ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, অগ্রগতি শূন্য

প্রকল্পের মেয়াদ শেষ, অগ্রগতি শূন্য
×

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছয়টি পূর্ণাঙ্গ টিভি কেন্দ্র স্থাপনে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। একনেকে অনুমোদনের পর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়।

আবু হেনা মুহিব

প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ অক্টোবর ২০২১ | ০৯:২৫

বাংলাদেশ টেলিভিশনের ছয়টি পূর্ণাঙ্গ টিভি কেন্দ্র স্থাপনে একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। একনেকে অনুমোদনের পর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়। আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের (আইটিইউ) গাইডলাইন অনুযায়ী ডিজিটাল টেরেস্ট্রিয়াল টেলিভিশন ব্রডকাস্টিং (ডিটিটিবি) এবং রাজস্ব বাড়াতে বিজ্ঞাপন এবং অনুষ্ঠান স্পন্সর করা- এমন আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য ছিল সরকারের। গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয় এক হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এই চার বছরে প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি হয়নি। এমনকি প্রকল্প পরিচালকও নিয়োগ দেওয়া হয়নি। এ প্রকল্পের অবস্থা কেন এমন হলো তা জানতে চেয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি দিয়েছে।

আইএমইডি ১৪টি প্রকল্প চিহ্নিত করেছে, যেগুলোর দুটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। বাকি ১২টি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে। এসব প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী মন্ত্রণালয়ের কাছে এত বছরেও কেন কোনো কাজ হলো না তা জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি প্রকল্প বাতিল করার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বছরের পর বছর প্রকল্প বাস্তবায়ন না করে এভাবে পড়ে থাকলে তা সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিশৃঙ্খলা তৈরি করে।

বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক সোহরাব হোসেন সমকালকে বলেন, ছয়টি পূর্ণাঙ্গ টিভি কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পে চীনের এক্সিম ব্যাংকের অর্থায়ন করার কথা। পরামর্শক সেবা দেওয়ার কথা চীনের আরেক প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু এ দুটি প্রতিষ্ঠান গাফিলতি করছে। প্রকল্পের প্রয়োজনীয় কর্মসম্পাদনের জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তি সইয়ের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু তারা আজ-কাল করতে করতেই তিন বছর পার করেছে। দেড় বছর ধরে তারা করোনার অজুহাত দেখাচ্ছে। কিন্তু করোনার মধ্যেও অন্য প্রকল্পে চীনারা কাজ করছে। তথ্যমন্ত্রী এবার কড়া নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, খুব শিগগিরই এগিয়ে না এলে ওই দুই প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিয়ে বিকল্প উৎস থেকে অর্থ এবং পরামর্শক সেবা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে শিগগিরই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ঢাকায় চীনা দূতবাসের সঙ্গে বৈঠকের চেষ্টা করছেন তারা। প্রকল্প পরিচালক কেন নিয়োগ দেওয়া গেল না- জানতে চাইলে মহাপরিচালক বলেন, অর্থায়ন এবং পরামর্শক সেবার চুক্তি হওয়ার পর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব শুরু হওয়ার কথা। অর্থায়ন নিয়ে চুক্তিতে আসতে না পারায় প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি।

তালিকায় রয়েছে 'আমাদের গ্রাম ক্যান্সার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার'-এর নামও। ২২ কোটি ৮৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকার এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর ৩০ জুন।

ক্যান্সার চিকিৎসা ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন প্রকল্পের বিষয়ে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আশরাফ আলী খান খসরু সমকালকে বলেন, এ প্রকল্পের বেসরকারি অংশীদারের কাছ থেকে ঠিকমতো সাড়া পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া দেড় বছর ধরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণও অন্যতম কারণ। আইএমইডির চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি এখনও এ ধরনের চিঠি হাতে পাননি। চিঠি পেলে সব দেখে-শুনে জবাব দেওয়া হবে।

তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়েই কাজটি শেষ হবে বলে গণপূর্ত অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাদেরকে জানানো হয়েছে।

জানতে চাইলে আইএমইডি সচিব প্রদীপ রঞ্জন চক্রবর্তী সমকালকে বলেন, এত প্রকল্পের শূন্য অগ্রগতি খুবই দুঃখজনক। সরকারের উন্নয়ন শৃঙ্খলা এতে ব্যাহত হয়। এ ব্যাপারে ব্যাখ্যা চেয়ে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠির জবাবের অপেক্ষায় আছেন তারা। এরপর করণীয় নির্ধারণ করবেন।

জানা গেছে, শূন্য অগ্রগতির কোনো কোনো প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) তালিকা থেকে বাতিল করার সুপারিশ করেছে আইএমইডি। শূন্য অগ্রগতির প্রকল্পের মধ্যে সর্বাধিক তিনটি প্রকল্প রয়েছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের। দুটি করে প্রকল্প রয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। একটি করে প্রকল্প রয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিদ্যুৎ বিভাগ, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের অন্য প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে সমাজকল্যাণ ভবন নির্মাণ। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়। এর মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী বছরের জুনে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আরও একটি প্রকল্প নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জ সমাজকল্যাণ বালিকা এতিমখানা নির্মাণ। আগামী ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ হওয়ার কথা। শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। রেলের শূন্য অগ্রগতির প্রকল্প দুটি হচ্ছে- আখাউড়া-সিলেট সেকশনের মিটার গেজ রেললাইন ডুয়েল গেজে রূপান্তর। প্রকল্পটি ২০১৯ সালে শুরু হয়েছে। শেষ হওয়ার কথা ২০২৫ সালের জুনে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের আরও একটি প্রকল্প রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশন। প্রকল্পটি আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা। শুরু হয় ২০১৯ সালের জুলাই মাসে।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার কথা নোয়াখালীর সোনাপুরে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্পের। এর বাস্তবায়নকারী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, যার মেয়াদ আগামী বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে। একই মন্ত্রণালয়ের আরও একটি প্রকল্প মাইজদী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন স্বল্প ও মধ্যম আয়ের লোকদের জন্য সাইট অ্যান্ড সার্ভিসেস আবাসিক প্লট উন্নয়ন প্রকল্প। এই প্রকল্প আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা। শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের জুলাই মাসে। দুটি প্রকল্পেরই কোনো কিছু বাস্তবায়ন হয়নি। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিভাগের বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত সক্ষমতা উন্নয়ন প্রকল্প ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সৌদি আরবের রিয়াদে বাংলাদেশ হাউস নির্মাণ প্রকল্প ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা। শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালে। এগুলোর অগ্রগতিও শূন্য।

স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় সড়কবাতি ব্যবস্থার আধুনিকায়নের জন্য নেওয়া প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত। এখনও এ প্রকল্পের কোনো অগ্রগতি নেই। খুলনা কর ভবন নির্মাণ প্রকল্প আগামী জুনে শেষ হওয়ার কথা। শুরু হয়েছিল ২০১৯ সালের জুলাই মাসে। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের চাঁদপুর সেচ প্রকল্পের চর বাগাদী পাম্প হাউস ও হাজিমারা রেগুলেটর পুনর্বাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। শুরু হয় ২০১৭ সালে। ঢাকায় কমিউনিটি নার্সিং ডিগ্রি কলেজ নির্মাণ প্রকল্প আগামী বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে এর মেয়াদ শুরু হয়।

গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সমকালকে বলেন, সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়ার ক্ষতি বহুবিধ। দিন দিন নির্মাণ উপকরণসহ মজুরি ও অন্যান্য সেবার মূল্য বাড়ছে। এতে প্রকল্পের ব্যয় মূল বরাদ্দ থেকে অনেক বেড়ে যায়। জনগণের অর্থের সঠিক ব্যবহার হয় না। আরও একটি বড় অসুবিধা হচ্ছে, জনগণকে যে ধরনের সেবা দেওয়ার জন্য সরকার প্রকল্প হাতে নেয়, সময়মতো বাস্তবায়ন না হলে জনগণ সেই সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। সরকারের উন্নয়ন শৃঙ্খলা বিনষ্ট নয়। যেসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়, সেটা নিশ্চয়ই গুরুত্ব বিবেচনায় দেওয়া হয়। তার পরও যদি সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক।

আরও পড়ুন

×