সরেজমিন তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড
তবুও পণ্যবাহী ট্রাকে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ
প্রতীকী ছবি
আবু সালেহ রনি
প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২০ | ১১:৪৬ | আপডেট: ৩০ নভেম্বর -০০০১ | ০০:০০
রাত ৯টা। ঢাকার তেজগাঁওয়ে প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক সড়ক। কয়েকটি ট্রাক ঘিরে শত মানুষের জটলা। হঠাৎই জোরে চিৎকার করে কেউ বলে উঠলেন, 'ডাইরেক্ট। ডাইরেক্ট। এক হাজার এক হাজার'। কাছে গিয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেল, চারটি ট্রাক ভোলার দৌলতখানে যাচ্ছে। এর মধ্যে একটি ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো-১১-৩০৯১) সামনে ড্রাইভারের পাশে নারী ও শিশুদের বসানো হয়েছে। আর ট্রাকের পাটাতনে গাদাগাদি করে বসে আছে ৩০-৩৫ জন মানুষ।
এটি গত শুক্রবারের চিত্র। এরপর রোববার ঘটনাস্থল গিয়েও পণ্যবাহী ট্রাকের প্রতীক্ষায় অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড় দেখা গেছে। রাত গভীর হলেই পণ্যবাহী ট্রাকগুলো মানুষ নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছেড়ে যাচ্ছে। অথচ করোনাভাইরাসের বিস্তৃতি রোধে সারাদেশেই বাস-ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এমনকি সুনির্দিষ্টভাবে পণ্যবাহী ট্রাকে মানুষ বহন করাও নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এর পরও তেজগাঁওয়ের এই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি।
এদিকে রোববার করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ঢাকায় ঢুকতে এবং বের হতে দেওয়া হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। কিন্তু এর পরও রাতে ট্রাকস্ট্যান্ডে পণ্যবাহী ট্রাকগুলো ঘিরে সাধারণ মানুষের জটলা দেখা গেছে। ট্রাকে তাঁবুর ছাউনির ভেতরে মানুষ বহনের প্রস্তুতিও রয়েছে চালকদের। জানা গেছে, গত ২৫ মার্চ থেকে সারাদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করার পর থেকেই প্রতিদিন ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে পণ্যবাহী ট্রাকে মানুষ বহন করা হচ্ছে। যেসব ট্রাক দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে কারওয়ান বাজারে পণ্য নিয়ে ঢাকায় আসে, সেই ট্রাকগুলো প্রধানত ঢাকা ছাড়ার সময় মানুষ বহন করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (পরিদর্শক, তদন্ত) কাজী শরিফুল ইসলাম বলেন, 'বিষয়টি নজরে আসেনি। পণ্যবাহী ট্রাকে মানুষ বহন করা এখন সম্পূর্ণ নিষেধ। জনস্বার্থে এ বিষয়ে খোঁজখবর নিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।'
ট্রাকস্ট্যান্ডে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান। সঙ্গে তার খালাতো ভাইও। হঠাৎ করে ঢাকা ছাড়ার কারণ জানতে চাইলে হাফিজুর রহমান বলেন, 'দেশের এমন পরিস্থিতিতে গ্রামে না গিয়ে ঢাকায় থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম; কিন্তু এখন যেভাবে ছুটি বেড়ে চলেছে, তাতে গ্রামে গিয়ে স্বজনদের সঙ্গে থাকাই ভালো। তা ছাড়া সামনে শবেবরাত ও পহেলা বৈশাখও আছে।' করোনা আক্রান্তের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিলে তিনি বলেন, 'হাতে গ্লাভস, মুখে মাস্ক আছে। একটু সাবধানে যাব আর কি।'
ভোলার দৌলতখান যাওয়ার জন্য ট্রাকে বসা আরেক যাত্রী সোলায়মান বলেন, 'চালকের সঙ্গে এক হাজার টাকার চুক্তি হয়েছে। এভাবেই সবাই যাচ্ছে।' তিনি জানান, ব্যবসার কাজে ট্রাকে করেই ঢাকা এসেছিলেন। কাজ শেষ হয়েছে এখন, আবার এলাকায় ফিরে যাচ্ছেন। ঝুঁকি থাকলেও নিরুপায় হয়ে যাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।
জানতে চাইলে পরিচয় না দিয়ে ট্রাকের (ভোলা নম্বর-১১-০৯০) চালক জানান, তরমুজ নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। আবার কবে ট্রিপ পাবেন, তার কোনো ঠিক নেই। তাই মানুষ নিয়ে যাচ্ছেন। পথে পুলিশ ধরবে কিনা, এমন প্রশ্নে বলেন, বৃষ্টির জন্য আমাদের কাভার আছে, সেটা দিয়ে দেবো।
বাংলাদেশ ট্রাক ও কাভার্ডভ্যান ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি তালুকদার মোহাম্মদ মনির বলেন, 'আমিও জেনেছি। বারবার নিষেধ করার পরও এটা হচ্ছে। প্রশাসন আইনগত কোনো ব্যবস্থা নিলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই।' তিনি আরও বলেন, করোনাভাইরাস এখন যেভাবে ছড়াচ্ছে, তাতে এ ধরনের কাজ করাও এক ধরনের চুরি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তারা পণ্য নিয়ে ঢাকায় আসেন। ফেরার পথে মানুষ বোঝাই করে নিয়ে যায়। তাদের চিহ্নিত করে ইউনিয়ন থেকে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হবে বলেও জানান তিনি।
পণ্যবাহী ট্রাকে মানুষ বহনের বিষয়ে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের সভাপতি মনজিল মোরসেদ বলেন, 'পণ্যবাহী ট্রাকে করে যে ব্যক্তি যাচ্ছেন তিনি শুধু নিজেরই ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন তাই নয়, অন্যদের জন্যও ঝুঁকি বাড়াচ্ছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের আরও কঠোর হওয়া প্রয়োজন। না হলে করোনা যেভাবে মহামারিতে রূপ নিচ্ছে, সেখান থেকে আমাদের উন্নতি করা দুরূহ হয়ে যাবে।'
