১৬৩ কচ্ছপের বাচ্চা মিলল কুয়াকাটা সৈকতে, নিরাপদে অবমুক্ত
পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যদের উপস্থিতিতে কচ্ছপের বাচ্চাগুলোকে নিরাপদে আন্ধারমানিক নদী সংলগ্ন তিন নদীর মোহনায় অবমুক্ত করা হয়। ছবি: সমকাল
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬ | ২২:৫৪ | আপডেট: ১৯ মে ২০২৬ | ২২:৫৯
পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতের লেম্বুরবন বনাঞ্চল সংলগ্ন বালিয়াড়ি এলাকায় একটি পরিত্যক্ত দোকানের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৬৩টি সামুদ্রিক কচ্ছপের বাচ্চা। মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়। পরে বন বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশবাদী সংগঠনের সদস্যদের উপস্থিতিতে বাচ্চাগুলোকে নিরাপদে আন্ধারমানিক নদী সংলগ্ন তিন নদীর মোহনায় অবমুক্ত করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার সকালে নিজের ফিশফ্রাই দোকান খুলতে যান লেম্বুরবন এলাকার ব্যবসায়ী মো. বায়েজিদ। দোকানের চারপাশ পরিষ্কার করার সময় তিনি বালুর মধ্যে ছোট ছোট কিছু প্রাণীর নড়াচড়া দেখতে পান। কাছে গিয়ে দেখেন কয়েকটি কচ্ছপের বাচ্চা বালুর ওপর উঠে আসছে। পরে বিষয়টি আশপাশের লোকজনকে জানালে তারা বালু সরিয়ে একটি গর্তের মধ্যে আরও অসংখ্য কচ্ছপের বাচ্চা দেখতে পান। খবর পেয়ে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘উপরা’র সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন।

উদ্ধারকারীরা জানান, গর্তটির ভেতরে কচ্ছপের ডিমের খোসা, ছোগলা এবং সদ্য ফোটা বাচ্চাগুলো পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে কয়েক সপ্তাহ আগে মা কচ্ছপটি নিরিবিলি স্থান হওয়ায় সেখানে ডিম পেড়ে যায়। পরে প্রাকৃতিকভাবেই ডিম ফুটে বাচ্চাগুলো বের হয়ে আসে।
উদ্ধারের পর উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন উপরার সদস্যরা বন বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনকে খবর দিলে সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে কচ্ছপের বাচ্চাগুলোকে প্লাস্টিকের পাত্রে কাছাকাছি নিরাপদ এলাকায় নেওয়া হয়। সেখানে কিছু সময় পর্যবেক্ষণের পর বিকেলের দিকে আন্ধারমানিক নদী সংলগ্ন তিন নদীর মোহনায় অবমুক্ত করা হয়। অবমুক্ত করার সময় স্থানীয় উৎসুক মানুষ, পর্যটক ও পরিবেশকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সাজেদুল হক বলেন, প্রায় ৪০ থেকে ৬০ দিন আগে মা কচ্ছপটি নির্জন ও নরম বালুময় স্থান খুঁজে সেখানে ডিম পেড়েছিল। সামুদ্রিক অলিভ রিডলি কচ্ছপ সাধারণত গভীর রাতে সৈকতে উঠে বালু খুঁড়ে বাসা তৈরি করে ডিম পাড়ে। অলিভ রিডলি কচ্ছপের জীবনচক্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ডিম পাড়া ও বাচ্চার সমুদ্রে ফিরে যাওয়া। একটি মা কচ্ছপ একবারে ৮০ থেকে ১৫০টি ডিম পাড়তে পারে। ডিমগুলো বালুর নিচে নিরাপদে রেখে মা আবার সাগরে ফিরে যায়। এরপর সূর্যের নির্জন তাপ ও বালুর উষ্ণতায় ডিম ধীরে ধীরে পরিণত হয়। নির্দিষ্ট সময় পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় এবং স্বাভাবিকভাবে তারা চাঁদের আলো বা সমুদ্রের দিকের উজ্জ্বলতা অনুসরণ করে পানির দিকে ছুটে যায়। তবে এগুলোর জন্য নিরাপদ জোন তৈরি করতে পারলে ওরা নিরাপদে এসে ডিম পেরে যেতে পারত।

কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, কুয়াকাটা উপকূল শুধু পর্যটনের জন্য নয়, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। প্রতিবছর নির্দিষ্ট মৌসুমে অলিভ রিডলি কচ্ছপ উপকূলে এসে ডিম পাড়ে। কিন্তু মানুষের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল, রাতে কৃত্রিম আলো ব্যবহার, শব্দদূষণ এবং সৈকতে প্লাস্টিক বর্জ্য ফেলার কারণে কচ্ছপগুলো নিরাপদ পরিবেশ পাচ্ছে না। মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, উদ্ধার হওয়া সব কচ্ছপের বাচ্চাকে সুস্থ অবস্থায় নিরাপদে অবমুক্ত করা হয়েছে। কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কাওছার হামিদ বলেন, এ ধরনের ঘটনা আমাদের উপকূলীয় জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধির প্রমাণ বহন করে।
