ঢাকা মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সরকারের বর্ষপূর্তি-৭ : পররাষ্ট্রনীতি

অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সাফল্য, চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে

অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সাফল্য, চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে
×

রাশেদ মেহেদী

প্রকাশ: ০৮ জানুয়ারি ২০২০ | ১৩:৩৬

আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে অর্থনৈতিক কূটনীতিতে সফলতা এসেছে। পরিবর্তন এসেছে বিদেশের বাংলাদেশ মিশনের সেবার মানে। তবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কূটনীতির চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে আগের মতোই। বছরের শেষের দিকে ভারতে নাগরিকত্ব আইন সংশোধনকে কেন্দ্র করে দু'দেশের সম্পর্কেও স্নায়ুচাপ সৃষ্টি হয়েছে।

সরকারের দ্বিতীয় বছরের শুরুতেই নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় শীর্ষস্থানীয় ইরানি কমান্ডার কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়াকে কেন্দ্র করে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে নয়, বিশ্বের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এ ঘটনা।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেছেন, প্রথম বছরের সফলতার ধারাবাহিকতায় দ্বিতীয় বছরেও অর্থনৈতিক কূটনীতিতে আরও বড় সাফল্য আসার প্রত্যাশা দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু করার বিষয়েও তিনি আশাবাদী। এ ছাড়া জনশক্তি রপ্তানি, বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে জীবন মানোন্নয়নের কর্মসূচিও এ বছর হাতে নেওয়া হচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সোনালি অধ্যায় চলছে। মধ্যপ্রাচ্য কূটনীতির নতুন চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কূটনৈতিক নীতি হচ্ছে, 'সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।' এ নীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতা চায়।

অর্থনৈতিক কূটনীতিতে নতুন মাত্রা :২০১৯ সালের শুরুতে আওয়ামী লীগ সরকারের তৃতীয় মেয়াদে বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন দায়িত্ব নিয়ে তার পরিকল্পনায় 'অর্থনৈতিক কূটনীতিকে' অগ্রাধিকার দেন। এ কূটনীতির মূল লক্ষ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেওয়া 'ভিশন-২০২১' ও 'ভিশন-২০৪১' অর্জনে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, প্রবাসীদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে অর্থনীতিকে আরও গতিময় করা। এ লক্ষ্যে নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম মাসেই বাংলাদেশের সব দূতাবাস ও মিশনে 'অর্থনৈতিক কূটনীতি'র উদ্যোগ নেওয়ার বার্তা দেওয়া হয়।

বার্তায় বিদেশে বাংলাদেশের বিনিয়োগবান্ধব অবস্থা তুলে ধরা, বাংলাদেশি পণ্যের প্রদর্শনীর জন্য মেলার আয়োজন, বিনিয়োগের জন্য সম্ভাবনাময় দেশগুলোর শীর্ষ উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে মতবিনিময় এবং সংশ্নিষ্ট দেশগুলোর সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ গড়ে তোলার কথা বলা হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন জানান, অর্থনৈতিক কূটনীতির কার্যক্রম আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। এর বড় প্রমাণ হচ্ছে, গত এক বছরে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ ৬৮ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৮৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশের সমকক্ষ দেশগুলোর কেউই সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আহরণে এমন সাফল্য পায়নি। 'ডুয়িং বিজনেস' বা ব্যবসা-বাণিজ্য সহজ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সীমাবদ্ধতাগুলোর চ্যালেঞ্জ স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের 'ডুয়িং বিজনেস' সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক নিচে। বাস্তব অভিজ্ঞতায়ও দেখা যায়, এ দেশে ব্যবসা শুরু করতে এসে বিভিন্ন প্রশাসনিক স্তর পার হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। একটা কারখানা স্থাপন করতে ৪৩ ধরনের সরকারি অনুমতিপত্র নিতে হয়। এর ফলে অনেক বিনিয়োগকারী নিরুৎসাহিত হন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য এরই মধ্যে তিনি প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই 'ডুয়িং বিজনেস' সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান যাতে ১শ'র আগে চলে আসে, সেজন্য যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এর সুফল অচিরেই দৃশ্যমান হবে।

অর্থনৈতিক কূটনীতির পাশাপাশি গেল বছরের শুরুতেই বিভিন্ন দূতাবাসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবার মান বাড়ানোর কঠোর বার্তা দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। সেবার মানে পরিবর্তন আনতে চালু করা হয় 'দূতাবাস' স্মার্টফোন অ্যাপ্লিকেশন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, 'দূতাবাস' অ্যাপের মাধ্যমে প্রবাসীরা জরুরি কাগজপত্র সত্যায়নসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন। আগে যেসব সেবার জন্য দূতাবাসে যেতে হতো, সেসব সেবা মিলছে ঘরে বসেই। সেবাপ্রার্থীরা যাতে হয়রানির শিকার না হন, সেজন্য কঠোর তদারকির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রবাসীরাও জানাচ্ছেন, গত এক বছরে সেবামান বেড়েছে।

এ কে মোমেন বলেন, বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসগুলোতে সেবার মান আরও আধুনিক করতে এ বছরও বেশকিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র প্রবাসীরা যেন সহজে পান, সে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রবাসে যেসব বাংলাদেশি কষ্টসাধ্য এবং শ্রমঘন কাজ করেন, তাদের জীবনমান পরিবর্তনে 'লাইফ চেঞ্জার' কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচির অংশ হিসেবে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত প্রবাসীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ চালক হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। স্মার্টনেস তৈরি ও ইংরেজিতে কথা বলার প্রশিক্ষণ দিয়ে বিক্রয় কর্মী হিসেবে কাজ পাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চলতি বছর 'মুজিববর্ষ' পালন কূটনীতিতেও বড় সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। এ বছর ৭৭টি বাংলাদেশি দূতাবাস ও মিশনে মুজিববর্ষ পালন উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর মহান কীর্তি, মানুষের মুক্তির জন্য তার আজীবন সংগ্রামের ইতিহাস তুলে ধরা হবে। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সমৃদ্ধির পথে যাত্রার উজ্জ্বল সম্ভাবনার বিষয়টিও উঠে আসবে।

চ্যালেঞ্জ রোহিঙ্গা কূটনীতিতে :২০১৭ সালের আগস্ট মাসে রাখাইনে মিয়ানমার বাহিনীর অভিযানে গণহত্যা, গণনিষ্ঠুরতায় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনায় জরুরি আশ্রয় দেওয়ার পর তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিয়ে দেখা দেয় বড় ধরনের কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ, যা 'রোহিঙ্গা কূটনীতি' নামে পরিচিতি পায়। কিন্তু প্রত্যাবাসন শুরুর জন্য দিনক্ষণ ঠিক করেও তা শুরু করা যায়নি।

অবশ্য গত বছর রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীনের অবস্থানের ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়েছে। আগে যুক্ত না হলেও গত বছর এ প্রক্রিয়ায় চীন দৃশ্যত যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতে রাখাইন গণহত্যার বিচার চেয়ে গাম্বিয়ার করা মামলায় মিয়ানমারকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। জাতিসংঘে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন, নিপীড়ন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাস হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু না হওয়ার দায় মিয়ানমারের। তারা রাখাইনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টিতে সফল হয়নি। বাংলাদেশ প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দিলেও তারা মাত্র আট হাজার জনকে চূড়ান্ত করেছে, যা যথাযথ হোমওয়ার্ক না করার ফল। তিনি বলেন, প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক খুবই ভালো। চলতি বছর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর ক্ষেত্রে সফলতা আসবে বলে আশা করেন তিনি।

আরও পড়ুন

×