ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সূর্যসন্তানদের স্মরণ

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার অঙ্গীকার

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশ গড়ার অঙ্গীকার
×

শনিবার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ফুলে ছেয়ে যায় রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ -সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:৪৯ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৪৯

বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় আবারও জাতি স্মরণ করল সেই সূর্যসন্তানদের, যারা দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন বিজয়ের প্রাক্কালে। তাদের সেই ত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধ ও রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধ ফুলে ফুলে সাজিয়ে তুলল স্বাধীনতাপ্রেমী লাখো মানুষ। এ দেশের দোসরদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সেদিন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিকসহ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল। সেই থেকে জাতি ১৪ ডিসেম্বর দিনটি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে। শনিবার সেই দিনে আবারও আওয়াজ উঠল মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উন্নত দেশ গড়ার অঙ্গীকার; বিদেশে পালিয়ে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের। যারা দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লাকে শহীদ আখ্যা দেয়, তাদের বিচারেরও দাবি ওঠে।

শনিবার সকাল ৭টা ৫ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। এ সময় প্রেসিডেন্ট গার্ড রেজিমেন্টের (পিজিআর) একটি সুসজ্জিত দল সশস্ত্র সালাম জানায়। বিউগলে বেজে ওঠে করুণ সুর। এর আগে রাষ্ট্রপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পৌঁছলে প্রধানমন্ত্রী তাকে অভ্যর্থনা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয়প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানান। এরপরই জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী স্মৃতিসৌধে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। স্পিকারের শ্রদ্ধা নিবেদনের পরই সাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় স্মৃতিসৌধ। সঙ্গে সঙ্গে ঢল নামে হাজারো মানুষের। বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। সেখানে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। পরে আওয়ামী লীগ নেতারা রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সদস্যরা তাদের স্থানীয় দোসর আলবদর, রাজাকার, আলশামসের সহায়তায় দুই শতাধিক বুদ্ধিজীবীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করে মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেয়। দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার হয়েছে শনিবার। এ ছাড়া সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পালন করা হয় বিভিন্ন কর্মসূচি। দিনটি উপলক্ষে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কালো পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়।

এসব আয়োজনের মধ্যে ধ্বনিত হয় সেইসব সূর্যসন্তানের ত্যাগের মর্মবাণী। স্বাধীনতার জন্য আত্মদানকারীরা যে রকম অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত দেশ চেয়েছিলেন, সেটা যেন প্রতিষ্ঠা পায়। বাংলাদেশ সে লক্ষ্যেই এগিয়ে যাচ্ছে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত হয়।

শনিবার ভোর থেকে মিরপুর ও রায়েরবাজার শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে মানুষের যে ঢল নামে, দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পরও তা অব্যাহত থাকে। তাদের অনেকের পরণে ছিল শোকের প্রতীক কালো পোশাক। অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের হাতে ছিল ছোট ছোট প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুন। সকাল ১০টার দিকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। দলীয় নেতাকর্মীদের হাতে ছিল খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি সংবলিত ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ড। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, 'এই দিনে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পথ অনুসরণ করে দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বকে রক্ষা ও গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাদের সংগ্রামকে আরও বেগবান করব।'

এদিকে, শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া মানুষের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভও। বুদ্ধিজীবী দিবসের আগে আগে যুদ্ধাপরাধী আব্দুল কাদের মোল্লাকে 'শহীদ' বলায় তারা দৈনিক সংগ্রামের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সংগ্রামের প্রকাশনা বন্ধেরও দাবি ওঠে শহীদ পরিবারের সদস্যদের কণ্ঠে। শহীদ সাংবাদিক-সাহিত্যিক শহীদুল্লা কায়সারের কন্যা শমী কায়সার বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সঠিক তালিকা করতে হবে। একই সঙ্গে রাজাকারদেরও সঠিক তালিকা করতে হবে।

দৈনিক সংগ্রামের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী বলেন, যুদ্ধাপরাধীকে শহীদ বলা মানে বাংলাদেশকে অস্বীকার করা। যারা রাজাকারদের শহীদ বলে, তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব থাকার কথা নয়। দৈনিক সংগ্রামের প্রকাশক ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করে বিচার করতে হবে।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আদনান ফেরদৌস বলেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে আমরা। এখন সঠিক ইতিহাস জানতে পেরেছি। কেউ যদি আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কথা বলে, তাকে আমরা বর্জন করব।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, দৈনিক সংগ্রাম আব্দুল কাদের মোল্লাকে শহীদ বলে ঘৃণ্য কাজ করেছে। একাত্তরে তারা যে ধৃষ্টতা দেখিয়েছিল, তা অব্যাহত রেখেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে এ ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। দৈনিক সংগ্রামের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।

কবি রুবী রহমান বলেন, আমাদের দায়িত্ব নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো। যাদের আমরা হারিয়েছি, নতুন প্রজন্মের মাঝেই তাদের খুঁজে ফিরতে হবে।

মিরপুর ও রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধে আরও শ্রদ্ধা নিবেদন করে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, কেন্দ্রীয় যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন ইউনিটের নেতারা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, বিকল্পধারা, গণফোরাম, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন, ডক্টর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, গণতন্ত্রী পার্টি, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, ন্যাশনালিস্ট ডেমক্রেটিক ফ্রন্ট, মহিলা পরিষদ, বঙ্গবন্ধু কৃষিবিদ পরিষদ, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয়তাবাদী যুবদল, শ্রমিক দল, ছাত্রদল, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠন।

আরও পড়ুন

×