাছে পাঠিয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার এ পর্যন্ত তিন লাখ ৯৩ হাজার ৫০৩ জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন করেছে। আর দুই লাখ ৮৩ হাজার ৮৬ ব্যক্তিকে ‘পূর্বে মিয়ানমারে বসবাসকারী ব্যক্তি’ হিসেবে মিয়ানমার সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় রোহিঙ্গাদের তৃতীয় কোনো দেশে পুনর্বাসন বা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রমও পরিচালনা করছে।

মন্ত্রী জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের একটি প্রধান উদ্দেশ্য ছিল এই ইস্যুকে আন্তর্জাতিক এজেন্ডায় নিয়ে আসা। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকার জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেজকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। এই আমন্ত্রণের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব বাংলাদেশ সফর করেন এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো সরেজমিন পরিদর্শন করেন। এ সময় ইফতারের জন্য সমাগত লক্ষাধিক রোহিঙ্গা শরণার্থী দ্রুততম সময়ে নিজ ভূমে ফিরে যাওয়ার তীব্র ইচ্ছার কথা ব্যক্ত করেন। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে কক্সবাজারে দেশীয় ও বৈদেশিক অংশীজন নিয়ে একটি বিশেষ স্টেকহোল্ডার কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়। 

আরও পড়ুন

×