যুবদল নেতা হাফিজুল ছিলেন টার্গেট, ৩ কারণ ঘিরে তদন্ত
ইউসুফ আলী পারভেজ। ছবি: সংগৃহীত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬ | ০০:৫৮
রাজধানীর কাফরুলে যুবদলকর্মী ইউসুফ বেপারীকে গুলি করে হত্যার রহস্যভেদ করতে পারেনি পুলিশ। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউসুফ হত্যাকারীদের টার্গেট ছিলেন না। তারা কাফরুল থানা যুবদলের সদস্য সচিব হাফিজুল ইসলাম বাবুকে গুলি করতে গিয়েছিল। তখন ইউসুফ তাদের ধরার চেষ্টা চালালে তাঁকে গুলি করে পালায় দুর্বৃত্তরা।
অবশ্য পালানোর সময় চঞ্চল মোল্লা নামে একজনকে অস্ত্রসহ আটক করে পুলিশে দেয় জনতা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া অপর তিনজনের নাম জানতে পারে। তারা হলেন– জিহাদ মোল্লা, জিয়ারুল মোল্লা ও মো. হাসান। তাদের ঝিনাইদহ ও আশপাশের এলাকা থেকে ভাড়া করে আনা হয়েছিল বলে জানতে পেরেছে পুলিশ।
এদিকে হামলার উদ্দেশ্য নিশ্চিত না হলেও সম্ভাব্য একাধিক কারণ সামনে আসছে। এর মধ্যে হাফিজুলের কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চাওয়া এবং মিরপুর এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও সম্পত্তি দখল নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীর সঙ্গে বিরোধের বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
গত শুক্রবার রাতের ওই গুলির ঘটনায় একজন নিহত ছাড়াও দুজন আহত হন। তাদের মধ্যে মাথায় গুলিবিদ্ধ সবজি ব্যবসায়ী নালাম সরদারের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আর পথচারী মনির হোসেন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরেছেন। গুলি অন্যত্র লাগার পর বিচ্ছিন্ন অংশ ছিটকে এসে তাঁর শরীরে লাগে। মূলত অস্ত্রধারীরা পালানোর সময় এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়লে তারা আহত হন।
এর আগে শুক্রবার রাত সোয়া ১১টার দিকে রাজধানীর মিরপুর ১৩ নম্বরের সি ব্লকের ১ নম্বর সড়কে ওপেক্স গার্মেন্টের দক্ষিণ পাশের সড়কে গুলির ঘটনা ঘটে।
যুবদল নেতা হাফিজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আমি নেতাকর্মীদের নিয়ে সেখানে বসেছিলাম। অল্প দূরে অন্যদের সঙ্গে আড্ডা দিচ্ছিলেন ইউসুফ। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করেন, আমার সামনে একজন সন্দেহজনকভাবে ঘোরাঘুরি করছেন। আরও দুজন পাশের একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তখন সঙ্গে থাকা সুজনকে বলেন কল করে বিষয়টি আমাকে জানাতে। আমি সুজনের ফোন রিসিভ করলে তিনি বলেন, ‘ভাই আপনার সামনে থাকা লোকটি কে চেনেন? ইউসুফ ভাই বলছেন লোকটা সন্দেহজনক।’ তখন আমি লোকটির মুখোমুখি হলে তিনি পালানোর চেষ্টা করেন। আমার সঙ্গের নেতাকর্মীরা তাকে থামিয়ে পরিচয় জিজ্ঞেস করলে জানান, মিরপুরে থাকেন। এর মধ্যেই তিনি কোমর থেকে আগ্নেয়াস্ত্র বের করতে গেলে ইউসুফসহ অন্যরা তাকে আটকানোর চেষ্টা করেন। এর পর তিনি খুব কাছে থেকে গুলি ছুড়লে ইউসুফের শরীরে লাগে। আরেক দফা গুলি করার চেষ্টা করলে আমার সঙ্গে থাকা মামুন তাকে টুল ছুড়ে মারেন। আত্মরক্ষার্থে আমি বসে পড়ায় লক্ষ্যভ্রষ্ট গুলি পেছনের এক দোকানির শরীরে লাগে। হামলাকারীরা পালানোর জন্য এলোপাতাড়ি গুলি ছোড়ে, তাতে এক পথচারী আহত হন। লোকজন ধাওয়া করে অস্ত্রসহ চঞ্চল মোল্লা নামে একজনকে আটক করে।
হাফিজুল ইসলাম দাবি করেন, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের কোনো বিষয় নেই। তবে তিনি স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে চাচ্ছেন। এটা নিয়ে কিছুটা বিরোধিতা থাকতে পারে। গ্রেপ্তার হওয়া চঞ্চল জানিয়েছেন, ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ এলাকায় তাঁর বাড়ি। ঢাকার মিরপুরের স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা তাকেসহ অন্যদের ভাড়া করে এনেছেন। স্বেচ্ছাসেবক দলের ওই নেতার এক রাজনৈতিক বড় ভাই সাব্বির দেওয়ান জনি কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তিনিও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করবেন। এর থেকে ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচন নিয়ে বিরোধেই হামলার ঘটনা ঘটে। তবে পুলিশের তদন্তে বিস্তারিত বেরিয়ে আসবে।
জানতে চাইলে সাব্বির দেওয়ান জনি বলেন, ২০১৫ সালে দল আমাকে কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করার জন্য মনোনয়ন দিয়েছিল। এবারও যদি দেয় নির্বাচন করব। তবে এর সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের সংশ্লিষ্টতা নেই। এখান থেকে আরও অনেকে নির্বাচন করবেন। হাজি সাইফুদ্দিন, ছাত্রদল নেতা মামুনসহ বেশ কয়েকজনের নাম শোনা যাচ্ছে। তাই বলে কি সবাইকে মেরে ফেলে নির্বাচন করার কথা ভাবে কেউ? এটা অদ্ভুত অভিযোগ!
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোস্তাক সরকার সমকালকে বলেন, কী কারণে গুলির ঘটনা ঘটে তা এখনও নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ঘটনার পরপরই গ্রেপ্তার চঞ্চল প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়া আরও দুজনের অবস্থান শনাক্ত করা হয়েছে। শিগগিরই তাদের গ্রেপ্তার করা হবে।
এদিকে ইউসুফ হত্যায় জড়িত একজনকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) গ্রেপ্তার করেছে। ডিবিপ্রধান অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম সেই তথ্য নিশ্চিত করলেও বিস্তারিত কিছু জানাননি।
কাফরুলে গুলির ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাউন্সিলর পদে নির্বাচন ছাড়াও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দলের অন্য নেতাকর্মীর সঙ্গে হাফিজুলের বিরোধ রয়েছে। বিশেষ করে তাঁর বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থানের পর পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পত্তি দখলের অভিযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জমি নিয়ে বিরোধসহ বড় পর্যায়ের বিভিন্ন বিষয় মীমাংসার মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কথাও বলছেন কেউ কেউ। তবে হাফিজুল জানান, তিনি শুধু সামাজিক বিরোধের বিষয়ই নিষ্পত্তি করেন। জমি বা অন্য কোনো বিষয়ে তিনি হস্তক্ষেপ করেননি। দখলের অভিযোগ পুরো মিথ্যা।
ইউসুফ হত্যায় মামলা
ইউসুফ হত্যার ঘটনায় তাঁর ভাই মাসুদ রানা বাদী হয়ে কাফরুল থানায় মামলা করেছেন। তাতে গ্রেপ্তার চঞ্চল মোল্লা ও তার মাধ্যমে শনাক্ত হওয়া অপর তিনজনসহ অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে।
ইউসুফের আরেক ভাই সুমন বেপারী আজ দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গের সামনে জানান, মিরপুর ১৩ নম্বরের পলাশনগরে মেসে থাকতেন ইউসুফ। তিনি বিয়ে করেননি। মূলত রাজনীতি নিয়েই পড়ে থাকতেন। চার ভাইবোনের মধ্যে ছোট ছিলেন তিনি। তাদের বাড়ি বরিশালের উজিরপুরের সাকরাল গ্রামে। বাবার নাম শাহজাহান বেপারী ও মা মমতাজ বেগম। স্বজনরা আজ ময়নাতদন্ত ও কাফরুলে একটি জানাজার পর ইউসুফের মরদেহ দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান।
সংকটাপন্ন নালাম সরদার
মাথায় গুলিবিদ্ধ নালাম সরদার ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তাঁর ছেলে আব্দুল্লাহ জানান, ঘটনার সময় তাঁর বাবা ও বড় ভাই সজীব সরদার পাশাপাশি ছিলেন। গুলি লাগার পরও তারা প্রথমে বিষয়টি বুঝতে পারেননি। নালামকে হতভম্ব দেখে সজীব জিজ্ঞেস করেন, ‘বাবা কি ভয় পাইছো?’ তার পরই তিনি লক্ষ্য করেন, নালামের মাথা থেকে রক্ত পড়ছে। পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
- বিষয় :
- রাজধানী
- গুলি করে হত্যা
- যুবদল নেতা