স্মরণসভায় বক্তারা
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলীর প্রাপ্তি মানুষের ভালোবাসা
রাজধানীর ধানমন্ডিতে গতকাল শুক্রবার অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান স্মরণে সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট আয়োজিত সভায় বক্তারা - সমকাল
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ মে ২০২৬ | ০৮:২৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
‘তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, যাঁর জীবনে যেন কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। বস্তুগত সম্পদের মোহ তাঁকে কখনও টানেনি। মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসাই ছিল তাঁর জীবনের পরম প্রাপ্তি।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক সদ্যপ্রয়াত অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান স্মরণসভায় এসব কথা বলা হয়। তাঁর ছাত্র-ছাত্রী ও পরিচিতজনরা এতে বক্তব্য দেন। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে এ আয়োজন করে বেসরকারি সংগঠন সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (সেড)। বক্তারা বলেন, সাখাওয়াত আলী খান ছিলেন একজন অভিভাবক। প্রকৃত অর্থে তিনি ছিলেন, লালনকারী, যুক্তিবাদী ও অসাম্প্রদায়িক।
গণমাধ্যম, পরিবেশ ও আদিবাসীবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেড প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৩ সালে। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলীর ছাত্ররাই এটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরু থেকে আমৃত্যু প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ছিলেন সাখাওয়াত আলী খান।
স্মরণসভার শুরুতে সেডের সাধারণ সম্পাদক ও অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের ছাত্র ফিলিপ গাইন বলেন, তিনি এ প্রতিষ্ঠানের মানুষের কাছে ছিলেন ছাতার মতো। প্রতিষ্ঠান নানা সময় নানা সমস্যার মধ্যে পড়েছে। শান্তভাবে, দৃঢ়ভাবে সেসব সামলেছেন সাখাওয়াত স্যার। তিনি সব শিক্ষার্থীর কাছে ছিলেন পিতৃতুল্য, পরম অভিভাবক।
বর্তমানে সমাজে অন্যকে লালন করার প্রবণতা দুর্বল হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করেন অর্থনীতিবিদ ও পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। তিনি বলেন, অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান আমৃত্যু এ কাজই করে গেছেন। তাঁর মতো যাঁরা নেপথ্যে থেকে অন্যকে লালন করেন, তাদের গুরুত্ব অপরিসীম।
হোসেন জিল্লুর রহমান ঘোষণা দেন, পিপিআরসি ও সেড যৌথভাবে অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান স্মরণে প্রতিবছর দুজন তরুণ সাংবাদিককে ফেলোশিপ দেবে। একজন পুরুষ ও একজন নারীকে এই ফেলোশিপ প্রদানের উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য তিনি সেডের প্রতি আহ্বান জানান।
অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের কাছ থেকে ক্ষমতার মোহে না পড়ে গবেষণায় মনোযোগী হওয়ার আদর্শিক দীক্ষা পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আমেনা মোহসীন। তিনি বলেন, আমৃত্যু সততা, স্পষ্টবাদিতা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সত্য বলা এবং প্রশাসনিক পদের চেয়ে মেধার গুরুত্ব বজায় রাখাই অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের দর্শন ছিল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস তাকে একনিষ্ঠ ‘পথপ্রদর্শক’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং বিশ্লেষণ ও সত্য উদ্ঘাটনের মাধ্যম। অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের নিভৃতচারী ও নির্লোভ জীবন এবং পেশাদারিত্বের প্রতি একাগ্রতা বর্তমান প্রজন্মের
জন্য অনুকরণীয়।
স্মরণসভায় অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের মেয়ে ও প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক সুমনা শারমীন বলেন, ‘বাবার প্রয়াণের পর তাঁর ছাত্রছাত্রীদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা দেখে মনে হচ্ছে, তিনি তাঁদের মধ্যেই বেঁচে আছেন। ধীর ও স্থির থেকে নিজেকে জাহির না করার শিক্ষা তাঁর কাছে থেকেই পেয়েছি।’
জীবনসঙ্গীর স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খানের সহধর্মিণী মালেকা খান। স্মরণসভায় তাদের দুই সন্তান, নাতিসহ পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
গত ৯ মার্চ মারা যান অধ্যাপক সাখাওয়াত আলী খান। তিনি ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে-পরে দেশের মূলধারার প্রথম সারির সংবাদপত্রে পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৭২ সালে তিনি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ ৩৫ বছর ৯ মাস ৪ দিন পূর্ণকালীন শিক্ষকতা করে ২০০৮ সালের ৩০ জুন বিভাগের সিলেকশন গ্রেডের অধ্যাপক পদ থেকে অবসর নিলেও বিভাগের শিক্ষকতার দায়িত্ব ও মায়ার বন্ধন থেকে তিনি নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেননি। বিভাগে পাঁচ বছর সুপারনিউমারারি প্রফেসর থাকার পর অনারারি প্রফেস হন।
স্মরণসভার সভাপতিত্ব করেন উন্নয়নকর্মী ও সেডের বর্তমান চেয়ারম্যান খুশী কবির। আরও বক্তব্য দেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস, সাংবাদিক আনিস আলমগীর, দ্য সোয়ালজ ইন্ডিয়া বাংলাদেশের কান্ট্রি রিপ্রেজেনটেটিভ শিউলি হক, সাবরিনা শারমীন প্রমুখ।
- বিষয় :
- স্মরণসভা
