তিন নেতায় জিম্মি বিসিআইসি
অমিতোষ পাল
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:২৭ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৪৪
তিন সিবিএ নেতার অপকর্মে ডুবতে বসেছে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি, বাসা বরাদ্দ, বদলি বাণিজ্যের সব নিয়ন্ত্রক তারা। অথচ তাদের মেয়াদও শেষ হয়েছে বেশ আগেই। তার পরও তারাই সিবিএর হর্তাকর্তা। এ তিন নেতা হলেন বিসিআইসি কর্মচারী লীগের (সিবিএ) সভাপতি শেখ নুরুল হাদী, কার্যকরী সভাপতি দেলোয়ার হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান। তাদের অনিয়ম নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বিভাগীয় পর্যায়ে তদন্ত চলমান। আদালতেও চলছে মামলা। অবশ্য তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন। তারা বলেছেন, তারা সাধারণ কর্মচারী। সব বদলি, নিয়োগ, পদোন্নতির দায়িত্ব শীর্ষ কর্মকর্তাদের। কাজেই এখানে সিবিএর জড়িত থাকার কোনো প্রশ্নই আসে না। তবে বিসিআইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, কাগজপত্রে তাদের নাম না থাকলেও তারা এমনভাবে প্রভাব বিস্তার করে আছেন যে, তাদের কথা কর্তৃপক্ষ শুনতে বাধ্য। এমনকি চাকরিচ্যুতিও হয় তাদের কথায়।
জানা গেছে, সর্বশেষ ২০১৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বিসিআইসি সিবিএর নির্বাচন হয়। ওই নির্বাচন নিয়েও অনেক প্রশ্ন ছিল। ওই নির্বাচনে সভাপতি হন শেখ নুরুল হাদী। কার্যকরী সভাপতি হন দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হন সাইদুর রহমান। এর মধ্যে দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী এক সময় বিএনপি সমর্থিত সিবিএ নেতা ছিলেন। বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী কর্মচারী দলের ২০০৩ সালে গঠিত কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন হলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত সিবিএ গ্রুপে যোগ দিয়ে সাধারণ সম্পাদক হয়ে যান। নিয়ম অনুযায়ী একটি কমিটির মেয়াদ দু'বছর। সেই হিসাবে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু ওই কমিটি নির্বাচন না দিয়ে জোর করে নেতৃত্বে বহাল রয়েছে। এ নিয়ে কেউ প্রতিবাদও করতে পারেন না। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানের চাকরির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে। কেউ চাকরি থেকে অবসরে গেলে তিনি আর সিবিএ নেতা থাকতে পারেন না। অথচ তিনি বহাল আছেন।
বিসিআইসির এক কর্মচারী জানান, শ্রম আইনের ১৮০ ধারার বিধান অনুযায়ী চাকরি শেষ হওয়ার পর সাধারণ সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন। কিন্তু সংগঠনের কোনো পদে থাকতে পারেন না।
নবাবগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা এম এ হামিদ মঞ্জুর ছেলে মো. মিরাজ অভিযোগ করেন, ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিসিআইসিতে এমএলএসএস পদে চাকরি পান। তার আগেই চাকরি দেওয়ার জন্য তার কাছ থেকে ছয় লাখ টাকা নেন সিবিএ নেতা সাইদুর রহমান, দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী, কাজী রফিকুল ইসলাম মাসুদ ও নুরুল হাদী। পরে জানতে পারেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কোনো তদবির ছাড়াই তার চাকরি হয়েছে। পরে ওই টাকা ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন দেবো-দিচ্ছি করে ঘোরাতে থাকে। একপর্যায়ে টাকা ফেরত না দিয়ে মিরাজকে হুমকি-ধমকি দিতে থাকে। পরে উল্টো আরও ১০ লাখ টাকা দাবি করে। না হলে মিরাজকে চাকরিচ্যুত করা হবে বলে শাসায়। ২০১৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বিসিআইসি কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই মিরাজকে চাকরিচ্যুত করে।
মিরাজ জানান, ওই সিবিএ নেতারাই কর্তৃপক্ষকে চাপ দিয়ে তাকে চাকরিচ্যুত করিয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনো কারণ দর্শানো ব্যতিরেকে চাকরিচ্যুত করার যে কালো আইন আছে বিসিআইসির, সেটা ব্যবহার করা হয়েছে।
বিসিআইসির কর্মচারীরা জানান, বিসিআইসির কর্মচারীদের জন্য মিরপুর চিড়িয়াখানা রোডে কোয়ার্টার রয়েছে। ওই কোয়ার্টার বরাদ্দ পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন সিবিএ নেতারা। এ জন্য বাসা বরাদ্দ পেতে আগ্রহীদের কাছ থেকে নেওয়া হয় ৬০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। যারা টাকা দেন, তারাই বাসা বরাদ্দ পান। গাড়িচালক আশফাকুল সিদ্দিকী, জুনিয়র ক্লার্ক কামরুল ইসলাম, দপ্তর সহকারী জসিম উদ্দিন আহমেদ, কম্পিউটার অপারেটর ফয়েজ আহমেদ, এমএলএসএস জাহাঙ্গীর হোসেনসহ অনেককেই এভাবে টাকা দিয়ে বাসা বরাদ্দ পেতে হয়েছে। এ ছাড়া সিবিএ সভাপতি শেখ নুরুল হাদী বিসিআইসি কলোনির পি-৫/৫ এর ৬নং ফ্ল্যাটটি নিজের নামে বরাদ্দ নিলেও নিজে না থেকে সেটা ভাড়া দেন। নিজে থাকেন খিলগাঁওয়ে নিজের ফ্ল্যাটে। এ ছাড়া রূপনগরে তার আরও একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। ৮৭ ইস্কাটনে রয়েছে মেসার্স ভুইয়া এন্টারপ্রাইজ নামের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তার ভাইকে দিয়ে বিসিআইসির সব ধরনের কেনাকাটা ও সরবরাহ কাজ করে থাকে। নুরুল হাদীর পূর্বাচল সংলগ্ন দেবগ্রাম মৌজায় দুটি প্লটও রয়েছে। এ ছাড়া বিসিআইসি কলোনি গেটে রয়েছে কাজী ফার্মেসি নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।
কর্মচারীরা জানান, ২০১৫ সালে কোনো রকম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই পাঁচজনকে গাড়িচালক পদে নিয়োগ দেয় বিসিআইসি। ওই সবগুলো নিয়োগ পায় সিবিএর পছন্দের লোকজন। এ ক্ষেত্রেও টাকা-পয়সার লেনদেন চলে। নিয়োগ পায় সাইদুর রহমানের ভাগ্নে নবাবগঞ্জের কান্দমাত্রা গ্রামের জাফর আলীর ছেলে নাজমুল হাসান। এ ছাড়া নিয়োগ পায় মাসুদ আলম, ওবাইদুল হক, দুলাল মাতব্বর ও ইসমাইল হোসেন।
কর্মচারীরা জানান, মিরপুরের চিড়িয়াখানা রোডে বিসিআইসি কলোনিতে পুরোনো অনেক বড় গাছ ছিল। সিবিএ নেতারা গাছগুলো বিক্রি করে দেন। রাতের বেলায় ইলেক্ট্রনিক করাত দিয়ে গাছগুলো কেটে নিয়ে যায়। আম, মেহগনি ও কাঁঠালগাছ ছিল কলোনিতে। ২০১৬ সালে সরকার বেশ কয়েকটি কারখানা লে-অফ ঘোষণা করে। এতে অন্তত হাজারখানেক কর্মচারীর ভাগ্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। তখন সিবিএ নেতারা তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে টিএসপি কারখানা, সিইউএফএল, যমুনা সার কারখানা, আশুগঞ্জ সার কারখানা ও প্রধান কার্যালয়ে বদলির মাধ্যমে ব্যাপক বাণিজ্য করে।
গত বছর দৈনিক ভিত্তিতে ১০ জন কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ দেয় বিসিআইসি। এ ক্ষেত্রেও ঘুরেফিরে আসে সিবিএ নেতাদের নাম। যারা টাকা দিয়েছেন, তাদেরই চাকরি হয়েছে বলে অভিযোগ। বিসিআইসির কর্মচারীরা জানান, এক সময় এই সিবিএ নেতাদের দাপটের কারণে কর্তৃপক্ষ বিসিআইসির সিবিএ অফিস কক্ষ সিলগালা করে দিয়েছিল। পরে আবার খুলে দেয়। এখন আবার সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
এসব প্রসঙ্গে বিসিআইসি কার্যালয়ে সিবিএর কক্ষে কথা হয় সভাপতি শেখ নুরুল হাদী, কার্যকরী সভাপতি দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমানের সঙ্গে। তারা বলেন, এসব অভিযোগ মিরাজ নামে একটি খারাপ ছেলে বিভিন্ন জায়গায় দিয়ে বেড়াচ্ছে। অথচ ওই মিরাজের চাকরি গেছে আরেকজনের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ভুয়া নিয়োগপত্র দেওয়ার দায়ে। সাইদুর রহমান বলেন, মিরাজ তার আপন ভাগ্নে। ওই মিরাজই তাকে একদিন মারধর করেছিল। অথচ তিনিই মিরাজকে চাকরি দিয়েছিলেন। চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে উৎকোচ নেওয়ার ব্যাপার তিন সিবিএ নেতাই অস্বীকার করেন। তারা বলেন, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে তারা চেষ্টা করতেন কীভাবে তার চাকরি ফেরত দেওয়া যায়। কিন্তু মিরাজ এমনভাবে চাকরি ফেরতের আবেদন করেছে যে, সেখানে বিসিআইসির বড় বড় কর্মকর্তার অনিয়ম-দুর্নীতির খতিয়ান তুলে ধরেছে। এ নিয়ে তদন্ত কমিটিও হয়েছে। কমিটি তদন্ত করছে।
বাসা বরাদ্দ সম্পর্কে সিবিএ নেতারা বলেন, বাসা বরাদ্দের জন্য একটি কমিটি রয়েছে। তারা ওই কমিটির সদস্য। কাজেই পুরো বাসা বরাদ্দই যে সিবিএ নেতাদের কথামতো হয়, তা নয়। তারা সুপারিশ করতে পারেন। বরাদ্দ দেয় কর্তৃপক্ষ।
বদলি বাণিজ্য সম্পর্কে সিবিএ নেতারা বলেন, এসব কাহিনি একদমই ঠিক নয়। গাছ কাটা প্রসঙ্গে বলেন, অভিযোগ সঠিক নয়। এ ধরনের কোনো গাছ কাটার ঘটনা ঘটেনি। বরং যারা এ রকম অভিযোগ করছে, তারা কলোনির মধ্যে পরিবেশ খারাপ করে ফেলেছিল। এ জন্য তাদের নামে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। বাসা বরাদ্দ নিয়ে ভাড়া দেওয়া প্রসঙ্গে সভাপতি নুরুল হাদী বলেন, তিনি বাসা বাতিল করার জন্য কর্তৃপক্ষকে বলে দিয়েছেন। বর্তমানে সিবিএ কমিটিতে সাবেক বিএনপিপন্থি সিবিএ নেতার প্রবেশ প্রসঙ্গে নুরুল হাদী বলেন, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন দেখা যায় আগের দলের লোকজন ঢুকে পড়ে। এ ক্ষেত্রেও দু-একটা এ রকম হতে পারে। অবশ্য সাবেক বিএনপিপন্থি সিবিএ নেতা ও বর্তমান আওয়ামী লীগপন্থি সিবিএর কার্যকরী সভাপতি দেলোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, তিনি কখনোই বিএনপির শ্রমিক দলের সাথে ছিলেন না। যে কমিটিতে তার নাম থাকার কথা বলা হচ্ছে, ও রকম কাগজ তৈরি করা কোনো ব্যাপারই নয়।
