ত্রাণের জন্য লড়াই
ঝুঁকি বাড়ছে বিশৃঙ্খল বিতরণে
চাহিদার তুলনায় ত্রাণসামগ্রী অপ্রতুল। পরিস্থিতি তাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে কখনও কখনও। বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির ত্রাণ বিতরণের সময় অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় -ফোকাস বাংলা
জাহিদুর রহমান
প্রকাশ: ০২ এপ্রিল ২০২০ | ০০:৩০
করোনা সংকটে দিশাহীন নিম্ন আয়ের মানুষ ও হতদরিদ্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন মানবিক কিছু মানুষ। এসব উদ্যোগ প্রশংসিত হলেও সমন্বয়ের অভাবে পর্যাপ্ত সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন আছে স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়েও। কেউ কেউ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ত্রাণ বিতরণ করলেও অধিকাংশই তা মানছেন না। কয়েকদিন ধরে ঢাকার রাস্তায় গাড়িতে করে ঘুরে ঘুরে অনেকেই ত্রাণ দিচ্ছেন। এতে একদিকে যেমন বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে আবার ত্রাণের আশায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষ রাস্তায় বসে আছে। ত্রাণের গাড়ি এলেই তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন স্থানে ত্রাণদাতাদের পালিয়ে আসতে হয়েছে। মারামারির ঘটনাও ঘটেছে কোথাও কোথাও।
বুধবার দুপুরে শ্যামলীতে রাস্তার পাশে বসে থাকতে দেখা যায় বহু মানুষকে। তারা বলছেন, রাত থেকে ঘুরেও কিছু পাননি। তবুও তারা আশায় বুক বেঁধে রাস্তায় নামেন। শুধু শ্যামলী নয়, গতকাল সকাল থেকে গুলিস্তান, জাতীয় প্রেসক্লাব, শাহবাগ, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, জিগাতলা এলাকায় প্রায় প্রতিটি মোড়েই সাহায্যপ্রত্যাশীদের ভিড় ছিল কয়েক দিনের তুলনায় বেশি।
গতকাল দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ঢাকা মহানগর দোকান মালিক সমিতির উদ্যোগে দ্রব্যসামগ্রী বিতরণের সময় বিশৃঙ্খলা ও মারামারির ঘটনা ঘটে। এ সময় ত্রাণ নেওয়ার জন্য কাড়াকাড়ি ও হুড়োহুড়ি লেগে যায়। এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে খাবার বিতরণের সময় বিশৃঙ্খলার মধ্যে ত্রাণ বিতরণ শেষ না করেই চলে যান আয়োজকরা। একই দিন গুলিস্তানে সমাজসেবা অধিদপ্তরের পিকআপভ্যানটিকে ঘিরে ধরে আশপাশের ভবঘুরে মানুষ ও রিকশাচালকরা। বিতরণের অপেক্ষা না করে মুহূর্তেই তারা নিজেরা ভ্যান থেকে ত্রাণের ব্যাগ নিয়ে পালাতে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, যত্রতত্র ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। রাস্তাঘাটে যেখানে সেখানে যানবাহন থেকে বিতরণের ফলে সঠিকভাবে ত্রাণ বণ্টন হচ্ছে না। গাড়ি থেকে ত্রাণসামগ্রী নিক্ষেপের ফলে হুড়োহুড়ি করে ত্রাণ নিতে গিয়ে শক্ত-সামর্থ্যরাই ত্রাণ পাচ্ছেন। অন্যদিকে দুর্বলদের কাছে ত্রাণ পৌঁছাচ্ছে না। আবার একই ব্যক্তি একাধিক ত্রাণের প্যাকেট লুফে নিচ্ছেন। কাড়াকাড়ি করে আহত হচ্ছেন অনেকে।
আবার অনেকে ত্রাণ বিতরণের নামে শোডাউন ও প্রচার চালাচ্ছেন। ফেসবুকে ত্রাণ বিতরণের ছবিও শেয়ার করছেন তারা। এতে সম্মান ক্ষুণ্ণের অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ। ফেসবুকে একজন লিখেছেন, 'কখনও কারও কাছে হাত না পাতা আমার পরিবার সাহায্য নিচ্ছে নিতান্তই জীবনের তাগিদে। ফেসবুকে বাবার খাবারের প্যাকেট নেওয়ার ছবিটা দেখে ডুকরে কেঁদে উঠতে ইচ্ছে হলো। আমরা নিম্নমধ্যবিত্ত, করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের সাহায্য প্রয়োজন। তাই বলে বাবার নত মুখ দেখে নয়, আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে নয়।'
সাহায্যের নামে বিশৃঙ্খলা বন্ধে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের কথা বলছেন বিশ্নেষকরা। গত রোববার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, কর্মহীন ও যারা দৈনিক আয়ের ভিত্তিতে সংসার চালান, তাদের তালিকা প্রস্তুত করে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় পর্যায়ে বিত্তশালী ব্যক্তি, সংগঠন, এনজিও কোনো খাদ্য সহায়তা দিলে জেলা প্রশাসকরা প্রস্তুতকৃত তালিকার সঙ্গে সমন্বয় করবেন, যাতে দ্বৈততা পরিহার করা যায় এবং কোনো কর্মহীন মানুষ যেন বাদ না পড়ে। সামগ্রিকভাবে সমন্বিত কার্যক্রম এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু গত কয়েকদিনে এ নির্দেশনা মানতে দেখা যায়নি অধিকাংশ এলাকায়। যে যার মতো ত্রাণ বিতরণ করছে।
খাদ্য নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি নুরুল আলম মাসুদ সমকালকে বলেন, ত্রাণ বিতরণে বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি পারস্পরিক দূরত্বও নিশ্চিত হচ্ছে না। তাতে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ কঠিন হয়ে পড়বে। সরকার উপজেলাভিত্তিক কম আয়ের এবং কর্মহীনদের তালিকা তৈরি করে প্রকাশ করতে পারে। যারা ত্রাণ দিতে চাইবে তারা সেই তালিকা অনুসরণ করবে। এ ছাড়া সময়, খরচ এবং পারস্পরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে বিকল্প বিতরণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। আপৎকালীন খাদ্য বীমা প্রতিষ্ঠা বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে খাদ্য সংকটে থাকা মানুষদের অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে দেওয়া যেতে পারে।
- বিষয় :
- ত্রাণ
- করোনা
- ত্রাণ বিতরণ
