ঢাকা সোমবার, ২২ জুন ২০২৬

চার্জশিটের ৫৫.৮৭ শতাংশ অভিযুক্তেরই সাজা হয় না

চার্জশিটের ৫৫.৮৭ শতাংশ অভিযুক্তেরই সাজা হয় না
×

সাহাদাত হোসেন পরশ

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৪১

দেশে খুনের মামলার চার্জশিটভুক্ত ৫৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ অভিযুক্তের নিম্ন আদালতেই সাজা হয় না। মাত্র ৪৪ দশমিক ১৩ শতাংশের সাজা নিশ্চিত হয়। বাকিরা নিম্ন আদালত থেকেই রেহাই পেয়ে যাচ্ছেন। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে এমন উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে।

সাধারণত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের পর অনেক বিচার-বিশ্নেষণ করেই যে কোনো মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়। খুনের মামলার ক্ষেত্রে তদন্তের ব্যাপকতা আরও অনেক বেশি। সংগত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, চার্জশিটভুক্ত অধিকাংশ অভিযুক্তের সাজা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না কেন? এ ক্ষেত্রে প্রথমেই সামনে এসেছে পুলিশি তদন্তের দুর্বলতার দিক। খুনের মতো ঘটনায় তদন্তের মান বাড়িয়ে অভিযুক্তদের সাজার হার আরও বাড়ানো না হলে সব ধরনের ঘটনাতেই ভিকটিম ও তার পরিবারের ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। খুনের মামলায় সাজার হার বাড়াতে সাক্ষী নির্বাচন থেকে শুরু করে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের ওপর আরও জোর দিয়েছেন সংশ্নিষ্টরা।

এ ব্যাপারে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সমকালকে বলেন, সাক্ষীরা যেন তদন্তের সময় যে সাক্ষ্য দিয়েছেন সেটা বিচারের সময়ও দেন, এটা নিশ্চিত করা গেলেই সাজার হার বাড়বে। এটাও খেয়াল রাখতে হবে, নামকাওয়াস্তে কাউকে যাতে আসামি করা না হয়। নামকাওয়াস্তে আসামি হলে তো খালাস পাবেনই।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, মামলায় সাজা নিশ্চিত করার জন্য শুরুতেই তদন্ত সঠিকভাবে করতে হবে। এরপর বিচারের সময় সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। দেখা যায়, সাক্ষী আসে না বলে বারবার বিচার কার্যক্রম মুলতবি করা হয়। খুব জরুরি না হলে বিচার কার্যক্রম মুলতবি করা ঠিক হবে না। দেশে সাক্ষী সুরক্ষার তেমন কোনো আইন নেই। এ আইন থাকলে সাক্ষীদের উপস্থিতির হার বাড়বে, তাদের সাক্ষ্য প্রদানও সহজতর হবে। দেশে সার্বিকভাবে খুনের মামলার সাজার হার কম থাকলেও এরই মধ্যে তদন্তের ক্ষেত্রে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। কিছু ক্ষেত্রে তাদের ইউনিটের তদন্তাধীন মামলার সাজার হার শতভাগ। সম্প্রতি বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ঘটনায় আদালত স্বপ্রণোদিত হয়ে মামলার তদন্তভার পিবিআইর ওপর ন্যস্ত করেছেন।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পিবিআইর প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, মামলায় সাজার হার নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে সাক্ষী নির্বাচনে পুলিশকে সতর্ক থাকতে হবে। শক্তিশালী সাক্ষী নির্বাচন না করলে যে কোনো সময় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে। সাক্ষী নির্বাচনে দুর্বলতা থাকলে সাজার হার কম হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এটা ঠিক, তদন্তের পর্যায়ে সাক্ষী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পুলিশের দুর্বলতা রয়েছে। যত চাপ ও ভয় আসুক না কেন, সঠিকভাবে তারা যাতে সাক্ষ্য দিতে পারেন, এটা নিশ্চিত করা দরকার। এ ছাড়া সাক্ষীর সঙ্গে প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটিয়ে তার অপরাধ ও সম্পৃক্ততা প্রমাণ করতে হয়। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ তদন্ত কর্মকর্তা কাঙ্ক্ষিত মান নিশ্চিত করতে পারছেন না। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তদন্তকাজে এ ধরনের দুর্বলতা দূর করা যায়। এ ছাড়া ভিকটিম পরিবারের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রেখে তাদের মানসিক যন্ত্রণাও উপলব্ধি করতে হবে।

মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, যে কোনো অপরাধী তার আলামত রেখে যাবেই। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে অপরাধ প্রমাণের অনেক পথ খোলা থাকে। কোনোভাবেই তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা যাবে না। এটা হলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সুবিধা পায়। আর ভিকটিমের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়। অনেক সময় তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় ভিকটিম শেষ পর্যন্ত মামলা চালানোর আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।

খুনের মামলায় ত্রুটি :খুনের মামলায় তদন্তে পুলিশের পর্যালোচনায় বেশ কিছু ত্রুটির বিষয় উঠে এসেছে। তা হলো- পর্যাপ্ত নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাব, ত্রুটিপূর্ণ জব্দ তালিকা, ক্রাইম সিন সঠিকভাবে সংরক্ষণে অদক্ষতা, ডিজিটাল সাক্ষ্য সংগ্রহে বিশেষজ্ঞ মতামত গ্রহণে অনীহা, আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে প্রেরণের বিষয়ে অজ্ঞতার অভাব, গৎবাঁধা সুপারভিশন নোট, মামলার ক্ষেত্রে পারিপার্শ্বিক আলামত সংগ্রহে অদক্ষতা, সিডিআর প্রাপ্তি এবং সেল বিশ্নেষণে বিলম্ব ও অদক্ষতা, ১৬১ ধারায় একই ধরনের জবানবন্দি রেকর্ড, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে বিলম্ব ও সুপারভাইজিং কর্মকর্তার নিবিড় তদারকির অভাব।

তিন কারণে খুনের ঘটনা বেশি :পুলিশ সদরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সারাদেশে তিন কারণে খুনের ঘটনা বেশি ঘটছে। এসবের মধ্যে পারিবারিক কলহে ২১ দশমিক ০৮ শতাংশ, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধে ১৩ দশমিক ৪৫ শতাংশ, পূর্বশত্রুতায় ১০ দশমিক ৮১ শতাংশ খুন হয়ে থাকে। এ ছাড়া 'বন্দুকযুদ্ধে' ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ, এলাকায় আধিপত্য নিয়ে ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ, অপমৃত্যুতে ৩ দশমিক ১৮ শতাংশ, পরকীয়ার জেরে ১ দশমিক ৫৯ শতাংশ, ছিনতাইকারীর হাতে ৩ দশমিক ০৭ শতাংশ, পূর্বপরিকল্পিতভাবে ১ দশমিক ৮০ শতাংশ, গণপিটুনিতে ২ দশমিক ৫৪ শতাংশ, কথা কাটাকাটিতে ২ দশমিক ৪৪, পাওনা টাকা চাইতে গিয়ে ১ দশমিক ১৭ শতাংশ, অজ্ঞাত কারণে ১৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, অন্যান্য কারণে ৭ দশমিক ৩১ শতাংশ হত্যার ঘটনা ঘটছে। খুনের মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়ার হার ৭৪ দশমিক ০৫ শতাংশ।

মামলা বেশি চার জেলায় :দেশে চারটি জেলায় ২০১৯ সালে খুনের ঘটনায় মামলা বেশি রুজু করা হয়। এগুলো হলো- কক্সবাজার, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও ময়মনসিংহ। মোট খুনের ২১ দশমিক ৮২ শতাংশ ঢাকা রেঞ্জে, ২০ দশমিক ৩৪ শতাংশ চট্টগ্রামে, ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ খুলনায়, ৯ দশমিক ৪৩ শতাংশ রাজশাহীতে ও ৭ দশমিক ৬৩ শতাংশ ময়মনসিংহে ঘটার রেকর্ড রয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে- ২০১৯ সালের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত দেশে মোট খুনের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ১০টি। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হত্যার ঘটনা ঘটে ৯৪৪টি।

খুনে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার :পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৯ সালে দেশে যত খুন হয়েছে, তার ১০ দশমিক ৭০ শতাংশ ঘটনায় আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার করা হয়। খুনের ঘটনায় ব্যবহূত মাত্র ২০ দশমিক ৭৯ শতাংশ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। ৪৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ ঘটনায় দেশি অস্ত্র ও অন্যান্য উপকরণ ব্যবহার করে হত্যা করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে চাপাতি, চাকু, ধারালো অস্ত্র, লাঠি, লোহার রড, হাতুড়ি, বিষজাতীয় দ্রব্য ও ক্ষুর ব্যবহার করা হয়েছে।

১১ উদ্যোগ :খুনের ঘটনা প্রতিহত করতে ও পরবর্তী করণীয় নিয়ে ১১টি উদ্যোগ মেনে চলতে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের নির্দেশনা দেয় পুলিশ সদর দপ্তর। এগুলো হলো- 'ডোমেস্টিক ভালোয়েন্স', যাতে খুন পর্যন্ত গড়াতে না পারে, সে ব্যাপারে পুলিশকে আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া; পারিবারিক নির্যাতন কমাতে কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সহায়তা নেওয়া; তথাকথিত সামাজিক সালিশ বন্ধ করার ও পারিবারিক আদালতে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করা; সম্পত্তি-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ এলে ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা প্রয়োগ করা; নিবারণমূলক প্রসিকিউশনের সংখ্যা বাড়ানো; নিবারণমূলক কার্যক্রম নিয়ে খুনের ঘটনা কমানো; স্থানীয় মাস্তানদের তালিকা তৈরি করে চাঁদাবাজি ও মাদকের ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া; খুনের ঘটনায় গ্রেপ্তার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করে ব্যবহূত অস্ত্র উদ্ধারে জোর দেওয়া; অস্ত্র কারবারিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া; সাজা ভোগকারী অস্ত্রধারী ও অস্ত্র মামলার জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো; প্রতি মাসে লাইসেন্সধারীদের অস্ত্র ও গুলি চেক করা এবং খুনের ঘটনাকে অপমৃত্যু মামলা হিসেবে রুজু করার প্রয়াস থামানো।

তদন্তে পুলিশের গাফিলতি :খুনের মামলার তদন্তে অনেক ক্ষেত্রে প্রায়ই গাফিলতির পরিচয় দেয় পুলিশ। অনেক সময় ভিকটিমের এজাহারও তারা বদলে দেয়। আবার খুনের অভিযোগ থাকলেও সেটিকে 'সড়ক দুর্ঘটনা' বা অপমৃত্যুর মামলা হিসেবে সাজায়। তদন্ত সঠিকভাবে করতে ব্যর্থ হওয়ায় অনেক ঘটনায় তদন্ত কর্মকর্তাকে ভর্ৎসনা করেন আদালত। সর্বশেষ রাজশাহীর পুঠিয়ার শ্রমিক নেতা নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। এজাহার বদলে ফেলার ঘটনায় অভিযুক্ত পুঠিয়ার তৎকালীন ওসি সাকিল উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। গত ১ ডিসেম্বর আদালত বলেন, 'মূল এজাহার গ্রহণ না করে সাদা কাগজের ওপর সই করা এবং পরবর্তী সময় ওই সাদা কাগজে এজাহার টাইপ করে তা রেকর্ডভুক্ত করার বিষয়ে ওসি সাকিলের বিরুদ্ধে অভিযোগটি গুরুতর, যা দ বিধির ১৬৬ ও ১৬৭ ধারা অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই রাজশাহীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে তার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং এ-সংক্রান্ত নথি দুদকে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হলো। একই সঙ্গে নুরুল ইসলাম হত্যা মামলাটি তদন্তের জন্য পিবিআইকে নির্দেশ দেওয়া হলো।'

গত ১১ জুন রাজশাহীর পুঠিয়ার কাঁঠালবাড়িয়া এলাকার একটি ইটভাটা থেকে পুঠিয়া উপজেলা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি নুরুল ইসলামের লাশ উদ্ধার করা হয়। এরপর ১৮ জুন জেলা পুলিশ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সমকামিতার কারণে এক কিশোরের ইটের আঘাতে নুরুল মারা যান। তবে নিহতের পরিবার বিষয়টিকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করে। উপজেলা মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হয় বলে জানায় তার পরিবার। খুনের ঘটনায় পুলিশি তদন্তের গাফিলতির আরেকটি উদাহরণ সিদ্ধেশ্বরীতে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সামনে সগিরা মোর্শেদ হত্যাকাণ্ড। মূল আসামিদের আড়াল করে ওই ঘটনায় দেওয়া হয়েছিল সাজানো চার্জশিট। ৩০ বছর পর ২০১৯ সালের নভেম্বরে চাঞ্চল্যকর খুনের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন করতে সক্ষম হয়েছে পিবিআই। গ্রেপ্তার হয়েছে চার প্রকৃত আসামি। এ ছাড়া গত বছর ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির ঘটনায় মামলাটি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেন সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। এ ঘটনায় সারাদেশে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়।

আরও পড়ুন

×