গুলশানে চাঁদাবাজি
আসিফ, ইশরাক নীলা মার্কেট, ওয়েস্টিন এবং শাহবাগ
আসিফ মাহমুদ
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৫ | ০১:৪০ | আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০২৫ | ০৮:৩৮
রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় চাঁদাবাজির ঘটনায় গ্রেপ্তার জানে আলম অপুর একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) বহিষ্কৃত যুগ্ম আহ্বায়ক অপুকে দিয়ে এই ভিডিও বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন জোরপূর্বক বানিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন অপুর স্ত্রী আনিসা। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন তিনি। অপুর স্বীকারোক্তির ৩৫ মিনিটের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে গত বুধবার রাতে।
এদিকে অপুর বক্তব্যে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম আসায় এ ব্যাপারে তিনি একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
চাঁদাবাজির ঘটনায় মামলায় অপু ছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা আবদুর রাজ্জাক বিন সোলাইমান ওরফে রিয়াদ, ইব্রাহিম হোসেন ওরফে মুন্না, সাকাদাউন সিয়াম, সাদমান সাদাব ও অপ্রাপ্তবয়স্ক একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আনিসা বলেন, ‘৩১ জুলাই রাত সাড়ে ১১টার পর থেকে ১ আগস্ট সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত অপু নিখোঁজ ছিলেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে মোটরসাইকেলে করে অপুকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই স্থানে অল্প অল্প করে শিখিয়ে অপুকে দিয়ে সেই ভিডিওর স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে।’
আনিসা বলেন, ‘অপুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে গোপীবাগের একজনের বাসার সামনে থেকে। কিন্তু তাকে ১১টার পর গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। মাঝখানের সাড়ে চার ঘণ্টা অপুকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে। এ ছাড়া তাকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই কয়েকদিন আমাদেরও পুলিশ ও ডিবি হয়রানি করেছে।’
অপুর সঙ্গে গত ৮ আগস্ট কারাগারে দেখা হয়েছিল জানিয়ে আনিসা বলেন, ‘সেখানে অপু আমাকে কিছু তথ্য দেয়। অপু বলে, তাকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে একটি বড়োসড়ো ভিডিও বানানো হয়েছে। যে কোনো সময় ভিডিওটি প্রকাশ করতে পারে। যদি প্রকাশ করে তাহলে তোমার দ্বারা সম্ভব হলে কিছু বলার চেষ্টা করো।’ আনিসা আরও বলেন, ‘অপু চাঁদাবাজি করেনি। তাকে দিয়ে কেউ চাঁদাবাজি করায়ওনি। অপু কারও পরিকল্পনায় ফেঁসে গেছে। তাকে ব্যবহার করে একটা দল নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চাইছে কাউকে দাবানোর জন্য।’
কোন দল এটি করছে– এ প্রশ্নের জবাবে আনিসা বলেন, ‘গোপীবাগে ইশরাক ভাইয়ের বাসা, এটা সবাই জানে। অপুকে তার বাসার সামনে থেকেই ধরেছে। যেসব ছবি ঘুরে বেড়াচ্ছে, সেগুলো ইশরাক ভাইয়ের বাসার। অপুকে ধরে নিয়ে ইশরাক ভাই জোরপূর্বক এসব করাইছে, এখানে সন্দেহের কিছু নাই।’
চাঁদাবাজির অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত: আসিফ মাহমুদ
চাঁদাবাজিকাণ্ডে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নাম আসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজির সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। যা বলা হচ্ছে, তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। একজনের যে স্টেটমেন্ট (স্বীকারোক্তি) নেওয়া হয়েছে, তা জোর করে নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।’ বৃহস্পতিবার দুপুরে সচিবালয়ে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘তার (অপু) স্টেটমেন্টে আমার নাম আসার পর একরকম অবাক হয়েছি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। তার স্ত্রী পরিচয়ে একজন বলেছেন, তাকে জোর করে গুম করে স্টেটমেন্ট নেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকেও এমন শুনছি। ৫ আগস্টের পর এমন ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না।’ উপদেষ্টা বলেন, ‘আমার মনে হয় না, এখনও কেউ এ রকম কোনো প্রমাণ দিতে পেরেছে, আমার সম্পৃক্ততা আছে। এই সাক্ষাৎকার একজন রাজনৈতিক নেতার বাসায় জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এসেছে। এটাও অত্যন্ত গুরুতর একটা অভিযোগ এবং পরিবারের দিক থেকে এসেছে। যথেষ্ট রিলায়েবলও (বিশ্বাসযোগ্য) এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে।’ আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘মাঝেমধ্যেই রাতে যখন কাজ শেষ হয়, কখনও কখনও ভোরও হয়ে যায়, ওই সময় রাতের খাওয়া-দাওয়া দেওয়ার মতো কেউ থাকে না। আমি বেশির ভাগই যাই ৩০০ ফিটের নীলা মার্কেট বলে একটা জায়গায়। ওখানে হাঁসের মাংস খুব ভালো পাওয়া যায়। ওখানে হয়তো যাই চার-পাঁচজন মিলে। ওটা আবার বেশি ভোর হয়ে গেলে বন্ধ থাকে। তখন ওদিকে ওয়েস্টিনে যাওয়া হয়। তবে ওই দিন আমি গিয়েছিলাম কিনা, সেখানে ছিলাম কিনা– এটা আমার মনে নাই।’ তিনি বলেন, ‘সিসিটিভিতে যে কাউকে যদি আমি (আসিফ মাহমুদ) বলে দাবি করা হয়, এটা আসলে কতটা বিশ্বাসযোগ্য জানি না। এ বিষয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। এটা তদন্তের অধীনে একটা বিষয়। তারপরও অনেক কিছু বললাম, কারণ আমার নাম এসেছে। তবে হেলমেট পরা যে কাউকে যে কারও সঙ্গে মিলিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়।’
চাঁদাবাজিতে উপদেষ্টাদের কেউ জড়িত থাকার বিষয়টি স্পষ্ট করা দরকার– সালাহউদ্দিন আহমেদ
গুলশানে চাঁদাবাজির ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো উপদেষ্টা জড়িত কিনা– তা স্পষ্ট করে জনগণের সামনে তুলে ধরা দরকার বলে উল্লেখ করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। বৃহস্পতিবার প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, যদি এই ঘটনার তদন্ত না হয়, উপদেষ্টাদের বিষয়ে আরও প্রশ্ন উঠবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত তদন্ত হওয়া উচিত।
ইশরাকের বিরুদ্ধে মিছিল
বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম গুম, শারীরিক নির্যাতন, জোরপূর্বক মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় ও মানবাধিকার হরণের অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে গতকাল বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে ঝাড়ু মিছিল হয়েছে। ‘সচেতন নাগরিক সমাজের’ ব্যানারে জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ মিছিল হয়।
- বিষয় :
- চাঁদাবজি
