ঢাকা রোববার, ২৮ জুন ২০২৬

যন্ত্রণা ও ক্ষত ভুলে ঘুরে দাঁড়াতে চায় ওরা

যন্ত্রণা ও ক্ষত ভুলে ঘুরে দাঁড়াতে চায় ওরা
×

ফাইল ছবি

আতাউর রহমান

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২০:৫০ | আপডেট: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ২১:০৯

পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা মোড়ে চারতলা ওয়াহেদ ম্যানশন এক বছর পরও রাতের ট্র্যাজেডির নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটির ওপরের দিকে তাকালে আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া ইটের স্তর এখনও চোখে পড়ে। এর ঠিক বিপরীত পাশের চারতলা ভবনটিও সেই রাতের আগুনের ক্ষত বহন করে চলেছে। তবে পুড়ে যাওয়া অন্য ভবনগুলো এরই মধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। পোড়া যন্ত্রণা আর স্বজন হারানোর ক্ষত ভুলে এলাকার বাসিন্দারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় রয়েছেন। গত কয়েকদিন ওই এলাকা ঘুরে, হতাহতের পরিবারের সঙ্গে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে লাগা আগুনে চুড়িহাট্টার সরু গলিটা তখন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। রাস্তা জুড়ে পড়ে ছিল পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া মানুষের দেহের অংশবিশেষ, আটকে থাকা পোড়া গাড়ির কঙ্কাল। পোড়া ধ্বংসস্তূপ ঘেঁটে অঙ্গার হওয়া ৬৭ জনের লাশ উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকর্মীরা। চারজন মারা যান চিকিৎসাধীন অবস্থায়। তবে এক বছর পরও তিনটি লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। যাদের অবহেলা আর লোভে আগুনের এত ভয়াবহতা, সেই ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখিও করা যায়নি। এমন পরিস্থিতিতে আজ নানা কর্মসূচিতে স্থানীয় বাসিন্দারা শোকের দিনটি পালন করছেন।

গত কয়েকদিন চুড়িহাট্টা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যে ভবন থেকে আগুন ছড়িয়েছিল, সেই ওয়াহেদ ম্যানশনের পশ্চিম পাশের একটি ভবনের নিচে ছিল সেলিম আহমেদ লিটনের মুদি দোকান। ঘটনার সময় তিনি দোকানেই ছিলেন। তবে দৌড়ে প্রাণে বাঁচলেও আহত হয়েছিলেন। ঘটনার তিন মাসের মধ্যে ঋণ করে নিজের দোকানটি আবার চালু করেছেন।

সেলিম আহমেদ লিটন জানান, সেই রাতের কথা মনে পড়লে তিনি এখনও শিউরে ওঠেন। তিনি দৌড়াচ্ছিলেন, আগুনও যেন তার পেছনে দৌড়াচ্ছিল। এর মাঝেই বেঁচে গেছেন। তার কথা- জীবনকে তো আর থামিয়ে রাখা যায় না। সংসার চালাতে ফের একই জায়গায় দোকান চালু করেছেন।

লিটনের দোকানের পাশেই একটি দন্ত চিকিৎসালয় থেকে দগ্ধ কয়েকজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর আর সেখানে দন্ত চিকিৎসালয় চালু না হলেও ওই জায়গায় এখন চায়নিজ ও ইন্ডিয়ান খাবারের রেস্তোরাঁ চালু করেছেন অন্য মালিক। ওই রেস্তোরাঁর কর্মীরা বলছিলেন, তিন মাস আগে রেস্তোরাঁ চালুর পর জেনেছেন, এখানে আগুন লেগেছিল। তবে এই দোকানটার ভেতরেই যে মানুষ পুড়ে মরেছে, তা জানতেন না।

সেই রাতে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়াদের মধ্যে ২৭ জন নানা পেশার শ্রমিক ছিলেন। তাদের মধ্যে একজন রিকশাচালক আনোয়ার হোসেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে চার শিশুসন্তানকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন তার স্ত্রী হাজেরা বেগম। ওই সময় চুড়িহাট্টার অদূরে ইসলামবাগে ভাড়া বাসায় থাকলেও বাসা ভাড়া কমাতে এখন কামরাঙ্গীরচরে বসবাস করেন তিনি। হাজেরা বেগম বলেন, শুরুর দিকে ধারদেনা করে চলেন। আর পেরে উঠছিলেন না। শেষ পর্যন্ত সংসার চালাতে খেলনা তৈরির একটি কারখানায় কাজ নিয়েছেন।

ওই রাতে চুড়িহাট্টার গলি দিয়ে ভ্যানে করে মালামাল নিয়ে যাচ্ছিলেন মো. সোহেল। হঠাৎ করেই আগুন তাকে ঘিরে ধরে। ভ্যান আর মালামাল রেখে দৌড়ে প্রাণে রক্ষা পান। এক বছর পর গত সোমবার সেই চুড়িহাট্টায় দাঁড়িয়ে সোহেল বলছিলেন, আতঙ্কে তিনি ঘটনার পর কয়েক মাস ওই এলাকা দিয়ে যাতায়াত করেননি। কোথাও আগুন দেখলেই তিনি আতঙ্কে দৌড়ান। কিন্তু জীবন চালাতে আবার সেই ভ্যান চালানো শুরু করেছেন। এখন আতঙ্ক থাকলেও চুড়িহাট্টার সেই গলি দিয়েই যাতায়াত করেন।

নিহত ৬৭ জনের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত : চুড়িহাট্টার আগুনে নিহতের মধ্যে ৬৭ জনের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে। শিগগিরই তা ওই ঘটনায় দায়ের মামলার তদন্ত সংস্থা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করবে। গতকাল বুধবার নিজ কার্যালয়ে এই তথ্য জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ।

ফরেনসিক মেডিসিনের এই শিক্ষক বলেন, ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়া ৬৭ জনের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে বিভিন্নভাবে স্বজনরা ৪৫ জনকে শনাক্ত করেছিলেন। বাকি ২২ জনের ডিএনএ প্রোফাইল করা হয়। এর মাধ্যমে ১৯ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়। বাকিদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

তিনি বলেন, যারা এখনও তাদের স্বজনকে পাননি, তারা ডিএনএ নমুনা দিয়ে যাননি। তারা নমুনা দিয়ে গেলে ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে তাদেরও শনাক্ত করা হবে।

ট্র্যাজেডির এক বছরে নানা কর্মসূচি : চুড়িহাট্টা ট্র্যাজেডির এক বছর উপলক্ষে স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৭টা থেকে ওই এলাকার মানুষ নিহতদের স্মরণে কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। এ ছাড়া স্থানীয় মসজিদগুলোতে সকাল থেকে কোরআন খতম ও বিশেষ দোয়ার আয়োজন করা হয়েছে। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয় লোকজন বিদায়ী মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে তার কার্যালয়ে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর দুপুর আড়াইটার দিকে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিহতের স্মরণে আলোচনা সভা ও মানববন্ধনের আয়োজন করেছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া গত বছর আগুন লাগার সেই সময়ে আজ রাত ১০টা ৩২ মিনিটে আগুনে হতাহতের পরিবারের সদস্যরা চুড়িহাট্টা চত্বরে জড়ো হবেন। তারা নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালন এবং স্মৃতিচারণ করবেন।

এ ছাড়া আগামীকাল শুক্রবার সকাল ১১টায় চুড়িহাট্টায় সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছে স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলো। জুমার নামাজের পর সব মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার দাবিতে ঘটনাস্থলে মানববন্ধন করবেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

আরও পড়ুন

×