প্রাথমিক ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য পরিষেবায় গুরুত্ব দিন
মোহাম্মাদ আনিসুর রহমান
প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২০ | ০৬:১৫ | আপডেট: ২৩ এপ্রিল ২০২০ | ২২:৫২
লেখাটি যখন লিখছি, তখন বাংলাদেশে করোনা রোগী দিন দিন ধীরগতিতে বাড়ছে। মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠাও বাড়ছে। বৈশ্বিক মহামারি, মহাদুর্যোগ কিংবা মহান আল্লাহর গজব যে-নামেই করোনাকে ডাকি না কেন; অন্তত এ কথা সত্য যে, পৃথিবীর মানুষ এমন ক্রান্তিকাল তাদের জীবদ্দশায় আর দ্বিতীয়বার দেখেনি। সত্যিই পৃথিবী আবার আগের মতো হবে কিনা বা হলেও কবে হবে তা নিয়ে মানুষের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের শেষ নেই। এই মহামারি দুর্যোগের মধ্যেও ত্রাণের চাল নিয়ে নয়ছয়, সরকারি ত্রাণের বস্তায় নিজের ছবি ছাপিয়ে দিয়ে বাহবা নেওয়ার কী অকৃত্রিম অথচ নিষ্ঠুর জনপ্রিয়তা আদায় করার অমানবিক প্রচেষ্টা কিছু কিছু মানুষের মধ্যে স্পষ্টত দৃশ্যমান। সত্যিই কি মানুষের নিষ্ঠুরতা এখনও কমবে না? মানুষের মনুষ্যত্ববোধহীনতার চর্চা কি চলতেই থাকবে?
দুই. সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হওয়ায় বারবার চোখের সামনে 'দিন আনে দিন খায়' এমন খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনের দৃশ্যপট চোখে ভাসছে। রিকশা-ভ্যানচালক, অন্যের বাড়িতে কাজ করে খাওয়া গৃহপরিচারক-পরিচারিকা, শ্রমিক, মজুর, দরিদ্র ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, সমুদ্রতীরবর্তী জনগোষ্ঠী, আদিবাসী, উপজাতি, চা শ্রমিক, হতদরিদ্র কৃষক প্রভৃতি নানা শ্রেণি পেশার অসহায় মানুষ খাদ্য ও স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছেন। যাদের চোখে অন্ধকার ছাড়া আর কিছু দেখতে পাওয়ার কথা নয়। সর্বশেষ পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের সঙ্গে 'মজুরি-দাসত্ব' নিয়ে মালিকদের শোষণ ও নিপীড়ন কার্ল মার্কসের তত্ত্বকে আবার মনে করিয়ে দিয়েছে। বেশকিছু মালিকের কর্মকাণ্ড সত্যিই অবাক করেছে এবং স্পষ্টত প্রতীয়মান হয়েছে অনেকের বিবেকবোধ বলতে কিছু নেই। বেতন দেবে বলে বাড়ি থেকে হাঁটিয়ে ডেকে এনে ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকায় বন্দিদশার মধ্যে ফেলে দেওয়ার যে অমানবিক নাটক মঞ্চস্থ হলো, সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা না করলে তা বোধ হয় হতো না। দরিদ্রতা আর শ্রমিকের ঘামের সঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের ছলনা-প্রবঞ্চনা করা মোটেও ঠিক হয়নি। বরং এতে তাদের করোনার চেয়ে ভয়ংকর রূপ প্রকাশ পেয়েছে। 'মজুরি-দাসত্ব' কমানোর জন্য বেতন বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ সরকার নিলেও কতটা তা কার্যকর করা হয়েছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। পোশাক শ্রমিককে 'মজুরি-দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে মানুষ হিসেবে গণ্য করার সংস্কৃতি' চালু না হলে 'মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও উন্নয়নের বাংলাদেশ' সব অর্জন বৃথা হয়ে যাবে।
তিন. মানবতার এই ক্রান্তিকালে চিকিৎসক, নার্স, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা যেভাবে আর্তমানবতার সেবায় নিজেদের অকাতরে বিলিয়ে দিচ্ছেন, তার সব কিছুর প্রতিদান সরকার স্বাস্থ্যবীমাসহ আর যা দিক না কেন স্বয়ং আল্লাহ দেবেন তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি। তবে, অনেক অঞ্চল থেকে খবর পাওয়া গেছে কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্স হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোতে করোনা রোগী সন্দেহে সাধারণ রোগীদের সেবা দিচ্ছেন না। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্সদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য সরকার ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে সরাসরি জড়িত জনবলই শুধু 'পার্সোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট' (পিপিই)ও অন্যান্য নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার করতে পারবেন। এমনকি প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি যারা মাঠপর্যায়ে রয়েছেন তাদেরও প্রয়োজন না থাকলে পিপিই পরিধান করা নিষেধ। কাজেই চিকিৎসক ও নার্সদের মানবতার এই দুঃসময়ে রোগীদের পাশে দেবদূত হয়ে দাঁড়াতে হবে।
চার. করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ সারা বিশ্বে যেভাবে ছড়িয়েছে এবং তার মরণ কামড় দিয়েছে, তাতে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ মরছে। যাদের অনেকের শরীরে করোনা সেভাবে প্রকাশও পাচ্ছে না। ভাইরাসটি যখন চীনে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল, তখনও পৃথিবীর অনেক দেশ সচেতন হয়নি। চীনের স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা বা কাঠামো কাছ থেকে যা দেখেছি, তাতে অন্ততএতটুকু বুঝেছি যে, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ না করতে পারায় চীনের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তাতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের ক্ষয়ক্ষতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। এ পর্যন্ত মোট বিশবার করোনাভাইরাসটি তার রূপ পরিবর্তন করার কারণে 'গরমে সংক্রমণ কম হয়', কিংবা 'গ্রীষ্ফ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে করোনা ছড়ায় কম'-এ জাতীয় ধারণা মিথ্যা প্রতিপন্ন হয়েছে। কাজেই বিষয়টি নিয়ে ভাবার পাশাপাশি প্রতিকার ও প্রতিরোধের ব্যাপারে গুরুত্ব দিতে হবে। কেননা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও কমিউনিটিভিত্তিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও সতর্কতা করোনা সংক্রমণ ও বিস্তারের ঝুঁকি বাহ্যত কমিয়ে আনতে পারে। সময় এখন প্রাথমিক ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য পরিষেবা খাতকে যে কোনো দুর্যোগকালীন সময়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সচল ও সক্রিয় করা। কেননা এটি প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবাকে মজবুত করার পাশাপাশি জাতীয় স্বাস্থ্য খাতকে টেকসই করে। সময় এখন স্বাস্থ্য খাতের সব শাখা-উপশাখাগুলোকে সচল ও সক্রিয় করার মাধ্যমে কিছু সমাজতাত্ত্বিক সুপারিশ বাস্তবায়ন করা। যেমন (১) ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সুরক্ষার ব্যাপারে অধিক সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন করা। (২) পুরো দেশকে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চলে বিভক্ত করে আঞ্চলিক পর্যায়ে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র স্থাপন করা। (৩) কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সব স্বাস্থ্যকর্মীকে সতর্কতার সঙ্গে স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যবস্থা গ্রামীণ ও শহর পর্যায়ে সচল রাখা। (৪) কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোতে মোবাইল হেল্প লাইন চালু করা। (৫) সার্বক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস সচল রাখা। (৬) আঞ্চলিক কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে জেলা পর্যায়ের সরকারি হাসপাতাল এবং ক্ষেত্র বিশেষে নিকটবর্তী মেডিকেল কলেজের সঙ্গে সমন্বিত উপায়ে নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থা সচল রাখা। (৭) অতিদ্রুত প্রত্যেক এলাকার ইমাম, পুরোহিত, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, স্থানীয় সরকারের চেয়ারম্যান-সদস্য, এলাকার সম্মানী ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে স্থানীয় কমিটি তৈরি করা, যারা করোনা মোকাবিলায় সার্বিক যোগাযোগ; সুষ্ঠুভাবে ত্রাণ বিতরণ; মসজিদ, মন্দির, গির্জা থেকে মাইকের মাধ্যমে স্থানীয় অধিবাসীদের সচেতন ও সতর্ক করার ব্যবস্থা করবেন। (৮) সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় কমিটির যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করা। (৯) কোনোভাবে যেন কোথাও 'উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা' তৈরি না হয়, সেদিকে নজর রাখা। (১০) ত্রাণ বিতরণ কর্মকাণ্ড পুলিশ ও সেনাবাহিনীর নজরদারিতে রাখা। (১১) প্রত্যেক বাড়ি ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে সকাল-সন্ধ্যা বিশেষ প্রার্থনার ব্যবস্থা করা। (১২) কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে না পৌঁছানো পর্যন্ত 'লকডাউন, সঙ্গরোধ ও সামাজিক দূরত্ব ব্যবস্থাকে জোরদার রাখা। (১৩) সাধারণ জ্বর, সর্দি-কাশি নিরাময়ের জন্য ওষুধ গ্রহণে কালক্ষেপণ না করা এবং সাধারণ রোগী যেন উদ্বিগ্ন না হয় সে ব্যাপারে চিকিৎসক, নার্স ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের সংবেদনশীল আচরণ করা। (১৪) সরকারি নির্দেশনা, আইইডিসিআরের ঘোষণা, স্থানীয় প্রশাসন ও স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্রের স্বাস্থ্যকর্মীদের উপদেশ মেনে চলা, ইত্যাদি।
করোনা প্রতিকারে সরকারের প্রচেষ্টাও দিন দিন বাড়ছে যা আগের তুলনায় প্রশংসনীয়। প্রধানমন্ত্রী অনেকটা নিয়ম করেই তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে সার্বিক দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন, ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায় এবং এমনকি প্রয়োজনে প্রত্যন্ত অঞ্চলভিত্তিক খোঁজখবর প্রায় প্রতিদিন নিচ্ছেন। সম্ভব হলে প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাইরে সরকারের অন্য মন্ত্রীদের করোনার ব্যাপারে অথর্ব কোনো কথাবার্তা না বলাই ভালো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নজরদারির ব্যবস্থা করা যেন কেউ গুজব ছড়াতে না পারে। পরিশেষে বলতে চাই, বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময়কালে এখনও যখন শুনি ত্রাণের পণ্য নিয়ে একদল লোভী ও নিষ্ঠুর মানুষ তার লোলুপ দৃষ্টি ও কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে সংবরণ করতে পারে না, তখন মনে হয়, মানুষগুলো আর কবে 'মানুষ' হবে? সত্যি যদি লোলুপতা থেকে তাদের মুক্তি না আসে তবে তাদের যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়।
লেখক: প্রাথমিক ও কমিউনিটি স্বাস্থ্য পরিষেবাবিষয়ক পিএইচডি গবেষক, ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি, চীন এবং শিক্ষক ও সাবেক চেয়ারম্যান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি, গোপালগঞ্জ
