সরবরাহ ভালাে থাকলেও বাড়ছে ডলারের দর
ওবায়দুল্লাহ রনি
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১১:৪০
চাহিদার তুলনায় ডলারের সরবরাহ বেশি থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ছে। ডলার নিয়ে আগের মতো কাড়াকাড়ি নেই। এর মধ্যেই বাড়ছে দর। গত এক সপ্তাহে আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলার ৭৫ পয়সা বেড়ে গতকাল রোববার ১২৩ টাকা ৬০ পয়সায় উঠেছে। সাড়ে তিন মাস আগের তুলনায় যা এক টাকা ৩০ পয়সা বেশি। বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউস থেকে ব্যাংকগুলো কিনেছে ১২৩ টাকা ৮৫ পয়সা পর্যন্ত দরে। ডলার বাজারে কোনো হস্তক্ষেপ না করলেও হঠাৎ এভাবে দর বৃদ্ধির বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদারকি করবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে সরকারের আলোচনা চলছে। এ সময়ে দর নির্ধারণে অনানুষ্ঠানিকভাবে কোনো হস্তক্ষেপ করছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আবার জ্বালানির দায়সহ বড় কিছু পরিশোধ করতে গিয়ে ডলারের ওপর চাপ তৈরি হয়। এ ছাড়া আমদানিতে ৬ শতাংশের মতো প্রবৃদ্ধি থাকলেও রপ্তানি কমেছে ১ শতাংশ। সব মিলিয়ে ডলারের দর বেড়েছে। দর বৃদ্ধির পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কয়েকটি ব্যাংকের দৈনিক লেনদেন ও বড় পরিশোধসহ বিভিন্ন বিষয়ে তদারকি করবে। ব্যাংকগুলোর নিট ওপেন পজিশন বা এনওপিসহ সার্বিক লেনদেন দেখা হবে। আর এ জন্য আলাদা কয়েকটি টিম গঠন করে ডলার লেনদেনে এগিয়ে থাকা ব্যাংকগুলোতে পাঠানো হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সমকালকে বলেন, ডলার বাজারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। ব্যাংকগুলোই নিজেদের মতো করে ডলার বেচাকেনা করছে। তবে কোনো ব্যাংক অনৈতিক কিছু করছে কিনা নজরদারি করা হবে। ডলারের দর নিয়ে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, বেশ কিছু বড় পরিশোধের সময় আসায় একটা চাপ তৈরি হয়। এখন আবার বাজার ঠিক হয়ে যাবে বলে তিনি আশা করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ পতনের পর থেকে দেড় বছর ধরে আন্তঃব্যাংকে ডলারের দর ১২১ থেকে ১২২ টাকা ৩০ পয়সার মধ্যে স্থিতিশীল ছিল। তবে জাতীয় নির্বাচনের পর সামান্য বাড়তে শুরু করে। চলতি বছরের মার্চের শুরুতে আন্তঃব্যাংকে প্রতি ডলারের দর ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে একটু বেড়ে ১২ মার্চ ১২২ টাকা ৭৫ পয়সা হয়। গত ২৫ জুন পর্যন্ত একই দরে বেচাকেনা হয়। পরের কর্মদিবস ২৮ জুন ১০ পয়সা বেড়ে উঠে যায় ১২২ টাকা ৮৫ পয়সা। ৯ জুলাই পর্যন্ত দর অপরিবর্তিত থাকার পর এখন আবার প্রায় প্রতিদিন বাড়ছে। আন্তঃব্যাংক দরের তুলনায় আমদানি ও রেমিট্যান্সে ডলারের দর ২০ থেকে ২৫ পয়সা বেশি থাকে।
জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, বড় কিছু পরিশোধের কারণে ডলারের দর হঠাৎ বাড়ছে। আবার রেমিট্যান্সে এখন আর আগের মতো প্রবৃদ্ধি নেই। রপ্তানি কমে যাচ্ছে, আমদানি বাড়ছে। সব মিলিয়ে এ পরিস্থিতি হয়েছে।
আইএমএফের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সময় থেকে চলমান ৫৫০ কোটি ডলার ঋণে কর্মসূচি থেকে সরে এসে নতুন করে একটি ঋণ কর্মসূচিতে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। সরকারের অনুরোধে নতুন অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য সংস্থাটির একটি প্রতিনিধি দল গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা সফর করে। সেখানে অর্থমন্ত্রী, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়। সফরে বিনিময় হার বাজারভিত্তিক করা, ব্যাংক খাতের সংস্কার অব্যাহত রাখা, রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং সরকারের ভর্তুকি যৌক্তিক করতে সার ও বিদ্যুতের মূল্য সমন্বয়ের কৌশল নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
২০২১ সালের আগ পর্যন্ত দীর্ঘদিন ধরে ডলারের দর ৮৪ টাকায় স্থিতিশীল ছিল। তবে করোনা-পরবর্তী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে ডলারের দর বাড়তে বাড়তে ১২২ টাকায় উঠে যায়। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে অর্থ পাচারে কড়াকড়িসহ বিভিন্ন কারণে হুন্ডি প্রবণতা কমে প্রচুর রেমিট্যান্স এসেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছর প্রবাসীরা ৩৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন। আগের অর্থবছরের তুলনায় রেমিট্যান্স বেশি এসেছে ৫২৬ কোটি ডলার বা ১৭ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আগের অর্থবছর রেমিট্যান্স বেড়েছিল ৬৪২ কোটি ডলার যা প্রায় ২৭ শতাংশ।