শীতে জীবন কাবু
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:১৬
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু
শৈত্যপ্রবাহ। মধ্যাঞ্চলেও বইছে হিমেল হাওয়া। এর প্রভাবে গতকাল শুক্রবারও
কনকনে ঠান্ডায় জনজীবন প্রায় স্থবির ছিল। দিনভর আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। আজ
শনিবারও ঢাকাসহ বেশিরভাগ এলাকায় সূর্য উঁকি নাও দিতে পারে।
ঘন কুয়াশার কারণে শুক্রবার সকালে বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইট
শিডিউল এলোমেলো হয়ে যায়। নদী পারাপারে ফেরি চলাচলও ব্যাহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
পাটুরিয়া-দৌলতদিয়ায় বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত সাত ঘণ্টা
ফেরি চলাচল বন্ধ ছিল। এ পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনা এড়াতে মহাসড়কে চলাচলরত
যানবাহন চালকদের অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ।
এদিকে পাল্লা দিয়ে শীত বাড়তে থাকায় রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে শীতবস্ত্র কিনতে মানুষের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য মতে, শনিবার পর্যন্ত শৈত্যপ্রবাহ অব্যাহত থাকতে
পারে। তবে রাতের তাপমাত্রা যেভাবে কমে যাওয়ার পূর্বাভাস ছিল, সেভাবে না
কমায় শৈত্যপ্রবাহ বিস্তার লাভ করতে পারেনি। গতকাল দেশের সর্বনিম্ন
তাপমাত্রা ছিল চুয়াডাঙ্গায় ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শুক্রবার সন্ধ্যায়
ঢাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় ১৩ দশমিক ৪ এবং সর্বোচ্চ
তাপমাত্রা ছিল ১৭ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগামীকাল রোববার থেকে দিন ও
রাতের তাপমাত্রা কিছুটা বাড়তে পারে।
আবহাওয়াবিদ রুহুল কুদ্দুস সমকালকে বলেন, গত বুধবার থেকে দেশের বিভিন্ন
স্থানে তাপমাত্রা কমতে থাকে। একদিনের ব্যবধানে চার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত
কমে যায়। বিশেষ করে রাতের তাপমাত্রা আরও কমে যাওয়ার পূর্বাভাস ছিল। তা না
হওয়ায় আপাতত শৈত্যপ্রবাহ নতুন নতুন জেলায় বিস্তার করার সম্ভাবনা নেই।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, রংপুর, চুয়াডাঙ্গা, যশোর, রাজশাহী, পাবনা,
নওগাঁ, কুড়িগ্রাম ও নীলফামারী অঞ্চলের ওপর দিয়ে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, মেঘাচ্ছন্ন ও কুয়াশায় ঢাকা পথে দুর্ঘটনা এড়াতে সতর্কতা অবলম্বনের
পরামর্শ দিয়েছে হাইওয়ে পুলিশ। হাইওয়ে পুলিশের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে,
বর্তমানে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে ঘন কুয়াশার কারণে দৃষ্টিসীমা অনেকাংশে
কমে আসছে। তাই সামনের পথচারী ও বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন সম্পর্কে ধারণা
পাওয়া যায় না। ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে।
এ অবস্থায় বাসস্ট্যান্ডে অবস্থানরত ও মহাসড়কে চলাচলরত যানবাহনের চালকদের
কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় ফগলাইট ব্যবহার ও গতিসীমা সীমিত রেখে অতিরিক্ত
সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিমান চলাচল ব্যাহত :ঘন কুয়াশার কারণে শুক্রবার অভ্যন্তরীণ রুটে বিমান
চলাচলে কিছুটা বিঘ্ন ঘটেছে। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ
দিন সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ রুটে পাঁচটি ফ্লাইট
নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কমপক্ষে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে যায়। তবে
আন্তর্জাতিক রুটের ফ্লাইটগুলো সময়মতো ঢাকা ছেড়ে যায় বলে সিভিল এভিয়েশনের
সংশ্নিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সিনিয়র এয়ার ট্রাফিক (স্যাটো)
অফিসার এসএম ওহিদুর রহমান সমকালকে বলেন, শুক্রবার ঘন কুয়াশার কারণে ঢাকা
থেকে যশোর, সৈয়দপুর ও রাজশাহীগামী প্রায় পাঁচটি ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের দেড়
থেকে দুই ঘণ্টা দেরিতে ছেড়ে গেছে।
চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি জানান, চুয়াডাঙ্গায় হঠাৎ করে গত তিন দিন দমকা হাওয়ায়
শীতের প্রকোপ বেড়ে গেছে। বৃহস্পতিবারের মতো শুক্রবারও দেশের সর্বনিম্ন
তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে এখানে। এ ছাড়া ভোর থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে শুরু করে।
কিছুক্ষণের জন্য সূর্য উঁকি দিলেও কোনো উত্তাপ ছড়াতে পারেনি।
চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক সামাদুল হক জানান, শুক্রবার সকালে
এখানে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ৮ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসের গতিবেগ
ছিল ঘণ্টায় ৬ থেকে ৮ কিলোমিটার।
শীতের তীব্রতা থাকায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন খেটে খাওয়া মানুষ।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, দিনে সামান্য সময় সূর্যের দেখা মিললেও ঘন কুয়াশার
কারণে তেমন উত্তাপ মিলছে না। উত্তরের হিমেল হাওয়ায় কনকনে ঠান্ডা বিরাজ
করছে। এতে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ নেমে এসেছে। শুক্রবার রাজশাহীতে সর্বনিম্ন
তাপমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
রংপুর অফিস জানায়, মৃদু শৈত্যপ্রবাহ শুরু হয়েছে উত্তরাঞ্চলে। হিমেল হাওয়া ও
ঘন কুয়াশায় জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। দিনের বেলা মাঝারি ধরনের কুয়াশা
পড়লেও রাতে ঘন কুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় প্রকৃতি। শৈত্যপ্রবাহের কারণে
ক্রমেই তাপমাত্রা কমছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা
রেকর্ড করা হয়েছে ১০ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কনকনে শীতের কারণে হতদরিদ্র
মানুষ পড়েছেন বিপাকে। খড়কুটো জ্বালিয়ে তারা শীত নিবারণের চেষ্টা চালিয়ে
যাচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, তিন দিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি সেখানে।
কনকনে হিমেল হাওয়ার কারণে ঘর থেকে বের হতে পারছেন না মানুষ। শুক্রবার সকালে
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১০ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আগের দিনের চেয়ে
সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে বলে জানিয়েছেন রাজারহাট কৃষি
ও সিনপটিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র
সরকার।
এদিকে, শীতজনিত রোগব্যাধির প্রকোপ বাড়তে শুরু করেছে। জেনারেল হাসপাতালের
আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. শাহীনুর রহমান সরদার জানান, শুক্রবার হাসপাতালের
শিশু ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন ৪৪ শিশুর মধ্যে ৯ জন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত। আর
ডায়রিয়া ওয়ার্ডে ভর্তি ২৫ জনের মধ্যে ২৪ জনই হচ্ছে শিশু।
দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি জানান, সারাদেশের মতো দৌলতপুর উপজেলায়ও জেঁকে
বসেছে শীত। ঠান্ডা বাতাস ও ঘন কুয়াশায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে জনজীবন। শীতজনিত
বিভিন্ন রোগব্যাধি বেড়ে গেছে।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, কনকনে হিমেল হাওয়া আর ঘন কুয়াশায় জেলার
স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দিনের বেলায়ও যানবাহন চলাচল
করছে হেডলাইট জ্বালিয়ে। হতদরিদ্র মানুষ গাছের ঝরে পড়া শুকনো পাতা ও খড়কুটো
জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিতি
কমে গেছে।
- বিষয় :
- শৈত্যপ্রবাহ
