বন্ধু, সহকর্মী ও সহমর্মী গোলাম সারওয়ার
গোলাম সারওয়ার
আবেদ খান
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২০ | ০৪:৩০
গোলাম সারওয়ার, আমি আর আমাদের আরেক বন্ধু হাসান শাহরিয়ার। ইত্তেফাকে এই তিনজন সমবয়সী এবং অভিন্ন হৃদয় বলে অনেকে মনে করতেন। আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হচ্ছে, গোলাম সারওয়ারের জন্ম তারিখটি এপ্রিল মাসের ১ তারিখ। মাঝখানে আমার জন্মতারিখটি হলো এপ্রিল মাসের ১৬ তারিখ। আমাদের বন্ধু হাসান শাহরিয়ারের জন্মদিন হলো এপ্রিল মাসের ২৫ তারিখ। এ নিয়ে আমাদের মধ্যে প্রায়শই কথা হতো। আমাদের মধ্যে গোলাম সারওয়ারের বয়স একটু বেশিই ছিল। বছর দুয়েকের মতো। কিন্তু বয়সের এই সামান্য ব্যবধান আমাদের মধ্যে কখনোই হিসাবের মধ্যে থাকেনি।
এপ্রিল মাসের প্রথম দিনটি আসার আগে গোলাম সারওয়ার অবধারিতভাবে আমার কাছ থেকে একটি টেলিফোন পেতেন। জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে। অবশ্য পরের দিকে রেওয়াজটি আমি ধার করেছি বর্তমানে সমকালের নগর সম্পাদক আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন শাহেদ চৌধুরীর কাছ থেকে। শাহেদ চৌধুরী তার পরিচিত বা ঘনিষ্ঠ প্রত্যেকের জন্মদিন মনে রাখেন এবং সময়মতো টেলিফোন করেন। গোলাম সারওয়ারও আমার জন্মদিনে অন্তত টেলিফোনে শুভেচ্ছা জানাতে ভুলতেন না।
এ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো আমি গোলাম সারওয়ারকে টেলিফোনে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে পারছি না। আমার জন্মদিনেও তার শুভেচ্ছা আসছে না। ২০১৮ সালের আগস্টে তিনি আমাদের ছেড়ে অনন্তের পানে চলে গেছেন।
গোলাম সারওয়ারের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব যতখানি না সহকর্মীসুলভ, তার থেকে বেশি ছিল সহমর্মী হিসেবে। চিন্তাভাবনার দিক থেকে আমাদের অনেকখানি নৈকট্য ছিল। বিশ্বাসের ক্ষেত্রেও তাই। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি। গোলাম সারওয়ার তার নিজস্ব অঙ্গনে। আমি আমার ভিন্ন পরিমণ্ডলে। একই সঙ্গে আমরা বিশ্বাস করেছি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকায়। পঁচাত্তর-পরবর্তী দুঃসময়ের কালে দৈনিক ইত্তেফাকের সমস্ত বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে আমরা চেষ্টা করি বঙ্গবন্ধুকে যথাযোগ্য মর্যাদায় তুলে ধরতে। সবসময় সর্বাংশে পারিনি। সেই ব্যর্থতাটুকুও আমরা সবাই ভাগ করে নিয়েছি। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম- বঙ্গবন্ধু তার নিজস্ব শক্তিতেই আবার সমহিমায় আবির্ভূত হবেন। আমরা একান্ত আলোচনায় এই বিষয়টি বারবার তুলে ধরতাম। আমাদের অনুমান যে অসার ছিল না, আজ প্রমাণিত।
গোলাম সারওয়ারের আজ জন্মদিন। কী আশ্চর্যজনকভাবে আমি অনুমান করব যে, গোলাম সারওয়ার একটি মঞ্চে উপবিষ্ট থাকবেন। চারদিকে পুষ্পের সমারোহ থাকবে। গোলাম সারওয়ার বিভিন্ন অভ্যাগতকে সম্ভাষণ জানাবেন। অত্যন্ত শিশুসুলভ হাসি দিয়ে সবাইকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করবেন। এই গোলাম সারওয়ারকে আমি এখনও মিস করি। যতদিন বেঁচে থাকব, করেই যাব।
সারওয়ার অসাধারণ মেধাবী একজন সাংবাদিক ছিলেন। উন্নত মাত্রার, উন্নত মননের সাংবাদিক ছিলেন। ভাষায় যে অনবদ্য দখল, অনুভূতি প্রকাশের যে অসাধারণ দক্ষতা, বাক্যকে কাব্যময় করার যে চমৎকারিত্ব গোলাম সারওয়ারের ছিল, সেটা আমাদের সংবাদপত্র-বলয় থেকে ক্রমান্বয়ে অপসৃত হচ্ছে। শব্দ সাজানোর ভেতর দিয়ে স্বল্প পরিসরে মূল কথাটি বের করে নিয়ে আসার কৃতিত্ব যে গোলাম সারওয়ারের কতখানি ছিল- আমরা যারা তাকে কাছাকাছি থেকে দেখেছি, তারা খুব ভালোভাবে বলতে পারব।
সারওয়ার আপাদমস্তক পরিশ্রমী সাংবাদিক ছিলেন। সংবাদ সংগ্রহের চাইতে সংবাদ পরিবেশনায় তার দক্ষতা ছিল অনবদ্য। সংবাদ বিশ্নেষণের ক্ষেত্রে, মান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, সংবাদের অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে এত অতুলনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষমতা আমি কম সাংবাদিকের মধ্যেই দেখেছি।
সাংবাদিকতার জীবনে আমার অনেক বার্তা সম্পাদকের সঙ্গেই কাজ করার সুযোগ হয়েছে। আমি সিরাজুদ্দীন হোসেনকে দেখেছি, মোসলেম আলী বিশ্বাসকে দেখেছি। বার্তা সম্পাদক হিসেবে তোয়াব খানের সৃজনশীলতা আমি দেখেছি। এর বাইরে আরেকজন ভালো বার্তা সম্পাদক ছিলেন এবিএম মূসা। যদিও তার সঙ্গে কাজ করা হয়নি। আসাফউদ্দৌলা রেজা ছিলেন বার্তা সম্পাদক হিসেবে সিরাজুদ্দীন হোসেনের উত্তরসূরি। তার সঙ্গেও কাজ করেছি। আমি তুলনা করতে চাই না; কিন্তু বার্তা সম্পাদক হিসেবে আমার কাছে গোলাম সারওয়ার অনেকখানি এগিয়ে। যাদের কথা বললাম, তারা স্ব-স্ব ক্ষেত্রেই অতুলনীয় ব্যক্তিত্ব। যেমন এখনও তোয়াব খানের মতো ব্যক্তি আমাদের সামনে মশাল হিসেবে উপস্থিত আছেন। কিন্তু বার্তা সম্পাদক হিসেবে গোলাম সারওয়ার আমার কাছে সবচেয়ে সফল। আমাদের দুর্ভাগ্য, গোলাম সারওয়ার তার সমস্ত মেধা নিয়ে, সৃজনশীলতা নিয়ে একটু আগেই যেন আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা খুব স্পষ্টভাবে বলতে পারি- সংবাদপত্র জগৎ গোলাম সারওয়ারের মতো অসাধারণ মেধাবী বার্তা সম্পাদকের অভাব আরও দীর্ঘকাল বোধ করবে। আমি কথাটি খুব স্পষ্টভাবে বলছি এই কারণে- ইত্তেফাক-পরবর্তী জীবনে গোলাম সারওয়ার একাধিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হয়েছেন। সফল নেতৃত্বও দিয়েছেন। কিন্তু বার্তা সম্পাদক গোলাম সারওয়ার সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের চেয়ে বেশি সফল। অন্যান্য দিক যদি বাদও রাখি; এত পরিশ্রমী সাংবাদিক বাংলাদেশে আর কখনও আসবে বলে মনে হয় না।
একবার আক্ষেপ করে গোলাম সারওয়ারকে বলেছিলাম- আমাদের সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠান বোধহয় আর অক্ষত রইল না। একজন সাংবাদিকের মূল গর্ব তার সম্পাদকের ভূমিকা। সম্পাদকীয় নীতিমালা, সম্পাদকীয় বৈশিষ্ট্য, সম্পাদকীয় দৃঢ়তা ও ঋজুতাই একজন সম্পাদককে অন্য অনেকের থেকে আলাদা করে দেয়। আমি তাকে বলেছিলাম- আজকে নতুন করপোরেট জগৎ সংবাদপত্র বা মিডিয়াকে এমনভাবে গ্রাস করেছে যে, সম্পাদকীয় প্রতিষ্ঠানের ঋজুতা খর্ব হচ্ছে। সম্পাদকের বদলে এখন থাকেন সিইও, সাংবাদিকের বদলে সংবাদকর্মী। সংবাদও ক্রমান্বয়ে যেন এজেন্ডার মুঠোর মধ্যে চলে যাচ্ছে। গোলাম সারওয়ার আমার সঙ্গে একমত হয়েছিলেন।
স্বাধীনতার পর আমি, গোলাম সারওয়ার, আমরা যেভাবে চেয়েছিলাম, বাংলাদেশের সংবাদপত্র সেভাবে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। আমরা চেয়েছিলাম, সংবাদপত্র হবে সাংবাদিকদের। সেটা হয়নি নানা কারণে। এই অপূর্ণ চাওয়া নিয়েই প্রস্থান ঘটেছে আমার বন্ধু গোলাম সারওয়ারের। আমি নিঃসঙ্গ শেরপার মতো হিমালয়ের শৃঙ্গে ওঠার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব একটা যে আশাপ্রদ, তাও মনে হয় না। এর মধ্যেও গোলাম সারওয়ার মাঝেমধ্যেই অন্তরীক্ষ থেকে অভয় দিয়ে তার প্রিয় রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলেন- 'উদয়ের পথে শুনি কার বাণী,/ভয় নাই, ওরে ভয় নাই-/ নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান/ ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।'
বন্ধু, সহযোদ্ধা, সহকর্মী, সহমর্মী গোলাম সারওয়ার চিরঞ্জীব হোন।
আবেদ খান: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট
- বিষয় :
- গোলাম সারওয়ার
