বিশেষ লেখা
সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সাফল্য দৃশ্যমান
ড.দেলোয়ার হোসেন
প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৩৪
সরকারের তৃতীয় মেয়াদে প্রথম বছরের কূটনৈতিক কার্যক্রমের সাফল্যের
পর্যালোচনায় কয়েকটি ক্ষেত্রে কূটনৈতিক সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিই আমার
দৃষ্টিতে বড় সফলতা। ভারত, চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের
সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক প্রতিটি ক্ষেত্রেই আগের চেয়ে আরও
জোরদার হয়েছে এ সময়ে। বাংলাদেশের মেগা প্রকল্পগুলোতে ভারত, চীন এবং জাপানের
ঋণ ও সহায়তার পরিমাণ বেড়েছে। যোগাযোগ এবং জ্বালানি খাতে ভারতের সহযোগিতা
বেড়েছে। গত অক্টোবর মাসে ভারতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফর দু'দেশের
বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে
বাংলাদেশ তার সম্পর্ক যেমন আরও সংহত করেছে, তেমনি 'বেল্ট অ্যান্ড রোড
ইনিশিয়েটিভ' সম্মেলনে যোগ দেওয়ার মাধ্যমে চীনের সঙ্গেও বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে
ইতিবাচক অগ্রগতি ঘটিয়েছে।
বাংলাদেশের কূটনৈতিক সাফল্য মানেই অর্থনৈতিক কূটনৈতিক সাফল্য। বাংলাদেশের
কূটনীতির প্রধান লক্ষ্যই থাকে আরও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ও
বাণিজ্যিক সম্পর্ক বাড়ানো। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও
দায়িত্ব নিয়ে 'অর্থনৈতিক কূটনীতি'তে জোর দেওয়ার কথা বলেছিলেন। গত এক বছর
এই কূটনীতিতে বাংলাদেশ বেশ ভালো করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে, বাংলাদেশি
পণ্যের বাজার সম্প্রসারণেও অগ্রগতি ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে দেশের অর্থনৈতিক
অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে 'অর্থনৈতিক কূটনীতি'র বিকল্প নেই।
রোহিঙ্গা কূটনীতিতেও বিদায়ী বছরে অন্তত দুটি অগ্রগতি আছে। প্রথমেই বলতে হয়,
আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়ার মামলার কথা। এ মামলায় মিয়ানমারের স্টেট
কাউন্সেলর অং সান সু চিকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। রাখাইনে গণহত্যা হয়েছে, এ
মামলা ও বিচারের মাধ্যমে সেটাও বিশ্বের সামনে জোরালোভাবে উঠে এসেছে।
আদালতে মিয়ানমারও রাখাইনে হত্যাযজ্ঞের বিষয়টি অস্বীকার করতে পারেনি। এটা
অবশ্যই রোহিঙ্গা কূটনীতিতে বড় সাফল্য। রোহিঙ্গা কূটনীতিতে আরেকটি ইতিবাচক
অর্জন হলো, জাতিসংঘে রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিন্দা
প্রস্তাব পাস। কিন্তু বছর শেষে কাঙ্ক্ষিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দৃশ্যত
কোনো অগ্রগতি নেই। কিছু ইতিবাচক বক্তব্য দিলেও কার্যকর ক্ষেত্রে চীন এবং
রাশিয়ার ভূমিকার পরিবর্তন দেখা যায়নি। এক্ষেত্রে কিন্তু চ্যালেঞ্জ থেকে
গেছে এবং এ থেকে কবে উত্তরণ ঘটবে, সেটাও চট করে বলা যাচ্ছে না।
বছরের শেষে ভারতে 'নাগরিকত্ব' আইনকে ঘিরে যে পরিস্থিতি দেখা গেল, তা নতুন
বছরে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে ভারতের
ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের বক্তব্য এ শঙ্কাকে প্রবল করে তুলছে। নাগরিকত্ব আইন
অনুযায়ী জাতীয় নাগরিকপঞ্জি তৈরি করে ভারত যদি 'পুশ ইন' শুরু করে, সেটা
বাংলাদেশের পক্ষে সামাল দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এ বিষয়টিতে সতর্ক
পর্যবেক্ষণ রাখতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক
অনেক ভালো হলেও কূটনৈতিক অবস্থান রাজনৈতিক কার্যক্রমের দ্বারা নেতিবাচকভাবে
প্রভাবিত হতে পারে।
বছর শেষে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতিও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। কারণ
সংঘাত প্রবল হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ফিলিপাইন ও শ্রীলংকার মতো রাষ্ট্রে
জনশক্তি রপ্তানি এবং শ্রমবাজারের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল দেশগুলোর চিন্তিত
হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশ্ববাজারে তেলের দাম রাতারাতি বাড়তে পারে।
অবশ্য এ ধরনের পরিস্থিতি বাংলাদেশকে আগেও মোকাবিলা করতে হয়েছে। তাই এ
সংকটকে একদম নতুন বলার কারণ নেই। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়, এবারও এ
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশের বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ নেই।
দেলোয়ার হোসেন : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
- বিষয় :
- বিশেষ লেখা
