ইনোভেশন কনসালটিংয়ের গবেষণা
ব্যাটারি রিকশাচালকদের ৭৫% অনভিজ্ঞ, ২১% কৃষি থেকে আসা
ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ১১:৩০
ঢাকা শহরে ব্যাটারিচালিত রিকশার বিস্তার দ্রুতগতিতে বাড়ছে। সেই সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে প্রশিক্ষণহীন চালক, নিবন্ধনহীন যান এবং সড়ক নিরাপত্তার বাড়তি ঝুঁকি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনোভেশন কনসালটিংয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চালাচ্ছেন এমন চালকের প্রায় ৭৫ শতাংশই নতুনভাবে এই পেশায় এসেছেন। তাদের আগে ব্যাটারি রিকশা চালানোর কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। এমনকি বড় একটি অংশ কখনও প্যাডেল রিকশাও চালাননি। এদের বড় অংশই এসেছেন কৃষি থেকে।
গতকাল রোববার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভবনে ‘শহরে প্যাডেল রিকশা থেকে ব্যাটারিচালিত রিকশায় রূপান্তর’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে ইনোভেশন কনসালটিং। এতে বলা হয়, ব্যাটারি রিকশাচালকদের বড় অংশ পেশা পরিবর্তন করে এ খাতে এসেছেন।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, প্যাডেল রিকশাচালকদের মধ্যে ৩৭ দশমিক ৫৭ শতাংশের আগের পেশা ছিল কৃষিকাজ। ব্যাটারি রিকশাচালকদের ক্ষেত্রেও কৃষকই সবচেয়ে বড় একক শ্রেণি– ২১ দশমিক ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য অংশ আগে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পোশাক শ্রমিক কিংবা বেকার ছিলেন। প্রায় এক-চতুর্থাংশ চালক সরাসরি প্যাডেল রিকশা থেকে ব্যাটারি রিকশায় রূপান্তর করেছেন।
ইনোভেশন কনসালটিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুবাইয়াত সারওয়ার জানান, ঢাকায় চলাচলরত ব্যাটারিচালিত রিকশার ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশই নিবন্ধনের বাইরে। প্যাডেল রিকশার ক্ষেত্রেও নিবন্ধনহীনতার হার ৮৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
তিনি বলেন, কম শারীরিক পরিশ্রম ও যাত্রী চাহিদা বেশি থাকায় তরুণরা দ্রুত ব্যাটারি রিকশার দিকে ঝুঁকছেন। তবে প্রশিক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ না থাকায় এটি বড় ঝুঁকিতে পরিণত হচ্ছে।
আয়ের দিক থেকে ব্যাটারি রিকশায় রূপান্তরের পর ৫৮ শতাংশ চালক আয় বাড়ার কথা জানিয়েছেন। দিনে ৩১ থেকে ৫০টি ট্রিপ সম্পন্ন করেন এমন ব্যাটারি রিকশাচালকের হার প্রায় ৩৯ শতাংশ, যেখানে প্যাডেল রিকশায় তা মাত্র ১৩ শতাংশ। কিন্তু আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়েছে। যাত্রীদের ৮২ শতাংশ দ্রুত চলাচলের সুবিধায় ব্যাটারি রিকশা ব্যবহার করলেও দুর্ঘটনার তীব্রতা বেশি বলে জানিয়েছেন অনেকে।
গবেষণায় আরও দেখা যায়, ৬২ শতাংশ যাত্রী যানজটের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশাকে দায়ী করেন। নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়েছেন ৫৬ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ। আর ব্যাটারিচালিত রিকশা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার পক্ষে ২১ দশমিক ৯ শতাংশ যাত্রী।
গবেষণায় উঠে এসেছে, ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের মধ্যে ৬০ শতাংশের অভিজ্ঞতা দুই বছরের কম, যেখানে প্যাডেল রিকশাচালকদের বড় অংশের অভিজ্ঞতা ১০ থেকে ১৫ বছর। চালকদের বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তরুণরা (১৮-২৫ বছর) বেশি সংখ্যায় ব্যাটারি রিকশা চালনায় ঝুঁকছেন। কারণ এতে শারীরিক পরিশ্রম কম এবং আয়ের সুযোগ বেশি।
গ্যারেজ মালিকদের আয়-ব্যয়ের তুলনায় ব্যাটারিচালিত রিকশার গ্যারেজ থেকে মাসিক আয় প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, যা প্যাডেল রিকশার গ্যারেজের চেয়ে দ্বিগুণ। তবে রক্ষণাবেক্ষণ খরচও অনেক বেশি, যা প্রায় ৭৫ হাজার টাকা। বিশেষ করে ব্যাটারি বদল ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় বেশি পড়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যাটারির ক্ষেত্রে ১২ ভোল্ট সিসা ব্যাটারির দাম গড়ে ১৫ হাজার টাকা। মাসিক রক্ষণাবেক্ষণে দেড় হাজার টাকা লাগে, যেখানে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির দাম ৪৫ হাজার টাকা হলেও রক্ষণাবেক্ষণ কম এবং টেকসই বেশি।
দুর্ঘটনার ঝুঁকিও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গবেষণার তথ্য বলছে, ব্যাটারিচালিত রিকশায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার হার ২৫ শতাংশ, যা প্যাডেল রিকশার তুলনায় বেশি। মাঝারি ও লঘু দুর্ঘটনার পরিমাণও বেশি। যাত্রীদের ৮২ শতাংশ দ্রুতগতি সুবিধার কারণে ব্যাটারি রিকশা ব্যবহার করলেও দুর্ঘটনার তীব্রতা বেশি বলে মনে করেন। রাস্তায় বিভিন্ন গতির যান চলাচলও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। যানবাহনের ৯৭ দশমিক ৪ শতাংশই নিবন্ধনের বাইরে, যা সড়ক নিরাপত্তার জন্য বড় সংকেত।
অনুষ্ঠানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আকতার মাহমুদ বলেন, একই সড়কে বিভিন্ন গতির যান চলাচল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। রিকশা হঠাৎ তুলে দেওয়া সমাধান নয়, বরং এগুলোকে নিরাপদ, নিয়ন্ত্রিত ও আধুনিক করতে হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোসলেহ উদ্দিন হাসান নিবন্ধন, মানসম্মত নকশা ও চালক প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দেন। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রোগ্রাম ম্যানেজার তাইফ হোসেন, ভয়েস ফর রিফর্মের সহসমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর, সদস্য হাসিবুদ্দিন হোসেন, আকিজ মোটরসের মহাব্যবস্থাপক ইফতেখার হোসেন, ট্রাফিক এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তা সেলিম খান।
- বিষয় :
- ব্যাটারিচালিত রিকশা
