সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া থাইল্যান্ডে অবৈধ সম্পদ
সাহাদাত হোসেন পরশ
প্রকাশ: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:০৪ | আপডেট: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১৫:২১
শুদ্ধি অভিযানে গ্রেপ্তার ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার বিদেশে অর্থ পাচারে প্রমাণ পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে টাকা পাচার করেছেন তিনি। এ ছাড়া সিঙ্গাপুরে খুলেছিলেন অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আর মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম গড়ে তুলেছিলেন। ক্যাসিনোকাণ্ডে গ্রেপ্তারের ঘটনায় দায়ের করা মানি লন্ডারিং আইনের মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি এসব তথ্য পেয়েছে। আজ রোববার খালেদসহ ছয়জনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করবে সিআইডি। ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে শুদ্ধি অভিযানের পর মানি লন্ডারিং আইনে এটিই প্রথম চার্জশিট।
চার্জশিটের অন্য যারা অভিযুক্ত হচ্ছেন তারা হলেন- মাসুদ মাহমুদ ভুঁইয়া, হাসান মাহমুদ ভুঁইয়া, হারুন রশিদ, শাহাদৎ হোসেন উজ্জ্বল ও মোহাম্মদ উল্লাহ খান।
ক্যাসিনোকাণ্ডের পর ১২ জনের অবৈধ সম্পদের হিসাব খুঁজছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এর মধ্যে আটজনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ সমকালকে বলেন, মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের করা মামলায় খালেদসহ ছয়জনকে আসামি করে আজ চার্জশিট দেওয়া হবে। তাদের অবৈধ অর্থ-সম্পদের হিসাব পাওয়া গেছে। আর কয়েকজনের ব্যাপারে অনুসন্ধান করা হচ্ছে।
সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারুক হোসেন বলেন, মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের অন্যান্য মামলার তদন্তে অনেক অগ্রগতি রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে আরও কয়েকটি মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।
সিআইডির উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, মানি লন্ডারিং মামলার তদন্তের সময় খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার পাসপোর্ট ও বিদেশের ভ্রমণবৃত্তান্ত পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায়, পাসপোর্টে কোনো বিদেশি মুদ্রা এনডোর্সমেন্ট ছাড়াই অনেকবার বিদেশে গেছেন। ওই সময় পাচারের উদ্দেশ্যে নগদ বিদেশি মুদ্রা সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন।
দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, খালেদের পাসপোর্ট নম্বর ছিল বিএম-০২৮৯২৮১। সেখানে মালয়েশিয়ার ভিসা নম্বর ছিল পিই-০৫১১১৬৪, যা ইস্যু হয় ২০১৮ সালের ৪ মে। মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ২০২১ সালের ৩ মে। যে ক্যাটাগরিতে খালেদ ভিসা পান, তা 'সেকেন্ড হোম ভিসা' নামে অধিক পরিচিত। এই ভিসা গ্রহণের শর্ত হিসেবে মালয়েশিয়ার আরএইচবি ব্যাংকের জাহুবারু ব্রাঞ্চে তিন লাখ রিঙ্গিত এফডিআর করা আছে খালেদের। ওই অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে পাচার হয়েছে। ওই ব্যাংক থেকে নেওয়া ডেবিট কার্ডও ব্যবহার করতেন খালেদ।
তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, সিঙ্গাপুর সিটির জুর্যাং ইস্ট এলাকায় মেসার্স অর্পণ ট্রেডার্স প্রাইভেট লিমিটেড নামে খালেদের একটি কোম্পানি রয়েছে। এই কোম্পানির মূলধন বেআইনিভাবে হুন্ডির মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে পাচার করেন তিনি। খালেদ ও তার কোম্পানির নামে ব্যাংক হিসাব থাকার প্রমাণ হিসেবে ইউওবি ব্যাংকের ডেবিট কার্ডও জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া খালেদের নামে থাইল্যান্ডের ব্যাংককের একটি ব্যাংকে ২০ লাখ টাকার সমপরিমাণ থাই মুদ্রা জমা থাকার তথ্য পেয়েছে সিআইডি। থাইল্যান্ডের ব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া খালেদের দুটি ডেবিট কার্ড পাওয়া গেছে।
সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, খালেদের নির্দেশে অভিযুক্ত মোহাম্মদ উল্লাহ বিদেশি মুদ্রা ক্রয় করতেন। খালেদ, মোহাম্মদ উল্লাহ ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে পরস্পর যোগসাজশে অবৈধ মাদক, অস্ত্র, টেন্ডারবাজিসহ সংঘবদ্ধ অপরাধ, আয় জ্ঞাতসারে স্থানান্তর, হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি মুদ্রায় অবৈধভাবে বিদেশে পাচার ও পাচারের চেষ্টায় জমা রাখার প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি। মোহাম্মদ উল্লাহ ২০১২ সাল থেকে খালেদের মালিকানাধীন ভূঁইয়া অ্যান্ড ভূঁইয়া ডেভেলপার লিমিটেড, অর্পণ প্রপার্টিজ, অর্ক ব্লিডার্স নামে তিনটি ফার্মের জেনারেল ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি খালেদের নির্দেশে তার অপরাধলব্ধ আয় গ্রহণ করে খালেদের ভাই মাসুদ ভূঁইয়াকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন ব্যাংকে জমা দিতেন।
জানা গেছে, তদন্তে খালেদের বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব নম্বরেই ৪১০ কোটি ৩০ লাখ টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ওই অর্থের মধ্যে ২৭৮ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। বর্তমানে ব্যাংকে রয়েছে ২৯ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। এই অর্থের বৈধ সোর্স দেখাতে পারেননি তিনি। তার মোট ব্যাংক হিসাব নম্বর আছে ৫২টি।
খালেদ ছাড়াও ঠিকাদার মোগল জি কে বিল্ডার্সের কর্ণধার জি কে শামীমের ব্যাংকে টাকা পাওয়া গেছে ৩২৪ কোটি ৫৬ লাখ। তার ব্যাংক হিসাব নম্বর রয়েছে ১৯৪টি। অনলাইন ক্যাসিনো কারবারি সেলিম প্রধানের থাইল্যান্ডে বাগানবাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ছাড়া একাধিক প্রতিষ্ঠানে কর্ণধার তিনি। এস-সেভেন, টি-২১, পি-২৪, প্রধানস স্পা হাউস, প্রধানস ফ্যাশন হাউস, প্রধানস ল ফার্ম, প্রধানস হাউস, এসডি কনসাল্টিং অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড, ফিশিং কোম্পানি, জাপান-বাংলাদেশ প্রিন্টিং প্রেসসহ অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। তার মোট ৮৩টি ব্যাংক হিসাব নম্বর পাওয়া গেছে।
ক্যাসিনো হোতা দুই ভাই এনামুল হক ওরফে এনু ভূঁইয়া ও রুপন ভূঁইয়ার ২০টি বাড়ি থাকার তথ্য মিলেছে। তাদের ৯১টি ব্যাংক হিসাব নম্বরে ১৯ কোটি ১১ লাখ টাকা রয়েছে। তিনটি প্রাইভেটকার ও তিনটি মোটরসাইকেলের মালিক তারা।
কাউন্সিলর পাগলা মিজানেরও বিপুল অর্থ ও সম্পদের খোঁজ মিলেছে। মোহাম্মদপুরে তার একটি মার্কেট রয়েছে। স্বপ্নপুরী হাউজিংয়ে আছে চারটি ফ্ল্যাট। পুরানা পল্টনে রয়েছে পাঁচতলা বাড়ি। আওরঙ্গজেব রোডে দুই হাজার ২০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট। এ ছাড়া যুবলীগের সাবেক নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের দেশে-বিদেশে বিপুল সম্পদ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। আরও যাচাই-বাছাই শেষে তার বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা করা হবে।
গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর দলের যৌথ সভায় দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা। এরপর দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় ছাত্রলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়ার কথা বলেন। ওই সভায় যুবলীগের দুই নেতার সমালোচনা করা হয়। এর পাঁচ দিনের মাথায় ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরপর তাকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়। অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি ক্লাব ও বারে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে এখন অভিযান প্রায় থমকে গেছে।
- বিষয় :
- খালেদ
- অবৈধ সম্পদ
- সিঙ্গাপুর
- মালয়েশিয়া
- থাইল্যান্ড
