ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

সরকারের বর্ষপূর্তি-২ : তথ্যপ্রযুক্তি

ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রগতি

ডিজিটাল বাংলাদেশের পথে অগ্রগতি
×

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:২৮

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এ সময় বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালু করেছে। টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তর বাস্তবায়ন করেছে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, বিটিসিএল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে বাস্তবায়ন করেছে 'ডিজিটাল সংযোগের জন্য টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ' (এমওটিএন) প্রকল্প। ডাক বিভাগ সাফল্যের সঙ্গে ডিজিটাল লেনদেন সেবা 'নগদ' চালু করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার উদ্বোধন হয়েছে।

তবে বিদায়ী বছরের অর্ধেক সময়ই দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে এক ধরনের অস্থিরতা ছিল দুই শীর্ষ মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোন ও রবির কাছে বিটিআরসির বকেয়া পাওনা দাবি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতায়। এখনও এর জের রয়ে গেছে। এর প্রভাবে ফোরজি সম্প্রসারণ এবং ফাইভজি সেবা চালু নিয়েও অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেছেন, ২০১৯ সাল ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জনে বড় অগ্রগতির বছর ছিল। ২০২০ সাল শুরু হয়েছে আরও বড় অর্জনের স্বপ্ন নিয়ে। তিনি আশা করেন ২০২০ সাল বড় একটি মাইলফলক হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বকেয়া দাবি নিয়ে টেলিযোগাযোগ খাতে শীর্ষ দুই অপারেটরের সঙ্গে বিদ্যমান অস্থিরতার অবসান না হলে অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে পারে।

সাফল্য যেখানে :সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে এসে বড় প্রকল্পগুলোর মধ্যে বিটিসিএলের নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নে বহুল আলোচিত-সমালোচিত এমওটিএন প্রকল্প শেষ হওয়া একটি বড় অর্জন। গত বছরই টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের অধীনে 'সাইবার থ্রেট ডিটেকশন অ্যান্ড রেসপন্স' প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা বিধানে সরকারের অন্যতম আলোচিত ব্যয়বহুল প্রকল্প ছিল এটি। প্রথম বছরেই বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কোম্পানি লিমিটেড (বিএসসিসিএল) তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে যুক্ত হওয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ হয় সি-মি-উই-৬ নামের নতুন একটি সাবমেরিন কেবল কনসোর্টিয়ামের মাধ্যমে। এর ফলে বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ চাহিদা মেটাতে আরও বেশি সক্ষম হবে। গত বছরই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কোম্পানির মাধ্যমে দেশের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। ২০১৯ সালে টেলিটকের গ্রাহক বেড়ে ৪৮ লাখ ছাড়িয়ে গেছে, যা ২০১৮ সালে ছিল ৪৫ লাখের নিচে ছিল। ডাক বিভাগের ডিজিটাল লেনদেন সেবা 'নগদ' চালু হওয়ার প্রথম বছরেই এর দৈনন্দিন লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৯০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।

সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ডাটা সংরক্ষণে বাংলাদেশ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সক্ষমতা অর্জন করবে বলে আশা করা হচ্ছে। গত বছর ইনফো সরকার-৩-এর মাধ্যমে ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারিত হয়েছে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরেই ফাইভজির পরীক্ষা হয়েছে। প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। নতুন বছরে ডিজিটাল বাংলাদেশের লক্ষ্য পূরণে আরও বড় সাফল্যের খবর জানাতে পারবেন বলে আশা করেন প্রযুক্তিবিদ এই মন্ত্রী।

অস্থিরতার এক বছর :তৃতীয় মেয়াদে সরকারের প্রথম বছরটি কেটেছে টেলিযোগাযোগ খাতে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে অডিট আপত্তি অনুযায়ী ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৯৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকা আর রবির কাছে ৮৬৭ কোটি টাকা বকেয়া পাওনা দাবি করে গ্রামীণফোন ও রবিকে চিঠি দেয় বিটিআরসি। দুই অপারেটরই এই অডিটকে 'ত্রুটিপূর্ণ' এবং পাওনা নির্ধারণকে 'অযৌক্তিক' আখ্যায়িত করে এবং বকেয়া পাওনা পরিশোধ করতে অস্বীকৃতি জানায়। এক পর্যায়ে বিটিআরসি গ্রামীণফোন ও রবির জন্য অনাপত্তিপত্র প্রদান বন্ধ করার সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করলে গ্রামীণফোন ও রবি পৃথকভাবে আদালতে যায়। হাইকোর্ট বিভাগ বিটিআরসির সিদ্ধান্তে স্থগিতাদেশ দেয়। এরপর আপিল হলে গত ২৪ নভেম্বর আপিল বিভাগ গ্রামীণফোনকে তিন মাসের মধ্যে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) অডিট নির্ধারিত বকেয়া পাওনা ১২ হাজার ৫৯৭ কোটি ৯৬ লাখ টাকার মধ্যে দুই হাজার কোটি টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়। বেঁধে দেওয়া এই সময়ের মধ্যে গ্রামীণফোন এ টাকা জমা না দিলে বিটিআরসি আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারবে বলেও আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়।

'এনওসি' বন্ধের কারণে নতুন বিনিয়োগ আটকে যাওয়ার কথা বার বার জানানো হয় গ্রামীণফোন ও রবির পক্ষ থেকে। রবির ২০১৮ সালের জন্য বরাদ্দ প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার নতুন বিনিয়োগ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। এর ছাড়া রবির ৪ দশমিক ৫ জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও বন্ধ থাকে। পুঁজিবাজারে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ক্রমাগত কমতে দেখা যায়। গত বছরের ৩১ মার্চ গ্রামীণফোনের শেয়ারের দাম ছিল ৪০৯ টাকা। অক্টোবর-নভেম্বরে এ দর ওঠানামা করে ৩০০-৩২৩ টাকার ভেতর।

এনওসি বন্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে রবি ও জিপিকে নেটওয়ার্ক সেবা দেওয়া দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর। এ ব্যাপারে রবি ও জিপিকে নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিটিআরসির 'অনাপত্তি প্রদান' বন্ধের কারণে নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিবেচনায় তাদের প্রায় ১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১ হাজার ২৭৫ কোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে। কারণ, এ সময় কোনো ধরনের নতুন যন্ত্রপাতি সরবরাহ কিংবা প্রতিস্থাপনের কাজ করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতি স্থাপন-প্রতিস্থাপনসহ কারিগরি সেবার ব্যবসায় যুক্ত সাত-আটটি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানেরও প্রায় শতকোটি টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে।

এ ব্যাপারে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, এ জন্য দুই অপারেটরই দায়ী। বকেয়া পাওনা জনগণের অর্থ। এটা আদায় করা সরকারের দায়িত্ব। তারপরও অপারেটরদের এটি সহজ উপায়ে পরিশোধের জন্য আলোচনার কথা বলা হয়। কিন্তু তারা আলোচনার বদলে আদালতে যায়। এ পুরো বিষয়ের দায় অপারেটরদের।

বিশেষজ্ঞের বক্তব্য :তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাত বিশেষজ্ঞ টি আই এম নুরুল কবীর বলেন, তৃতীয় মেয়াদে সরকারের প্রথম বছরে বেশ কিছু সাফল্য আছে। সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারলে মানুষ আগামীতে এর সুফল পাবে।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের মহাসচিব ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এস এম ফরহাদ বলেন, বিদায়ী বছর টেলিযোগাযোগ খাতকে একটি হতাশার বছর বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। বছরের মাঝামাঝি সময়ে জাতীয় বাজেটে কথা বলা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কর বাড়ানো হয়। লাভের মুখ দেখেনি এমন কোম্পানির সর্বনিম্ন করপোরেট কর অন্তত আড়াইগুণ বাড়ানো হয়। এই বড় ধাক্কার পাশাপাশি দুই অপারেটরের কাছে বিটিআরসির অডিট দাবিসংক্রান্ত জটিলতা টেলিযোগাযোগ শিল্প খাতকে বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়। এই অনিশ্চয়তার অবসান না হলে টেলিযোগাযোগ খাতে অগ্রযাত্রা ব্যাহত হতে পারে।

আরও পড়ুন

×