নারী মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারা বেগম
দেশ স্বাধীন করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য
লতিফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪৯
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত করতে পুরুষের পাশাপাশি
নারীরাও রণাঙ্গনে বীরের মতো লড়েছেন। পরিবার-পরিজনের কথা না ভেবে জীবনকে
তুচ্ছ করে স্বাধীনতার জন্য হাতে তুলে নিয়েছেন অস্ত্র। তাদেরই একজন অধ্যাপক
ড. এসএম আনোয়ারা বেগম। তার বোন মনোয়ারা বেগম ও ভাই সরদার আবদুর রশিদও ছিলেন
মুক্তিযোদ্ধা। তাদের পুরো পরিবারই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা
সংগ্রামে জড়িত।
বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান
হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অধ্যাপক আনোয়ারা বেগম। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের
একমাত্র ছাত্রী হল শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের প্রভোস্টের দায়িত্বেও
রয়েছেন।
তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্ষুধা, দুর্বলতা- এমন কোনো কিছু আমাদের
মধ্যে কাজ করেনি। আমাদের ভাবনায় ছিল- যে কোনোভাবে জীবন বাজি রেখে দেশ
স্বাধীন করতে হবে। আমরা বুঝতাম স্বাধীন হলেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশে আসতে
পারবেন। না হলে পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করবে। এমনকি তারা আমার
মাকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তিনি বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন- সে চিন্তাও তখন
আমার মাথায় ছিল না। দেশ স্বাধীন করতে হবে- এটাই ছিল লক্ষ্য।
১৯৫৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পটুয়াখালীর কালিকাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন
আনোয়ারা বেগম। তার এক বছরের বড় বোন মনোয়ারা বেগম। মা-বাবা, পাঁচ বোন ও এক
ভাই নিয়ে ছিল তাদের পরিবার। পারিবারিকভাবেই রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন
তারা। বড় ভাই সরদার আবদুর রশিদ তখন পটুয়াখালী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ
সম্পাদক। বড় ভাইকে অনুসরণ করে রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়েন দুই বোন।
১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন ছিল রাজনীতিতে হাতেখড়ি। সাহসিকতার জন্য এলাকার
সবার মুখে মুখে তখন তাদের দু'জনের নাম। আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নেওয়ায়
আনোয়ারাকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার হুমকিও আসে। কিন্তু থেমে থাকেনি
পথচলা। বড় ভাই বেশ কয়েকবার কারাগারেও গেছেন। আইয়ুব খানের মার্শাল কোর্টে
তাকে সাজাও দেওয়া হয়।
১৯৭১ সালে পটুয়াখালী সরকারি কলেজের ছাত্রী আনোয়ারা ও মনোয়ারা। ২৬ মার্চ
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এলাকার তরুণদের সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেন।
এলাকায় বেশকিছু বাংকার তৈরি করেন। তিন ভাই-বোন পটুয়াখালী জুবিলী কলেজের
মাঠে অন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ২৬ মার্চ থেকে প্রায় এক মাস অস্ত্র
প্রশিক্ষণ নেন। এ খবর পাকিস্তানি হানাদার ও শান্তি বাহিনীর লোকদের কাছে
পৌঁছলে তারা হন্যে হয়ে এ তিনজনকে খুঁজতে থাকে।
আনোয়ারা বেগম জানান, ১১ এপ্রিল আক্রান্ত হয় পটুয়াখালী। পাকিস্তান
সেনাবাহিনীর মেজর নাদের পারভেজ নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে। মা-বোনদের
সল্ফ্ভ্রমহানি এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ সময়
গ্রামের কাঁচা রাস্তা, খালবিল, নদী, সাঁকো পার হয়ে ৪-৫ দিন পর এক আত্মীয়ের
বাড়িতে আশ্রয় নেন আনোয়ারা। মাকে ওই বাড়িতে রেখে রাতেই ভাইবোনকে নিয়ে
অন্যত্র চলে যান তিনি। ওই রাতেই হানাদার বাহিনী আনোয়ারার মাকে ধরে নিয়ে
প্রথমে গলাচিপা থানা এবং পরে পটুয়াখালী সদর থানায় চালান করে।
এলাকায় ঘোষণা করা হয়, তাদের দুই বোনকে জীবিত অথবা মৃত ধরিয়ে দিতে পারলে ৫০
হাজার টাকা ও ৩০ ভরি স্বর্ণ পুরস্কার দেওয়া হবে। তখন তাদের আশ্রয় দিতে
অনেকেই আপত্তি জানায়। তবে নিশানবাড়িয়ার সফিউদ্দিন বিশ্বাস নামে এক পীর তার
মুরিদদের বলেন তাদের আশ্রয় দিতে। পীরের মুরিদরা তিন ভাইবোনকে আগুনমুখা নদীর
ধারে একটি জঙ্গলে রেখে আসেন। সেখানে তারা তিন দিন না খেয়ে থাকেন। ওই
জঙ্গলেও হানাদার বাহিনী ও রাজাকাররা গিয়ে হাজির হয়। এক দিন প্রায় ধরা পড়তে
পড়তে বেঁচে গিয়েছিলেন। ইতোমধ্যে ৯ নম্বর সেক্টরের অধীন সাব সেক্টরের প্রধান
মেজর জিয়াউদ্দিনের কাছে তাদের খবর পৌঁছায়। পরে রাত ২টার দিকে একদল
সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা তিনটি বোটে করে তাদের উদ্ধার করেন। বয়স কম হওয়ায় দুই
বোনকে যুদ্ধে না যাওয়ার পরামর্শ দেন মেজর জিয়াউদ্দিন। তাদের দেশপ্রেম ও দৃঢ়
মনোবলের কারণে দলে নিতে বাধ্য হন তিনি। ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে সরাসরি
যুদ্ধে অংশ নেন দুই বোন। প্রথমে সৈনিক ইসমাইল মিয়া ও পরে মেজর জিয়াউদ্দিনের
কাছে প্রশিক্ষণ নেন। অস্ত্র প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল গ্রেনেড নিক্ষেপ,
স্টেনগান, মেশিনগান, কারবাইন, এসএলআর, থ্রি নট থ্রি রাইফেল, এলএমজি ইত্যাদি
চালনা। বড় ভাই আরও প্রশিক্ষণের জন্য ভারতে চলে যান। দুই বোন সুন্দরবনে
সেন্ট্রি ও অপারেশনের রেকির কাজ করেন। সুন্দরবন, শরণখোলা, রায়েন্দা,
নামাজপুর, তুষখালী, কাকচিড়া, ডোবাতলা, পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে মেজর
জিয়াউদ্দিনের নেতৃত্বে সরাসরি যুদ্ধ করেন তারা।
যুদ্ধের সময়ের একটি করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানান আনোয়ারা। বলেন, দীর্ঘ সাত মাস
তারা সুন্দরবন এলাকায় যুদ্ধ করেন। সেখানে প্রায় ১১শ' মুক্তিযোদ্ধা ছিল।
খাবার না থাকায় রোজার ঈদের দিনও না খেয়ে থাকতে হয়েছে। পরদিন তুষখালীতে
অভিযান চালিয়ে গুদাম থেকে চাল এনে রান্না করে খাবার খান তারা।
মুক্তিযুদ্ধের শেষে ভারত বাংলাদেশেকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর তারা ফাতরার চরে
নারীদের অত্যাচারের খবর পান। পরে সেখানে আক্রমণ চালান। এ সময় ৩৫ জন
পাকিস্তানি সেনা তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। রাজাকারদের তিনটি ক্যাম্প দখল
করে প্রচুর অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ নির্যাতিত মেয়েদের উদ্ধার করেন।
ষাটের দশকে শেষ ভাগে রাজপথের লড়াকু সৈনিক এসএম আনোয়ারা বেগম ছাত্রলীগের
পটুয়াখালী জেলার কর্মী, সংগঠক ও নেত্রী ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে
অনার্স-মাস্টার্স ও জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন
করেন। তিনি বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি, নীল দলের আহ্বায়ক ও ছাত্রকল্যাণ পরিচালকের দায়িত্ব
পালন করেছেন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য অধ্যাপক আনোয়ারা ২০১৫ সালে শ্রেষ্ঠ
শিক্ষক হিসেবে 'ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন' স্বর্ণপদক পান।
নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান
থেকে একাধিক সম্মাননা পদক পেয়েছেন তিনি।
- বিষয় :
- নারী মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ারা বেগম
