করোনাভাইরাসের ওষুধ নিয়ে বিভ্রান্তি
ড. মো. আব্দুল মুহিত
ড. মো. আব্দুল মুহিত
প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ০৪:৪২ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০২০ | ০৬:০৪
এ মুহূর্তে সারাবিশ্ব একযোগে নভেল করোনাভাইরাস মোকাবিলার যুদ্ধে শামিল। গত ডিসেম্বরে চীনের উহান থেকে এর উৎপত্তি হয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে এ ভাইরাস। এখনও বিজ্ঞানীরা এ ভাইরাসের কার্যকর কোনো ওষুধ আবিস্কার করতে পারেননি। তবে বিজ্ঞানীরা থেমে নেই। তারা নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন ওষুধ আবিস্কারের জন্য। অথচ আমাদের দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে নানান মিডিয়াতেও এ রোগের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ আবিস্কার ও ব্যবহার নিয়ে ভ্রান্ত কিছু ধারণা রয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে অনেকে নিজেরাই প্রেসক্রিপশন, ওষুধ স্টক করা এমনকি ব্যবহারও শুরু করেছে। এতে করোনা আতঙ্কের চেয়েও ভুল বা অপতথ্যের ওপর নির্ভর করে জনস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়তে পারে।
কয়েক দিন আগে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা হিসেবে ইথানল বাষ্প আকারে নেওয়ার প্রস্তাব করেছেন বাংলাদেশের একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। সাধারণত ইথানল বাষ্প মানুষে ব্যবহার করা হয় পালমোনারি ইডিমাতে; একটি যন্ত্রের মাধ্যমে সরাসরি চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে যেখানে ইথানলের ঘনত্ব পরিমাপ করা সম্ভব। করোনাভাইরাসে এটি ব্যবহার করা যাবে কিনা, তা এখনও গবেষণা করা হয়নি। তিনি এ বিষয়ে গবেষণা করার অভিপ্রায় হয়তো প্রকাশ করেছেন। এমনকি বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে খবরটি এমনভাবে সম্প্রচারিত হয়েছে যে, ইথানল বাষ্প গ্রহণ করলে করোনা থেকে মুক্তি মিলতে পারে। ফলে অনেকেই ইথানল বাষ্প নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করছেন বা করতে পারেন। অথচ ইথানল বাষ্প গ্রহণ করা হলে নানান পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে। মানবদেহে ৩০-৪০ শতাংশ ইথানল মুখের মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়। এর চেয়ে বেশি পরিমাণে যদি গ্রহণ করি, তাহলে শরীরে বমির উদ্রেক হবে। অর্থাৎ শরীর সাধারণ প্রতিক্রিয়ায় আপনাকে ইথানল গ্রহণ করা থেকে বিরত রাখে। ইথানল বাষ্প নেওয়ার ফলে বেশি ঘনত্বের ইথানল শ্বাসতন্ত্রে পৌঁছে গেলে আপনার বমির উদ্রেক হবে না। ফলে শ্বাসতন্ত্র থেকে এটি আপনার মগজের শ্বাসতন্ত্র নিয়ন্ত্রণকারী স্থানে গিয়ে তাকে অবশ করে দিতে পারে। আপনার তাৎক্ষণিক মৃত্যুও হতে পারে। ইথানল বাষ্প ব্যবহারের ফলে নাকের মিউকাস মেমব্রেনের মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। ইরানে বহু মানুষ মারা গেছে এই ইথানল ব্যবহারের কারণে। অতএব এখনই বিভিন্ন মিডিয়াতে সম্প্রচারিত সংবাদটি তুলে নিয়ে সাধারণ মানুষকে এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবহিত করা উচিত।
করোনাভাইরাসের ওষুধ হিসেবে জাপানি কোম্পানির প্রস্তাবিত ফ্যাবিপাইরাভির বা অ্যাভিগ্যান ওষুধটির ইতালিতে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল (ফেজ ৩) চলছে। ১০০ রোগীর ওপরে এই ওষুধ প্রয়োগ করে দেখা হবে এর কার্যকারিতা আছে, কি নেই। প্রাপ্ত তথ্য বিশ্নেষণ করার পরেই ওষুধটি জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী হবে। উক্ত ওষুধটি সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জার ওষুধ হিসেবে ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এ রকম ফেজ ৩-এ অনেক ওষুধের কার্যকারিতা দেখা হচ্ছে। তার সবই এই স্বল্প পরিসরে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। তবে প্রাথমিক স্তরে ফ্যাবিপাইরাভির বা অ্যাভিগ্যান ওষুধটি অল্প লক্ষণজনিত করোনা রোগীদের ক্ষেত্রে ব্যবহারে আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। তাই বাংলাদেশের দুটি ওষুধ কোম্পানি ওষুধটি তৈরি করেছে। কিন্তু অনেকেই সংবাদটি পেয়ে স্বউদ্যোগী হয়ে ওষুধটির ব্যবহার শুরু করতে পারে। এ বিষয়ে এখনই সচেতন হতে হবে।
অন্যদিকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক টুইট বার্তা দিয়ে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন নামক একটি ওষুধ ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছিলেন। আবার চীন ও ফ্রান্সের কিছু বিজ্ঞানী হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ও অ্যাজিথ্রোমাইসিন অ্যান্টিবায়োটিক যৌথভাবে ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। একটি গবেষণায় চীনে ৬২ নন স্বল্প আক্রান্ত করোনা রোগীদের ক্ষেত্রে এ ওষুধ ব্যবহারে সুফল পাওয়া গেছে। তবে তাদের গবেষণাতেও অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। তাই এখন পর্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য কোনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালেই এ ওষুধটির কার্যকারিতা সম্পূর্ণরূপে প্রমাণিত হয়নি। কিছু ট্রায়াল এখনও চলছে। এপ্রিলের ২ তারিখে আমেরিকায় ৫১০ জন রোগীর ওপর একটি ট্রায়াল শুরু হয়েছে মাত্র। কোনো ওষুধের ট্রায়াল শেষ হওয়ার আগেই তা ব্যবহার নিরাপদ নয়। এটি ম্যালেরিয়া রোগীদের ওষুধ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবুজ চা, আদা-লেবু চা, যষ্টিমধুর রস, ভিটামিন ডি ও সি, কালোজিরার তেল, মধু, কালোমেঘ, নিশিন্দা, থানকুনি পাতার রস ইত্যাদি জাতীয় হোম রেমেডি করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সরাসরি কাজ করে- গবেষণাগারে এমন শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এদেরকে এখনও প্রি-ক্লিনিক্যাল স্তর পার হতে দেখা যায়নি। এরা শুধু আপনার ইমিউনিটিকে শক্তিশালী করতে পারে। ধারণা করা হয়, ইমিউনিটি দুর্বল ব্যক্তিদের করোনাভাইরাস সহজে আক্রমণ করতে পারে। তবে ভেষজ কোনো উদ্ভিদের মিশ্রণ নিজে নিজে ব্যবহার করা যাবে না। কোনো প্রকার ভেষজ উদ্ভিদকে সরাসরি ওষুধ হিসেবে ব্যবহারের কোনো নির্দেশনা এখনও আসেনি। তবে চীনে ভেষজ উদ্ভিদের ব্যবহার নিয়ে নানান রকম ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চলছে। এদের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার আগে কোনোভাবেই ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ছাড়া ভেষজ উদ্ভিদেও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
অন্যদিকে এ বিষয়ে হোমিওপ্যাথি মেডিসিন নিয়ে কোনো গবেষণা হয়নি। অথচ অনেক জায়গায় শুনতে পাওয়া যায়, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় করোনা রোগ সেরে যায়, যা সম্পূর্ণ বানোয়াট। বিসিজি ভ্যাকসিন নিয়েও একটি প্রচারণা রয়েছে। যেসব দেশে বিসিজি ভ্যাকসিন দেওয়া হয়, সেখানে করোনাভাইরাস সেভাবে মারাত্মক আক্রমণ করেনি। অথচ এটা নিয়ে এখনও এমন কোনো সুখবর পাওয়া যায়নি। বিসিজি ভ্যাকসিন দেওয়া দেশেও এটি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। তাপমাত্রা বেশি বা কমের সঙ্গে এ ভাইরাসের কোনো সম্পর্ক নেই। অথচ তা নিয়েও অনেক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত।
ফ্যাবিপাইরাভির বা অ্যাভিগ্যান এবং হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধ দুটি আমাদের দেশে ব্যবহারের জন্য ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মাধ্যমে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ব্যবস্থা করা উচিত। যেহেতু অন্যদেশে এ ওষুধটি ব্যবহৃত হয়েছে; আমাদের দেশে আক্রান্ত রোগীদের ওপর ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে একটি ট্রায়াল কমিটি গঠন করা উচিত। যে কমিটিতে চিকিৎসকদের পাশাপাশি ওষুধ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ, ফার্মাসিস্ট, টেকনিশিয়ান, পরিসংখ্যানবিদ, নাগরিক কমিটির প্রতিনিধি, আইনজীবী, অভিভাবক ফোরামের সদস্য প্রমুখকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি কোনো একটি হাসপাতালে করা যেতে পারে। এ ছাড়া এই ট্রায়ালটি যথাযথ রেজিস্টারে অন্তর্ভুক্ত করে পরিচালনা করা উচিত। শুধু তাই নয়; মহামারিতে আক্রান্ত রোগীদের ওপর অন্যান্য ওষুধের ট্রায়াল পরিচালনার ক্ষেত্রেও এ কমিটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার আগে কোম্পানি দুটিকে কভিড-১৯ রোগের ওষুধ হিসেবে বিপণন করা থেকে বিরত রাখতে হবে।
সম্মানিত পাঠকদের জ্ঞাতার্থে বলছি, এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ওষুধ আমেরিকার এফডিএ কর্তৃক অনুমোদন করা হয়নি। তাই করোনাভাইরাসের ওষুধ হিসেবে ফেসবুক বা সামাজিকমাধ্যমে পড়ে বা শুনে বা ভিডিও দেখে নিজে নিজে কোনো ওষুধ গ্রহণ করবেন না। চিকিৎসকের সরাসরি পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ করে বিপদে পড়তে পারেন। এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিরেকে হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন ওষুধটি খেলে হৃদরোগীদের অবস্থার অবনতি হয়ে মারা যেতে পারে। মারাত্মকভাবে রক্তে সুগারের মাত্রা কমে যেতে পারে। অর্থাৎ ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। যকৃতে ক্ষতিগ্রস্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এ ওষুধটি খেলে যকৃত পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া ফ্যাবিপাইরাভির বা অ্যাভিগ্যান ওষুধটিও গর্ভবতী মহিলা ও শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ছাড়া বয়স্কদের ক্ষেত্রে বন্ধ্যত্বজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে। এখন পর্যন্ত সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে রোগটির বিস্তার রোধ করাই একমাত্র কার্যকর উপায়। জনসমাগম এড়িয়ে চলুন। বাইরে বের হলে অবশ্যই মুখে মাস্ক পরুন। সাধারণ রেস্পিরেটরি হাইজিন মেনে চলুন। নূ্যনতম তিন হাত দূরত্ব বজায় রেখে চলাফেরা করুন। অতি প্রয়োজন না হলে বাসার বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন। বাসায় থাকুন, নিরাপদ থাকুন।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ক্লিনিক্যাল ফার্মাসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
