হলি আর্টিসান মামলার রায়
কিশোর তাহরীমের সাক্ষ্যেই সাজা নিশ্চিত হয় জঙ্গিদের
আতাউর রহমান
প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯ | ১৩:৪৫
গুলশানে হলি আর্টিসান বেকারিতে নৃশংস হামলায় যে জঙ্গিদের ফাঁসির রায় হয়েছে,
তারা যে ওই হামলার পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অস্ত্র-গ্রেনেড সরবরাহ ও অর্থের
জোগান দিয়েছে- তা একজন কিশোরের সাক্ষ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। ১৪ বছর বয়সী
তাহরীম কাদেরী নামের ওই সাক্ষীর ভাষ্যে উঠে আসে হামলার আগের বিস্তারিত
বিবরণ। এ ছাড়া ফাঁসির রায় হওয়া আসামিরা যেসব বাড়িতে জঙ্গি আস্তানা তৈরি করে
অবস্থান নিয়েছিল, ওইসব বাড়ির তত্ত্বাবধায়কদের কয়েকজনের সাক্ষ্যেও তাদের
নাম বেরিয়ে আসে। এসব সাক্ষী বিচার চলাকালে আদালতে আসামিদের শনাক্তও করেন।
এর বাইরে পুলিশের তদন্ত আর জঙ্গিদের জবানবন্দিও তাদের সর্বোচ্চ শাস্তির
বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ওই মামলার রায় এবং রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সূত্রে
এসব তথ্য মিলেছে।
গত ২৭ নভেম্বর দেওয়া ওই রায়ে দেখা যায়, রাষ্ট্রপক্ষের ১১৩ জন সাক্ষী আদালতে
সাক্ষ্য দেন। তাদের বেশিরভাগই হামলার পরের নানা ঘটনাক্রমের বিবরণ দিয়েছেন।
কিন্তু একমাত্র তাহরীম কাদেরীর সাক্ষ্যে অন্তত দু'জন জঙ্গির কার্যক্রম উঠে
আসে, যারা নৃশংস ওই হামলার আগের ও পরের পরিকল্পনায় যুক্ত ছিল। শুধু তাই
নয়, নব্য জেএমবির দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের নামও বেরিয়ে আসে ওই কিশোরের ভাষ্যে।
তাহরীমকে মামলার রায়ে আদালত 'তারকা' সাক্ষী হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের এই গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী তাহরীম কাদেরীর পুরো পরিবারটিই সুখের
সংসার ছেড়ে নব্য জেএমবির অনুগত হয়ে ঘর ছেড়েছিল। তার বাবা তানভীর কাদেরী
ওরফে আবদুল করিম বেসরকারি একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা এবং মা আবেদাতুল ফাতেমা
ওরফে আশা একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় চাকরি করত। এই দম্পতি জঙ্গি
সংগঠন নব্য জেএমবিতে অনুগত হয়ে ২০১৬ সালের এপ্রিলে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা
বলে ঘর ছাড়ে। কিশোর দুই যমজ সন্তান তাহরীম কাদেরী ও আফিফ কাদেরীও তাদের
বাবার কাছে 'বায়াত' নিয়ে জঙ্গিবাদের ভয়ংকর পথে পা দেয়। তানভীর কাদেরী নিজের
সঞ্চিত অর্থ সংগঠনটিতে দান করে এবং এর গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়। ২০১৬ সালের
১০ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর আজিমপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানের
মুখে তানভীর কাদেরী আত্মঘাতী হয়ে মারা যায়। আত্মঘাতী হওয়ার চেষ্টা করেও ধরা
পড়ে তাহরীম কাদেরী ও তার মা আবেদাতুল ফাতেমা। পুলিশের অপর এক অভিযানে নিহত
হয় আফিফ কাদেরী। এরপরই পরিবারটির জঙ্গিবাদে জড়ানো থেকে শুরু করে হলি
আর্টিসান হামলার আগে-পরের নানা তথ্য পেতে থাকেন গোয়েন্দারা।
পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, কিশোর
তাহরীম ও তার মা আজিমপুরের ওই ঘটনায় দায়ের মামলার আসামি। তবে তারা তাদের
ভুল বুঝতে পেরে জঙ্গিবাদের অন্ধকার পথ থেকে আলোর পথে ফিরেছে।
সংশ্নিষ্ট মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম ছারোয়ার খান (জাকির) সমকালকে
বলেন, মামলার অভিযোগ প্রমাণে তাহরীম কাদেরী তাদের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী
ছিল। তার সাক্ষ্যে কয়েক জঙ্গির সর্বোচ্চ সাজা নিশ্চিত হয়েছে। এ ছাড়া ওই
কিশোরের ভাষ্যে হামলার আগে ও পরে নব্য জেএমবির কার্যক্রমের গোপন সব তথ্য
বেরিয়ে আসে।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও মামলাটির তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, হলি
আর্টিসানে যারা সরাসরি হামলায় অংশ নিয়েছিল, তারা ঘটনাস্থলে কমান্ডো অভিযানে
নিহত হয়। কিন্তু সেই হামলার মাস্টারমাইন্ড, পরিকল্পনা, অস্ত্র ও অর্থের
জোগানদাতাদের খুঁজেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। যে আট জঙ্গির বিরুদ্ধে আদালতে
চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল, তাদের জঙ্গি কর্মকাণ্ডের বিষয়টি তদন্তে উঠে আসে।
এরা যে হলি আর্টিসান হামলায় নানাভাবে জড়িত ছিল, তা প্রমাণিত হয় তাহরীম
কাদেরীর সাক্ষ্যে। কারণ ওই কিশোরের বাবা-মা একই জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত থাকায়
সে আগে থেকেই এদেরকে চিনত। তার বাসাতেই হামলার পরিকল্পনা, হামলাকারীদের
অবস্থান এবং ওই বাসা থেকেই যে হামলাকারীরা বেরিয়ে আসে, তা আদালতে ওই
কিশোরের সাক্ষ্যে প্রমাণিত হয়।
গত ২৭ নভেম্বরের রায়ে আদালত সাত জঙ্গি- জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী,
আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ ওরফে র্যাশ, আব্দুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ,
রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান ওরফে সাগর, শরিফুল ইসলাম খালেদ ও
মামুনুর রশিদ রিপনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন।
হলি আর্টিসান বেকারিতে হামলা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ৬৯ নম্বর সাক্ষী তাহরীর
কাদেরী আদালতে দেওয়া তার জবানবন্দি ও সাক্ষ্যে বলে, 'সে মাইলস্টোন স্কুলে
অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছে। বাবা-মাকে জিজ্ঞেস করি 'হিজরত' করব কিনা?
প্রথমে না করলেও পরে মা রাজি হন। একদিন বাবা তাকে ও তার ভাইকে জিজ্ঞেস করে-
এমন জায়গায় যাব কিনা, যেখানে থাকা-খাওয়ার কষ্ট হতে পারে, স্কুল ও খেলার
মাঠ নাও থাকতে পারে। পরে তাদের দুই ভাইকে বায়াত করার জন্য বাবা তাদের
নির্দেশ দেন। এরপর দাদা, দাদি ও স্বজনদের মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে
তারা হিজরতে চলে যায়। শুরুতে তারা পল্লবীতে একটি বাসায় থাকে। পরে র্যাশ
আঙ্কেল (আসলাম হোসেন ওরফে রাশেদ) ও চকলেট আঙ্কেলের (অভিযানে নিহত
বাশারুজ্জামান চকলেট) নির্দেশে তারা বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায় যায়।
কয়েকদিন পর ওই বাসায় চকলেট আঙ্কেল প্রথমে দু'জন ও পরে তিনজনকে নিয়ে আসে।
তাদের সাংগঠনিক নাম সাদ, মামুন, শুভ, ওমর ও আরিফ। এর কয়েকদিন পর চকলেট
আঙ্কেল তামিম আঙ্কেল, মারজান আঙ্কেল ও রাজীব গান্ধীকে (জাহাঙ্গীর হোসেন
ওরফে রাজীব গান্ধী রায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, অপর দু'জন তামিম চৌধুরী ও নুরুল
ইসলাম মারজান পুলিশের অভিযানে নিহত) নিয়ে আসে। ওই বাসায় সাতজন একটি কক্ষে
থাকত। সেখানে তার যাওয়া নিষিদ্ধ ছিল।'
তাহরীম তার সাক্ষ্যে আরও বলে 'একদিন চকলেট আঙ্কেল তাদের বাসায় পাঁচটি ব্যাগ
নিয়ে আসে। এরপর প্রথমে দু'জন ও পরে সবাই রেকি করতে যায়। তামিম আঙ্কেল
সাদ-মামুনদের জন্য চকলেটকে পাঁচসেট পোশাক কিনতে বলে। একদিন ইফতারের সময় বড়
রুমটিতে ইফতার দিতে গিয়ে সে দেখে, ওমর বা আরিফ সিরিজ কাগজ দিয়ে চাপাতি ধার
দিচ্ছে। পরে তারা জানায়, অপারেশনের জন্য ধার দিচ্ছে। এর কয়েকদিন পর প্রথমে
তিনজন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর আরও দু'জন
কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বের হয়। যাওয়ার সময় তারা বলে জান্নাতে গিয়ে দেখা হবে।
নির্দেশ মতো তারাও বাসাটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। যাওয়ার সময়ে তামিম আঙ্কেল
বাবাকে বলে- বড় অপারেশন হবে, দোয়া করবেন। রাতে বাবা অনলাইনের খবরে দেখে হলি
আর্টিসানে গোলাগুলি হচ্ছে। পরের দিন সকালে তারা দেখল, যারা অপারেশনে গেছে
তারা মৃত। এরপর র্যাশ আঙ্কেলের কথায় তারা আবারও বাসা বদল করে।'
ওই মামলাটির তদন্ত-সংশ্নিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, তাহরীম কাদেরীর ভাষ্যে
সাদ, মামুন, শুভ, ওমর ও আরিফ নামের যে পাঁচজনের নাম এসেছে, তারা হলি
আর্টিসানে সরাসরি হামলায় যুক্ত নিবরাস, রোহান ইমতিয়াজ, খাইরুল ইসলাম, শফিউল
ইসলাম ও সামীহ মুবাশ্বের। ওই নামগুলো ছদ্ম নাম ছিল। আসামিদের জবানবন্দিতে
উঠে এসেছে ব্যাগগুলোতে করে তারা অস্ত্র নিয়ে এসেছিল।
আদালত ও তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র বলছে, মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি রাকিবুল হাসান
রিগ্যান, হাদিসুর রহমান সাগর, আব্দুস সবুর খান, রাজীব গান্ধী এবং আসলাম
হোসেন র্যাশ আদালতে তাদের দোষ স্বীকার করে। রাষ্ট্রপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে
অভিযোগ প্রমাণ করতে পারায় প্রত্যেকের সর্বোচ্চ দণ্ডের রায় হয়েছে।
- বিষয় :
- হলি আর্টিসান মামলার রায়
