পুষ্প
দুষ্প্রাপ্য ইয়েলো ট্রাম্পেট ভাইন
রমনায় সম্প্রতি ফোটা ইয়েলো ট্রাম্পেট লতার ফুল লেখক
মৃত্যুঞ্জয় রায়
প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫১
| প্রিন্ট সংস্করণ
রমনায় একটি, মাত্র একটি গাছই আছে ইয়েলো ট্রাম্পেট ভাইনের। আর কোথাও চোখে পড়েনি। এটি এ দেশে দুষ্প্রাপ্য উদ্ভিদ। গাছটিতে শরতেও ফুল ফুটছে। খিলান বা আর্চের মতো একটি কাঠামোর ওপর রমনা উদ্যানের নার্সারির ভেতরে প্রথমদিকে এ গাছটি রয়েছে।
ব্রিটিশ উদ্ভিদবিজ্ঞানী জন সিমস ১৮২০ সালে কার্টিসের বোটানিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রথম এ উদ্ভিদের প্রজাতিগত নাম ও তার আনুষ্ঠানিক বর্ণনা দেন। তিনি প্রাথমিকভাবে এটিকে বিগনোনিয়া চেম্বারলেইনি (Bignonia chamberlaynii) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেন। পরে ফরাসি উদ্ভিদবিজ্ঞানী এদুয়ার ব্যুরো ও জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী কার্ল মরিটজ শুমান প্রজাতিটিকে অ্যানিমোপেগমা (Anemopaegma) গণে স্থানান্তরিত করেন এবং এর স্বীকৃত আধুনিক প্রজাতিগত দ্বিপদ নাম রাখেন অ্যানিমোপেগমা চেম্বারলেইনি (Anemopaegma chamberlaynii), ইংরেজি নাম রাখা হয় ইয়েলো ট্রাম্পেট ভাইন। গণগত নাম Anemopaegma গ্রিক শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো ‘পবন-খেলুড়ে’ এবং প্রজাতিগত নামের শেষাংশ chamberlaynii রেভারেন্ড অনারেবল জোসেফ চেম্বারলেইনের নামের সম্মানে রাখা হয়েছে। তিনি ছিলেন বার্মিংহামের একজন উল্লেখযোগ্য ইংরেজ অর্কিড চাষি।
ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকের ইংল্যান্ডে প্রথম একে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে কবে কখন এসেছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। উদ্ভিদবিদ্যার বিভিন্ন নথি ও কোনো কোনো লেখকের ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ থেকে জানা যায়, বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগে কোনো একসময় এটি এ দেশে আসে। তবে সে সময় এ উদ্ভিদের তথ্য সেভাবে রাখা হয়নি, নথিভুক্তও করা হয়নি।
ঢাকা শহরে রমনা উদ্যানে রোপিত গাছটির কারণেই সম্ভবত ২০১৪ সালে একে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়। ঔপনিবেশিক আমলে ও তার পরবর্তী সময়ে কয়েকজন উদ্ভিদবিদ ও ধনাঢ্য ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশ থেকে পছন্দের গাছ সংগ্রহ করে পার্কে, বাগানে ও বাড়িতে লাগাতেন।
এর আদি বাসস্থান বা উৎপত্তি দক্ষিণ আমেরিকায়, বিশেষ করে ব্রাজিল, বলিভিয়া ও প্যারাগুয়ে অঞ্চলজুড়ে। বাংলাদেশের আবহাওয়ায় উচ্চ তাপমাত্রা ও অধিক আর্দ্রতা থাকায় ব্রাজিলের এ গাছ বেশ ভালোভাবে টিকে গেছে।
ইয়েলো ট্রাম্পেট ভাইন একটি চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী আরোহী কাষ্ঠল লতা। কাণ্ড অশাখ। লতা পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, লতার গিঁট থেকে সরু ও দীর্ঘ সুতার মতো সবুজ আকর্ষী বের হয়; যা দিয়ে সহায়ককে আঁকড়ে ধরে। পাতাগুলো পক্ষল যৌগিক এবং পাতার সঙ্গে পত্রসদৃশ ছদ্ম-উপপত্র থাকে ও দুটি পত্রক নিয়ে গঠিত। ফুলের গড়ন ফানেল বা চোঙার মতো। এটি বড় ও খেলা মুখের নলাকার ফুল। মুখের কাছে পাপড়ি পাঁচটি খণ্ডে খণ্ডিত ও সাদাটে রঙের, গোড়ার নলাকার অংশটি হলদে, একেবারে বোঁটার কাছে নলাকার অংশটি একটু বাঁকানো গড়নের। আলংকারিক উদ্ভিদ হিসেবে অনেক দেশের বাগানে লাগানো হয়।
দীর্ঘদিন ধরে এ গাছ এ দেশে থাকলেও তা খুব বেশি বিস্তার লাভ করেছে বলে মনে হয় না। অথচ আধা-শক্ত কাঠবিশিষ্ট ও দুই-তিনটি গিঁটযুক্ত কাণ্ডের কাটিং বা কলম করে গ্রীষ্মের শেষ থেকে বর্ষাকালে এর চারা তৈরি করা
যায়। গুটিকলমেও চারা হয়। রোদে লাগানো গাছে বেশি ও ভালো ফুল ফোটে। সুন্দর গড়ন ও বেশি ফুলের জন্য মাঝেমধ্যে গাছ ছাঁটাই করতে হয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ
- বিষয় :
- ফুল