ঢাকা শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬

অমর একুশে গ্রন্থমেলা

লেকের ধারে আড্ডা

লেকের ধারে আড্ডা
×

জয়নাল আবেদীন

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:২৩ | আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:৩১

মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে কাচঘেরা স্বাধীনতা স্তম্ভ। সন্ধ্যা নামতেই জ্বলে উঠল মুক্তিযুদ্ধের এই স্মারক। শক্তিশালী বিদ্যুতের আলোকরশ্মিতে চারপাশ জ্বলজ্বল করছিল। এর সামনেই কৃত্রিম জলাধার। একে ঘিরেই খণ্ড খণ্ড আড্ডা। জলাধারে মাছের খেলা দেখছিল কেউ কেউ। অনেকে বসিয়ে দেন গল্পের পসরা। সামনেই উন্মুক্ত মাঠ। মুখোমুখি জমিয়ে আড্ডা সেখানেও। বিকেল থেকেই গায়ে হিমেল হাওয়ার আলতো ছোঁয়া ছিল। চায়ের কাপে চুমুক আর বন্ধুদের ভেতরে জমানো কথামালা। এটা ছিল বইমেলার অষ্টম দিনের খণ্ডচিত্র।

এখানকার ভিড়ের রেশটা যায়নি বইমেলার বাকি অংশজুড়ে।

গতকাল রোববার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে পাঠকের আনাগোনা তেমন ছিল না। আগের দু'দিন ছুটি থাকায় জমে গিয়েছিল বিক্রিবাট্টা। গতকাল আবার মেলার কিছু দর্শনার্থী টেনে নিয়েছে বাংলাদেশ-ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ ফাইনালের ম্যাচটি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে বড় পর্দার সামনে ছিল বিপুল দর্শক। ফলে সন্ধ্যার পর বইমেলায় পাঠকের উপস্থিতি ছিল নগণ্য।

অবশ্য মাঝের ছুটির দুটি দিন বাদে এবার সামগ্রিকভাবেই মেলায় পাঠকের আনাগোনা আশানুরূপ নয় বলে মন্তব্য অনেকের। শব্দভূমির প্রকাশক সার্জিল খানের মতে, কিছু কিছু স্টল অবস্থানগত কারণেই পাঠকশূন্য। মূল ফটকের মুখে হলেও বেশিরভাগ দর্শনার্থী ভেতরে ঢুকে ডানে-বাঁয়ে না তাকিয়ে ভেতরে চলে যান।

সবমিলিয়ে গতকাল মেলার আবহ ফিরে গিয়েছিল উদ্বোধনী দিনে। বিকেল থেকে মেলাপ্রাঙ্গণ ঘুরে ও বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার বিক্রয় কর্মীদের সঙ্গে আলাপে এমন তথ্যই জানা গেল। শুক্র ও শনিবার শিশুচত্বর ছিল সবচেয়ে জমজমাট। গতকাল সেই ছবি হারিয়ে গেল। খুদে পাঠকের আনাগোনাও কম ছিল।

অন্যদিকে, লিটলম্যাগ চত্বরের হতাশা যেন কাটছেই না। ছোট ছোট স্টলে অল্পসংখ্যক বইয়ের পসরা। কিন্তু পাঠকের দেখা নেই। সামনের সারির কয়েকটি স্টলে মাঝে-মধ্যে পাঠকের আগমন ঘটলেও বিক্রি কম। সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রিই হয়নি- এমন স্টলের সংখ্যাই এখানে বেশি।

তবে কি মেলা জমে ওঠার জন্য সামনের শুক্রবার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে- এমন প্রশ্ন শুনে অনেকের মন্তব্য, আগামী শুক্রবার ঠিকই মেলা জমে উঠবে। সেদিন একসঙ্গে অনেক উপলক্ষ। ছুটির দিন তো বটেই, সঙ্গে ভালোবাসা দিবস আর বসন্তবরণের মিশেলে অন্যরকমই একটি দিন আসছে বইমেলায়। একসঙ্গে অনেক কিছুর ধাক্কা যে জোরেশোরে লাগতে শুরু করেছে, তা অনুমান করা যায় প্রকাশকদের ব্যস্ততায়ও। এখনও যেসব বই ছাপাখানায় মলাটবন্দি হওয়ার অপেক্ষায়, সেগুলো দ্রুত মেলায় আনতে ঘাম ঝরে যাচ্ছে তাদের।

বইয়ের স্টল ও প্যাভিলিয়নে ভিড় কম থাকলেও লেখকদের কথা শুনতে খুব একটা অনাগ্রহ দেখা যায়নি উপস্থিত পাঠকদের। তারা ঠিকই বিকেল থেকে মাঠে জড়সড় হয়ে বসেছিলেন। কেউ ঘাসের ওপর, কেউ মঞ্চের সামনে সারি সারি চেয়ারে। আবার কেউ লেকের ধারে স্থায়ী আসনে। সবাই শুনছিলেন লেখকের কথা। বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা অবধিও নিজেদের প্রকাশিত বই নিয়ে আলাপ জমিয়ে দিচ্ছিলেন পারভেজ হোসেন, ওবায়েদ আকাশ, মোস্তফা হোসেইন এবং খায়রুল বাবুই।

নতুন বই : অষ্টম দিনে মেলায় আজ নতুন বই এসেছে ১১৬টি। এ নিয়ে আট দিনে বইমেলায় প্রকাশিত নতুন বইয়ের সংখ্যা ৯৫৭টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি কবিতার বই- ২৬১টি। ১৮৯টি উপন্যাস এবং ১১৫টি গল্পের বই বেরিয়েছে। তবে অনেকের বইয়ের তথ্য বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্রে জমা হয়নি।

গতকাল প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- হাসনাত আবদুল হাইয়ের 'মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাসসমগ্র' (আগামী), মুহম্মদ জাফর ইকবালের 'বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী প্রজেক্ট আকাশলীন' (তাম্রলিপি), বেলাল চৌধুরীর 'বত্রিশ নম্বর' (আগামী), ফরিদুর রেজা সাগরের 'অনেক মুখ অনেক ছবি' (অনন্যা), আয়মান সাদিক ও সাদমান সাদিকের 'কমিউনিকেশন হ্যাকস' (তাম্রলিপি), মিল্টন বিশ্বাসের 'উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু' (বাংলা একাডেমি), রফিকুল ইসলামের 'অশ্রুজলের নদী' (মহাকাল প্রকাশনী), আসলাম সানী সম্পাদিত 'বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা' (মিজান পাবিলশার্স), রামেন্দু মজুমদারের 'শেখ মুজিবুর রহমান :বাংলাদেশ মাই বাংলাদেশ' (মুক্তধারা), আবদুল মান্নান সৈয়দের 'দশ দিগন্তের দ্রষ্টা' (অবসর), ইমদাদুল হক মিলনের 'বাবান ও টুনটুনি পাখি' (অনন্যা), সৈয়দ আজিজুল হকের 'কথাশিল্পী মানিক' (কথাপ্রকাশ), তুষার আবদুল্লাহর 'ভাষাকন্যা' (অ্যাডর্ন), সাব্বির নেওয়াজের 'কলমের টানে' (সাহস) এবং ধ্রুব এষের 'অনু এবং ছয় দফা খাতা' (সময়)।

মেলামঞ্চের আয়োজন : গতকাল বিকেল ৪টায় মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় মিল্টন বিশ্বাস রচিত 'উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রশান্ত মৃধা। আলোচনা করেন পাপড়ি রহমান ও মোজাফ্‌ফর হোসেন। বক্তব্য দেন মিল্টন বিশ্বাস। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আনোয়ারা সৈয়দ হক। সন্ধ্যায় ছিল কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
প্রাবন্ধিক বলেন, 'উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু' গ্রন্থে শেখ মুজিবুর রহমানকে কেন্দ্র করে যত উপন্যাস রচিত হয়েছে, সবক'টিই আলোচনায় এসেছে। তিনি আলোচিত উপন্যাসগুলোর প্রতিটিতে সময় ও সমকালীন রাজনীতির ঘটনাক্রমের সঙ্গে তুলনা করেছেন। এসব উপন্যাসে ঔপন্যাসিকরা কাহিনি নির্মাণের জন্য ভাষা এমনকি উপভাষা আর সংলাপের ক্ষেত্রে যে মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তাও আলোচনা করেছেন।

আলোচকরা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখিত উপন্যাসগুলোকে শৈল্পিক ও ঐতিহাসিক দুটি দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখার অবকাশ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের ইতিহাস সমার্থক। তিনি হলেন সেই মহামানব, যার মধ্য দিয়ে আমরা স্বদেশকে উপলব্ধি করতে পারি। বাংলার ইতিহাসের এই মহান নেতাকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে রেখে উপন্যাসের ভাষ্য নির্মাণ এবং সব ধরনের শিল্পমাধ্যমে তার গৌরবগাথা তুলে ধরা একান্ত প্রয়োজন।

মিল্টন বিশ্বাস বলেন, এ গ্রন্থ লেখার প্রয়োজনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ২০১৯ সাল পর্যন্ত লিখিত সব উপন্যাস পাঠ আমার জন্য সত্যিই এক অনন্য অভিজ্ঞতা। এসব উপন্যাসে ইতিহাসের নানা কাল-প্রবাহের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বহুমাত্রিক জীবনের চিত্র উঠে এসেছে।
সভাপতির বক্তব্যে আনোয়ারা সৈয়দ হক বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি হৃদয়ের এত কাছের মানুষ যে, তাকে নিয়ে সাহিত্য রচনায় স্বতঃস্টম্ফূর্তভাবেই আবেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। ঔপন্যাসিককে এই আবেগের স্রোত এড়িয়ে নির্মোহভাবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে উপন্যাস লিখতে হবে এবং আমাদের নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর কীর্তিময় জীবনগাথা সাহিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।

কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ করেন কবি হালিম আজাদ, শাকিরা পারভীন, বায়তুল্লাহ কাদেরী এবং নাজমুল হুসাইন বিদ্যুৎ। আবৃত্তি পরিবেশন করেন রফিকুল ইসলাম, ডালিয়া আহমেদ, শুচিতা সপর্যা। সংগীত পরিবেশন করেন ফকির আজমল শাহ, আনোয়ার হোসেন, কাঙালিনি সুফিয়া, আমজাদ দেওয়ান, মমতা দাসী বাউল এবং প্রশান্ত সরকার। যন্ত্রাণুষঙ্গে ছিলেন গৌতম মজুমদার (তবলা), হোসেন আলী (বাঁশি), নওফেল বাদশা (দোতারা), শিবনাথ শিবু (বাংলা ঢোল), বাউল মিলন (মন্দিরা)।

আজকের আয়োজন : আজ নবম দিন মেলা চলবে বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত। বিকেল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে দিব্যদ্যুতি সরকার রচিত 'বঙ্গবন্ধুর কারাজীবন' শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন রাশিদ আসকারী। আলোচনায় অংশ নেবেন সাহিদা বেগম ও আশফাক হোসেন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আবুল মোমেন। সন্ধ্যায় রয়েছে কবিকণ্ঠে কবিতাপাঠ, আবৃত্তি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

আরও পড়ুন

×