ঢাকা শনিবার, ২০ জুন ২০২৬

রাজাকারের তালিকা: ষড়যন্ত্র দেখছেন মুক্তিযোদ্ধারা

রাজাকারের তালিকা: ষড়যন্ত্র দেখছেন মুক্তিযোদ্ধারা
×

মঙ্গলবার বরিশালে রাজাকারের তালিকায় অগ্নিসংযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তপন চক্রবতী ও তার মেয়ে বাসদ নেত্রী ডা. মনীষা চক্রবর্তী -সমকাল

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:৪৫ | আপডেট: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১০:৫৩

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অনেকের নাম আসায় দেশজুড়ে বইছে নিন্দা ও প্রতিবাদের ঝড়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনাসহ মঙ্গলবার বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। তালিকায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে। সংশ্নিষ্ট মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজনসহ মুক্তিযোদ্ধা এবং আওয়ামী লীগ নেতারা এ তালিকা সংশোধন করে, সঠিক তালিকা প্রকাশ এবং এর সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষের শক্তি ষড়যন্ত্র করে এ তালিকা প্রণয়ন করেছে।

রাজশাহী ব্যুরো জানায়, বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান আইনজীবীর নাম রাজাকারের তালিকায় এসেছে। অথচ কুখ্যাত রাজাকার আয়েন উদ্দীন, আফাজউদ্দীন, জাফর ইমামদের নাম নেই। এতে হতবাক ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

মুক্তিযুদ্ধকালীন রাজশাহী অঞ্চলের গেরিলা কমান্ডার শফিকুর রহমান রাজা বলেন, 'অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম রাজশাহী অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাদের সুসংগঠিত করেছেন। বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে বেরিয়ে তার বাড়িতে অতিথি হয়েছিলেন। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরু হলে প্রথম তার বাড়িতে অভিযান চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তাকে না পেয়ে তার দুই ছেলে সেলিম ও ওয়াসিম, ছোট ভাই হাসানুজ্জামান খোকা, ভগ্নিপতি সাইদুর রহমান মিনা, ভাগ্নিজামাই তৎকালীন এমএনএ নজমুল হক সরকারকে ধরে নিয়ে হত্যা করে তারা। এই আব্দুস সালাম আজ হয়ে গেলেন রাজাকার।'

শফিকুর রহমান রাজা আরও বলেন, 'অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম, অ্যাডভোকেট মহসিন এবং অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু তিনজনই মুক্তিযুদ্ধের বড় সংগঠক ছিলেন। সালাম সাহেবকে আমি ভগবান গোলায় মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্পে দেখেছি। রাজশাহী জেলা ন্যাপের সহসভাপতি গোলাম আরিফ টিপু ছিলেন মালদা গেরিলা ক্যাম্পে। মুক্তিযুদ্ধকে সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য চাঁপাইনবাবগঞ্জে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন টিপু। মহসিন সাহেব শেখপাড়া পানিপ্রিয়া মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুটিং ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন। তার স্বাক্ষর করা মুক্তিযোদ্ধা সনদ পেয়েছেন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা।'

রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার মোহাম্মদ আলী কামাল বলেন, 'এই তিনজনের নাম রাজাকারের তালিকায় আসাটা খুবই লজ্জার। এটা জরুরিভিত্তিতে সংশোধন দরকার।'

বরিশাল ব্যুরো জানায়, মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী ও তার মা ও শহীদজায়া উষা রানী চক্রবর্তীর নাম রাজাকারের তালিকায় আসায় প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর সদর রোড অশ্বিনী কুমার হলের সামনে বিতর্কিত এ তালিকায় আগুন ধরিয়ে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। এর আগে সকাল ১১টায় ফকিরবাড়ি রোডের জেলা বাসদ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদজায়ার নাম রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সব মানুষের জন্য লজ্জাজনক। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এটা করা হয়েছে। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। মিছিল শেষে অশ্বিনী কুমার হল চত্বরে তপন চক্রবর্তী ও মনীষা চক্রবর্তী রাজাকারের এই তালিকায় অগ্নিসংযোগ করেন। এ সময় তপন চক্রবর্তী বলেন, বিজয়ের ৪৮ বছর পর রাজাকারের তালিকায় আমার ও আমার মার নাম যুক্ত করা হয়েছে। এর পেছনে বড় ষড়যন্ত্র রয়েছে। এ তালিকা বাতিল করে রাষ্ট্রকে ক্ষমা চাইতে হবে।

বগুড়া ব্যুরো ও আদমদীঘি প্রতিনিধি জানান, বগুড়ার বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতার নাম তালিকায় থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তালিকাটি সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ আদমদীঘি উপজেলা কমান্ডের সাবেক কমান্ডার আব্দুল হামিদ জানান, ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের কাছে রাজাকারদের তালিকা চাওয়া হয়। ২৩ নভেম্বর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় থেকে ১১০ জনের তালিকা পাঠানো হয়। সেখানে বিএনপির প্রয়াত সাংসদ আব্দুল মজিদ তালুকদার ও আব্দুল মোমেন তালুকদারও ছিল। মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হাফিজার রহমান বলেন, 'আমাদের ধারণা ছিল ওই তালিকা অনুসরণেই রাজাকারের তালিকা প্রস্তুত এবং প্রকাশ করা হবে। কিন্তু গত ১৫ ডিসেম্বর যে ৩১ জনের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে তাতে আমাদের দেওয়া তালিকা থেকে মাত্র পাঁচ রাজাকারের নাম এসেছে। উল্টো মুক্তিযুদ্ধের দুই সংগঠক, সাত মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের আরও অন্তত ২১ জনের নাম রাজাকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।'

সাবেক কমান্ডার আব্দুল হামিদ বলেন, সাবেক প্রাদেশিক সদস্য কছিম উদ্দিন আহম্মেদ ভারতের মধুপুরে আমাদের ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন। জাতীয় পরিষদ সদস্য মজিবর রহমান ছিলেন ভারতে, আমাদের ক্যাম্পগুলো ঘুরে সবার খোঁজ-খবর নিতেন। মনছুর আলী ছিলেন যুদ্ধকালীন কমান্ডার। অথচ আজ তারা হয়ে গেলেন রাজাকার। আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি তাহের উদ্দীন সরদার, সাবেক রেলওয়ে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা জাহান আলী, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা আমিরুল ইসলাম, আওয়ামী লীগ নেতা ফয়েজ উদ্দীন আহম্মেদসহ অনেক স্বাধীনতার পক্ষের ব্যক্তির নামও রাজাকারের তালিকায় স্থান পেয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার প্রয়াত মনছুর আলীর ছেলে খোকন আলী ওই তালিকা সংশোধনের দাবি জানিয়ে বলেন, 'শুধু তালিকা প্রত্যাহার করলেই হবে না। কেন, কীভাবে নামগুলো এলো, কারা এর সঙ্গে জড়িত তাদেরও চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে হবে।'

বরগুনা ও পাথরঘাটা প্রতিনিধি জানান, রাজাকারদের তালিকায় পাথরঘাটায় মুক্তিযোদ্ধা সংঠকের নাম আসায় প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাসহ আওয়ামী লীগ নেতারা। এ ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার সকাল ১১টায় পাথরঘাটা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন এবং দুপুর ১২টায় শহরের শেখ রাসেল স্কয়ারে মানববন্ধন হয়েছে। এ ছাড়া পাথরঘাটা বণিক সমিতি দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বাজারের সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে প্রতিবাদ জানায়। বিকেলে রাসেল স্কয়ারে প্রতিবাদ সভা করে উপজেলা আওয়ামী লীগ।

উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হাবিবুর রহমান বলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কর্নেল ওসমানী শুধু সনদে সই করে দিয়েছিলেন; কিন্তু ওই সনদে সব মুক্তিযোদ্ধার নাম লিখেছিলেন মজিবুল হক নিজ হাতে। তখন নিজেও কোনো মুক্তিযোদ্ধা সনদ নেননি। ১৯৮৬ সালে বরগুনা-২ আসন থেকে মজিবুল হক আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ নির্বাচন করেন। তিনি আরও বলেন, উপজেলায় আটজন রাজাকারের তালিকায় দু'জন মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে, তারা সরকারের নিয়মিত ভাতা পাচ্ছেন।

এদিকে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মজিবুল হকের সহধর্মিণী নুরজাহান বেগম ও ছেলে শাহীন মিয়া এ ঘটনায় অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি পাঠানো হয়েছে। শাহীন বলেন, 'আমার বাবা প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে আমৃত্যু আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।' নুরজাহান বেগম বলেন, 'আমার স্বামীকে বঙ্গবন্ধু খুব ভালোবাসতেন, ডেকে বলতেন মজিবর তোমার কী দরকার আমাকে বল, কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটতেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার স্বামীর চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আমি এ ঘটনায় খুবই মর্মাহত।'

ঝালকাঠি প্রতিনিধি জানান, তালিকায় ঝালকাঠির সাবেক জেলা কমান্ডার প্রায়াত সৈয়দ শামসুল আলমসহ একাধিক মুক্তিযোদ্ধার নাম রয়েছে। অথচ তালিকায় ঝালকাঠি শান্তি কমিটির সলিমুদ্দিন মিয়া, পশ্চিম ঝালকাঠির রাজাকার সামসুদ্দিন তালুকদার ওরফে ছনতু তালুকদার ও আব্দুর রশিদ বাদশাসহ আরও অনেক রাজাকারের নাম নেই। এ বিষয়ে জেলা সদরের মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য শহীদ ইমাম পাশা বলেন, শামসুল আলমের নাম রাজাকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তা ভাবতেই পারছি না। ঝালকাঠির সাবেক ডেপুটি কমান্ডার দুলাল সাহা বলেন, এ তালিকা অসংগতিপূর্ণ। সংবাদ সম্মেলন করে এর প্রতিবাদ জানানো হবে।

সদ্য প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় ৫ নম্বরে রয়েছে রাজাপুর উপজেলার সাবেক কমান্ডার ও মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বছাই কমিটির সদস্য এনায়েত হোসেন ওরফে মিলু খানের নাম। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর রাজাকারের তালিকায় নিজের নাম দেখতে হবে, এটা লজ্জার। তালিকায় ১ নম্বরে থাকা প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক মৃধার নাম দেখে হতবাক তার ভাই সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মিলন মাহমুদ বাচ্চু মৃধা। তিনি বলেন, আমরা তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিই। এই অপরাধে পাকিস্তান বাহিনী আমার বাবাকে ধরে নিয়ে থানায় আটকে রেখে নির্যাতন করে।

সিরাজগঞ্জ ও উল্লাপাড়া প্রতিনিধি জানান, মুক্তিযুদ্ধে উত্তর জনপদের বৃহত্তম সংগঠন 'পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের' সর্বাধিনায়ক মির্জা আব্দুল লতিফ ও তার সহকর্মী সাবেক জাসদ নেতা অ্যাডভোকেট খুরশিদ আলমের নাম রাজাকারের তালিকায় থাকায় বিস্মিত হয়েছেন উল্লাপাড়া ও শাহজাদপুরবাসী। প্রয়াত ওই দুই নেতার নাম রাজাকারের তালিকায় থাকায় আওয়ামী লীগ নেতারাসহ স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মির্জা আব্দুল লতিফ দু'বার সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি সিরাজগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক এবং জাতীয় সংসদের প্যানেল স্পিকারের দায়িত্বও পালন করেন। মির্জা আব্দুল লতিফের মেয়ে সেলিনা মির্জা বলেন, 'তার পরিবার ও স্বজনরা এ তালিকা দেখে হতবাক। এটা মুক্তিযোদ্ধাসহ পুরো জাতির জন্য অসম্মানজনক। মির্জা আব্দুল লতিফ রাজাকার হলে বাংলাদেশই অবৈধ হয়ে যায়।'

উল্লাপাড়ার সাবেক কমান্ডার ও আওয়ামী লীগ নেতা গোলাম মোস্তফা বলেন, তারা ইতোমধ্যেই এর প্রতিবাদে মিছিল ও শহীদ মিনারে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি অ্যাডভোকেট বিমল কুমার দাস বলেন, এ ধরনের বিতর্কিত তালিকা যারা প্রণয়ন করেছেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর সম্মান ক্ষুণ্ণ করতে চক্রান্ত করছেন কি-না, সেটি খতিয়ে দেখা উচিত।

জেলা প্রশাসক ড. ফারুক আহাম্মদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধে আব্দুল লতিফ মির্জার অবদানের কথা সিরাজগঞ্জবাসী শুধু নয়, পুরো দেশবাসী জানে।

আরও পড়ুন

×