জিতেছে ব্রাজিল তবে মন ভরাতে পারেনি
ছবি- এএফপি
ফাতিউস ফাহমিদ সৌরভ
প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬ | ১২:২৪ | আপডেট: ২০ জুন ২০২৬ | ১২:২৬
স্কোরলাইন বলছে ব্রাজিল ৩, হাইতি ০। কাগজে-কলমে এটি স্বস্তির জয়। খুবই দরকারি জয়। গ্রুপের চাপ কাটানোর জয়। কিন্তু বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে ব্রাজিলের জয় শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না। মাপা হয় খেলার সৌন্দর্যে। পুরো মাঠের নিয়ন্ত্রণে। ছন্দময়তায় প্রতিপক্ষকে ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতায়। সেই জায়গায় হাইতির বিপক্ষে ৩-০ জয়ও ব্রাজিল–সমর্থকদের মন পুরোপুরি ভরাতে পারেনি।
ব্রাজিল এই ম্যাচে নেমেছিল মরক্কোর বিপক্ষে ১-১ ড্রয়ের অস্বস্তি নিয়ে। তাই হাইতির বিপক্ষে জিততেই হতো। তবে সেটা শুধু পয়েন্টের জন্য নয়। দরকার ছিল আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়াটাও।
আপাতত আত্মবিশ্বাসটা ফিরে পাওয়া গেছে। এখনো টুর্নামেন্টে টিকে আছে সেলেসাওরা। মাতেউস কুনহার ২৪ ও ৩৬ মিনিটের গোল আর ভিনিসিয়ুস জুনিয়র প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে গোল। সব মিলিয়ে ব্যবধান ৩-০ গোলের। কিন্তু প্রশ্নটা হলো যে, এই জয় কি ব্রাজিলকে বিশ্বচ্যাম্পিয়নসুলভ দেখাল? এর উত্তরটা সহজ নয়।
কার্লো আনচেলত্তি হাইতির বিপক্ষে এই ম্যাচে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনেন। ইগর থিয়াগোর জায়গায় কুনহাকে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসেবে নামানো ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। কুনহার উপস্থিতিতে ব্রাজিলের আক্রমণ আগের ম্যাচের তুলনায় বেশি ছন্দ দিয়েছে। দলটিকে একটু বেশি গতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ মনে হয়েছে। বিশেষ করে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও লুকাস পাকেতার সঙ্গে কুনহার বোঝাপড়াটা দারুণ মনে হয়েছে।
ব্রাজিলের বাম দিকের যে দুর্বলতা ছিল সেটা আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে দলটি সামাল দিতে পেরেছে। আর এটাই দলটির সবচেয়ে ইতিবাচক দিক। নেইমার না থাকলে ব্রাজিলের আক্রমণ অনেক সময় ভিনিসিয়ুসের একক ঝলকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। হাইতির বিপক্ষে কুনহা সেই নির্ভরতাকে কিছুটা ভাগ করে নেন। তিনি শুধু গোলই করেছেন তা নয়, তার মুভমেন্ট ছিল ভালো। অনেকটা জায়গা নিয়ে খেলেছেন প্রায় পুরো মধ্য মাঠ জুড়ে। এই বিষয়গুলো ভিনিসিয়ুসের ভূমিকা আরো ক্ষুরধার করেছেন। ফলাফলও একেবারে হাতেনাতে পাওয়া গেছে। ভিনিসিয়ুস কুনহার দুই গোলেই ভূমিকা রাখেন এবং নিজেও গোল করেন।
তবে এই উন্নতির মধ্যেও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। হাইতি ছিল সীমিত শক্তির দল। তারা অনেক সময় সামনে উঠে গিয়ে পেছনে জায়গা রেখে দিয়েছে যা ব্রাজিলের কাজটা সহজ করেছে। সংগঠিত হয়ে এবং দ্রুত ট্রানজিশন খেলতে পারে এমন দলের বিপক্ষে ব্রাজিলের একই পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হবে সেটি সময় বলে দেবে। নামে, শক্তিতে বা দমে হাইতি খুব শক্তিশালী দল নয় এটা তো মানতে হবে। তাই তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই উন্নতিতে খুব উচ্ছ্বসিত হওয়াটা ঠিক হবে না।
আজকের ম্যাচে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধ। ৩-০ এগিয়ে যাওয়ার পর দলটি যেন আর ম্যাচটাকে বড় করতে চায়নি। বিশ্বকাপের গ্রুপপর্বে গোলপার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বিশেষ করে মরক্কোর সঙ্গে পয়েন্ট সমান থাকলে। কিন্তু ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ক্ষুধা ধরে রাখতে পারেনি। প্রথমার্ধের তিন গোলের পর আনচেলত্তির দল বেশি মনোযোগ দিয়েছে শক্তি বাঁচানো ও সময় পার করার দিকে। এই সিদ্ধান্ত গোলপার্থক্যের লড়াইয়ের মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে ব্র্রাজিলকে ভোগাতে পারে।
এই জায়গাটাই ব্রাজিলকে চিন্তায় ফেলবে। কারণ গ্রুপ ‘সি’-তে দুই ম্যাচ শেষে ব্রাজিলের পয়েন্ট ৪, মরক্কোরও ৪। ব্রাজিল গোলপার্থক্যে এগিয়ে আছে, কিন্তু মরক্কোও হাইতির বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলবে। অন্যদিকে ব্রাজিলের শেষ ম্যাচ স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। যে ম্যাচ চাপের, শারীরিক, এবং মানসিকভাবে কঠিন হতে পারে।
ব্র্রাজিলের আরও একটি বড় দুর্বলতা রয়েছে ডান প্রান্তে। রাফিনিয়া এই ম্যাচেও প্রভাব ফেলতে পারেননি। পরে চোটের কারণে ৪০ মিনিটে মাঠ ছাড়েন। আজকের ম্যাচেও তার টাইমিং ঠিক ছিল না। তার বদলি রায়ানও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি।
এটি ব্রাজিলের জন্য ট্যাকটিক্যাল সমস্যা। বাম পাশে ভিনিসিয়ুস, পাকেতা ও কুনহার সংযোগ থাকলেও ডান পাশে একই মাত্রার ভারসাম্য ছিল না। ফলে ব্রাজিলের আক্রমণ একদিকে ঝুঁকে পড়ে। বড় দলগুলো সহজেই এটি বুঝতে পারবে। তাদের লক্ষ্য হবে- বাম দিকটা বন্ধ করো। ভিনিসিয়ুসকে ডাবল মার্ক করো। কুনহাকে খুব বেশি জায়গা দিও না। আর ব্রাজিলকে ডান দিকে বল খেলতে বাধ্য করো। তখন কী হবে? আজ হাইতির বিপক্ষে ম্যাচে এই প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
মাঝমাঠেও কিছু অস্বস্তি আছে। কাসেমিরোর অভিজ্ঞতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকতে পারে না। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে তার গতি ও চাপ সামলানোর ক্ষমতা নিয়ে।
ব্র্রাজিলের খেলার ধরন নিয়েও সন্তুষ্ট নন ফুটবল বিশ্লেষকরা। আনচেলত্তির ব্রাজিলে এখনো পুরনো ব্রাজিলকে ফিরে পাননি তারা। তাদের মতে ব্রাজিলের প্যাটার্ন অনেক সময় ধীর পজেশন থেকে প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের পেছনে চিপ পাস দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এতে দ্বিতীয় ও তৃতীয় গোল এলেও বেশ কয়েকবার অফসাইডে হয়েছে। প্রতিপক্ষ সহজেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিতে পেরেছে। এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ব্রাজিলের সমস্যা শুধু গোল করার নয় -খেলা নিয়ন্ত্রণেরও। হাইতির মতো দলকে হারাতে ব্যক্তিগত মানই যথেষ্ট। কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে হলে ম্যাচের টেম্পো নিজের হাতে রাখতে হবে। লিড নেওয়ার পরও প্রতিপক্ষকে চেপে ধরে রাখতে হবে। আর আক্রমণের বৈচিত্র্য দেখাতে হবে। ব্রাজিল সেখানে এখনো অসম্পূর্ণ।
তবু সবকিছু নেতিবাচক নয়। কুনহার পারফরম্যান্স ব্রাজিলকে নতুন সমাধান দিয়েছে, নতুন বিকল্প দিয়েছে। ভিনিসিয়ুস গোল করেছেন এবং টানা দ্বিতীয় ম্যাচে প্রভাব রেখেছেন। পাকেতা আগের ম্যাচের তুলনায় বেশি স্বচ্ছন্দ ছিলেন। রক্ষণে গ্যাব্রিয়েল মাগালায়েস ও মারকিনিয়োস মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।
নতুন আশার খবরও আছে। আনচেলত্তি জানিয়েছেন, নেইমার স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনায় আছেন। ৩৪ বছর বয়সী নেইমার কাফ ইনজুরিতে ছিলেন এবং ১৭ মের পর ম্যাচ খেলেননি। তবে তিনি আবার অনুশীলনে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কিন্তু নেইমারের সম্ভাব্য ফেরা যেমন আশা, তেমনি প্রশ্নও। ব্রাজিল কি আবার নেইমারকেন্দ্রিক হয়ে পড়বে? নাকি কুনহা–ভিনিসিয়ুস–পাকেতার নতুন সমন্বয়ের সঙ্গে নেইমারকে যুক্ত করে আরও তরল আক্রমণ গড়বে? আনচেলত্তির সবচেয়ে বড় কাজ এখন এই ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া।
হাইতির কথাও আলাদা করে বলতে হয়। তারা টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে, কিন্তু ব্রাজিলের বিপক্ষে দ্বিতীয়ার্ধে তারা ভেঙে পড়েনি। হাইতির কোচ সেবাস্তিয়ান মিনিয়ে বলেছেন, তার খেলোয়াড়েরা দেখিয়েছে যে তারা বিশ্বকাপে থাকার যোগ্য। যদিও ব্রাজিলের সঙ্গে ব্যবধান ছিল অনেক।
সব মিলিয়ে এই ম্যাচ ব্রাজিলকে তিনটি বিষয় জানান দিয়েছে। এক, কুনহার ফিরে আসা। তিনি এখন আর বিকল্প নন, সম্ভবত আনচেলত্তির প্রথম পছন্দের দাবিদার। দ্বিতীয়ত, ডান প্রান্ত ও মাঝমাঠের ভারসাম্য দ্রুত ঠিক করতে হবে। তৃতীয়ত, ৩-০ জিতেও যদি দ্বিতীয়ার্ধে দল নিষ্প্রাণ হয়ে যায়, তাহলে নকআউটে বিপদ অপেক্ষা করছে।
ব্রাজিল জিতেছে, কিন্তু ভয় ধরায়নি। স্কোরলাইন বড়, কিন্তু পারফরম্যান্স অসম্পূর্ণ। হাইতির বিপক্ষে তারা প্রয়োজনীয় কাজ করেছে কিন্তু বিশ্বকাপ জিততে হলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কিছু করতে হয়। ব্রাজিল এখনো সেই অতিরিক্তটা করে দেখাতে পারেনি।
এই জয় তাই স্বস্তির, কিন্তু তৃপ্তির নয়। ফল বলছে ব্রাজিল এগিয়েছে। কিন্তু খেলা বলছে, ব্রাজিলকে এখনো অনেকটা পথ হাঁটতে হবে।
- বিষয় :
- ব্রাজিল
- বিশ্বকাপ ফুটবল
