অনলাইন কার্যক্রম শুরু আজ
ডাটাবেসে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৩৪ | আপডেট: ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৪:৪৭
মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কত- এমন প্রশ্নে গত ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক জানিয়েছিলেন, দুই লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৭ জন। তবে এবার সে তালিকা থেকে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমে এসে দাঁড়িয়েছে দুই লাখের কাছাকাছি। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে হঠাৎ করে প্র্রায় ৩৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধা কমে গেল কোথায়? এ প্রশ্ন খোদ মন্ত্রণালয়েরই। পরে আইটি বিভাগ জানায়, অনলাইন ডাটাবেসে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাভুক্তির পর দ্বৈত গেজেটধারীরা সবাই বাদ পড়েছেন।
জানা গেছে, একই ব্যক্তি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন তালিকায় গেজেটভুক্ত হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা বেড়ে দুই লাখ ৩৫ হাজারে দাঁড়িয়েছিল। তবে সরকার অনলাইন ডাটাবেসের মাধ্যমে সমন্বিত তালিকা করার পর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমে এখন হয়েছে প্রায় দুই লাখ। আজ রোববার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ সম্মেলন থেকে সমন্বিত এ তালিকা (ডাটাবেস) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। সংবাদ সম্মেলন থেকে ১১ হাজার রাজাকারের তালিকা প্রকাশের ঘোষণা দেওয়ারও কথা রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, 'ডাটাবেসের আওতায় আনার পর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি নজরে এলে খোঁজ নিয়েছি। আইটি শাখা বলছে, সমন্বিত তালিকা করায় মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা কমেছে। এর সংখ্যা দুই লাখের নিচে।' এ বিষয়ে মন্ত্রী নিজেকে উদাহরণ দিয়ে বলেন, 'আমার নাম ভারতীয় তালিকা, লাল মুক্তিবার্তা ও গেজেটে পৃথকভাবে মন্ত্রণালয়ে নথিভুক্ত আছে। এখন ডাটাবেসে সমন্বিত তালিকা করার পর আমার নাম একবারই তালিকাভুক্ত হয়েছে। এটি সবার ক্ষেত্রেই হয়েছে। যার ফলে একই ব্যক্তির বিভিন্ন ধরনের তালিকায় থাকার আর সুযোগ থাকছে না। তবে প্রকৃত কোনো মুক্তিযোদ্ধা বাদ পড়লে তার নাম ডাটাবেসে যুক্ত করা হবে।'
এটিই চূড়ান্ত তালিকা কি না- এমন এক প্রশ্নে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেন, 'মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির জন্য (প্রায় দেড় লাখ ব্যক্তির) কিছু আবেদন বর্তমানে যাচাই-বাছাই হচ্ছে। আশা করছি, আগামী বছরের ২৬ মার্চের আগেই এই কার্যক্রম শেষ করা যাবে। এটি হওয়ার পরেই চূড়ান্ত তালিকা প্রণয়নের কাজও শেষ হবে।'
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নথিপত্র অনুযায়ী বর্তমানে গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই লাখ ৩৫ হাজার ৪৬৭। এর মধ্যে ভাতা পাচ্ছেন এক লাখ ৮৭ হাজার ৯৮২ জন। তবে এখন ১৯ ক্যাটাগরিতে মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো- শহীদ বেসামরিক গেজেট, সশস্ত্র বাহিনী শহীদ গেজেট, শহীদ বিজিবি গেজেট, শহীদ পুলিশ গেজেট, বেসামরিক যুদ্ধাহত গেজেট, খেতাবপ্রাপ্ত গেজেট, মুজিবনগর গেজেট, সেনাবাহিনী গেজেট, বিমানবাহিনী গেজেট, নৌবাহিনী গেজেট, বিজিবি গেজেট, পুলিশ বাহিনী গেজেট, আনসার বাহিনী গেজেট, নৌ কমান্ডো গেজেট, স্বাধীন বাংলা বেতার শব্দসৈনিক গেজেট, বীরাঙ্গনা গেজেট, স্বাধীন বাংলা ফুটবল গেজেট, ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়ন বিশেষ গেরিলা বাহিনী গেজেট এবং বিশ্রামগঞ্জ হাসপাতালে নিয়োজিত ডাক্তার ও সেবাকর্মী গেজেট। এ ছাড়া শিগগিরই জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা সমন্বয় কমিটির গেজেট প্রকাশের বিষয়টি অপেক্ষমাণ রয়েছে। সমন্বিত তালিকায় একজন মুক্তিযোদ্ধাকে একটি আইডি ধরে তার অন্য সব পরিচয় (ভারতীয় তালিকা/লাল মুক্তিবার্তা/খেতাবসহ সব ধরনের ক্যাটাগরি) নথিভুক্ত করা হয়েছে। ওয়েবসাইটে প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা তালিকার তথ্যানুযায়ী বর্তমানে বেসামরিক গেজেটভুক্ত দুই হাজার ৯২২ জন, সশস্ত্র বাহিনী শহীদ এক হাজার ৬২৮, শহীদ বিজিবি ৮৩২ এবং শহীদ পুলিশ ৪১৩ জন।
ডাটাবেসের আওতায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা প্রকাশের বিষয়ে জানতে চাইলে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির বলেন, 'এটি খুবই ভালো উদ্যোগ। এটি আরও আগেই হওয়া উচিত ছিল। আশা করি, এ তালিকায় কোনো অমুক্তিযোদ্ধা থাকবে না। যদি থাকে, তাহলে তাও চিহ্নিত করে বাদ দিতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্তির কার্যক্রম কখনও বন্ধ করা ঠিক হবে না। প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের অবশ্যই যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তালিকাভুক্তির সুযোগ থাকা উচিত। এটা বলা ঠিক হবে না যে তালিকাভুক্তি আর হচ্ছে না। তা যদি হয়, তাহলে সেটি অবশ্যই দুঃখজনক। কারণ বীরাঙ্গনা, প্রবাসীসহ অনেকেই এখনও মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি থেকে বাইরে রয়েছেন। তারা যদি কখনও স্বীকৃতি চান, তাহলে তার বা তাদের সেই সুযোগ চলমান থাকা উচিত।'
মন্ত্রণালয়ের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকারের আমলে এ পর্যন্ত ছয়বার তালিকা প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রথম তালিকা প্রণয়ন হয় ১৯৮৬ সালে। তখন জাতীয় কমিটি প্রণীত এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮ মুক্তিযোদ্ধার নাম পাঁচটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশ করা হয়। তবে ওই তালিকা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়নি। ১৯৮৮ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের করা তালিকায় এ সংখ্যা ছিল ৭০ হাজার ৮৯২ জন। পরে ১৯৯৪ সালে বিএনপির আমলে তালিকাভুক্ত হিসেবে ওই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬ হাজার। ১৯৯৮ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জনের নামের খসড়া প্রকাশ করে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। এর পর যাচাই-বাছাই করে মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল থেকে প্রকাশিত মুক্তিবার্তায় এক লাখ ৫৪ হাজার ৪৫২ জনের নাম প্রকাশ করা হয়। তাদের মধ্যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৪৭ হাজার সনদে সই করেন। সর্বশেষ ২০০১ থেকে ২০০৬ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট আমলে গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় এক লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালে এসে সপ্তমবারের মতো মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়ন ও সংশোধনের উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। এর আলোকে ২০১৪ সালের ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অনলাইনে আবেদন করার সময়ও বেঁধে দিয়েছিল মন্ত্রণালয়। নির্দিষ্ট ওই সময়ে অনলাইনে প্রায় দেড় লাখ আবেদন মন্ত্রণালয়ে জমা পড়ে তখন। ২০১৭ সালের ২১ জানুয়ারি ওই দেড় লাখ আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের কার্যক্রম শুরু হয়, যা এখনও চলছে।
