ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

গুরুত্ব দিতে হবে সমন্বিত কর্মসূচি ও জনসচেতনতায়

গুরুত্ব দিতে হবে সমন্বিত কর্মসূচি ও জনসচেতনতায়
×

ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান

প্রকাশ: ২৩ এপ্রিল ২০২০ | ০৬:১৯ | আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২০ | ০৯:১০

কভিড নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন দেশ লকডাউন বা শাটডাউনের মতো কঠোর কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ল্যাবরেটরি টেস্টের আওতায় আনা হয়েছে বিপুলসংখ্যক মানুষকে। আর এসব কর্মসূচির যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে এর উৎসস্থল উহানসহ কানাডা, সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ কভিডের প্রকোপ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশে কভিড-১৯ আক্রান্ত প্রথম রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। কিছুটা বিলম্বে হলেও করোনা প্রতিরোধে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করতে আরোপ করা হয় বিধিনিষেধ। এসব বিধিবিধান কার্যকর করতে পুলিশের পাশাপাশি মোতায়েন করা হয়েছে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের। কিন্তু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে, শহরের রাস্তায় লোক সমাগম এখনও আশানুরূপ মাত্রায় হ্রাস পায়নি। আর গ্রামগুলোতে চলছে রীতিমতো আড্ডা। তা ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় করোনা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সচেতনতার চেয়ে বিভিন্ন কুসংস্কারের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এরই মধ্যে ১৮ এপ্রিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার একজন খ্যাতিমান আলেমের জানাজা অনুষ্ঠিত হয় লক্ষাধিক মানুষের অংশগ্রহণে এবং বরগুনায় একজন রাজনৈতিক নেতার জানাজায় অংশগ্রহণ করেন কয়েক হাজার মানুষ। সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক করোনা সংক্রমণের দিক থেকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ জেলা অবরুদ্ধ ঘোষণা করা হলেও, প্রতিদিনই বিপুলসংখ্যক মানুষ এই জেলাগুলো থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ছেন। এই তথ্য থেকে এটা সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, আমাদের লকডাউন কর্মসূচি যথাযথভাবে কার্যকর হচ্ছে না। আর কভিডের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমাদের সাধারণ মানুষের সচেতনতার জায়গাটি আমরা এখনও প্রস্তুত করতে পারিনি। আর এই পরিস্থিতি সৃষ্টির অন্যতম কারণ হতে পারে, এখন পর্যন্ত দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে কভিড সংক্রমিত হিসেবে চিহ্নিত রোগীর সংখ্যার স্বল্পতা।

সরকার ইতোমধ্যে ঢাকার রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটসহ (আইইডিসিআর) সারাদেশে মোট ২০টি প্রতিষ্ঠানে কভিড-১৯ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আইইডিসিআর সূত্রে জানা যায়, ২১ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ৩,৩৮২ জন কভিড-১৯ আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং মৃত্যুবরণ করেছেন ১১০ জন। এটি বাংলাদেশের কভিড সংক্রমণের বাস্তবতাকে কতটা চিত্রিত করে তা ভেবে দেখা দরকার। কারণ আইইডিসিআর বলছে, ২১ এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ১৭ কোটি জনসংখ্যার মাত্র ২৯,৫৭৮ জন সন্দেহভাজনকে ল্যাবরেটরি টেস্টের আওতায় আনা হয়েছে। অথচ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কর্তৃক কভিডকে বৈশ্বিক মহামারি ঘোষণার পরবর্তী দুই মাসে বেশ কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো থেকে স্থল ও আকাশ পথে দেশে ফিরেছেন। যাদের মধ্যে অধিকাংশই প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আসেননি। বরং অবাধে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ফলে প্রবাসীদের মধ্যে যারা কভিড পজিটিভ ছিলেন, তাদের মাধ্যমে ইতোমধ্যে সংক্রামিত হয়েছেন বহুজন।। তা ছাড়া আমাদের প্রায় দেড় মিলিয়ন গার্মেন্ট কর্মীর দুই দফায় ঢাকা ত্যাগ ও বাড়ি ফেরার ঘটনা অপ্রত্যাশিতভাবে করোনা ঝুঁকিকে বিস্তৃত করেছে দেশজুড়ে।

এ অবস্থায় রোগটির কার্যকর কোনো ওষুধ আবিস্কৃত না হওয়ায়, করোনা উপসর্গ দেখা দিলেও মানুষ সহজে হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না। অনেকেই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভোগান্তির ভয়ে, সব জেনেও পরিবারের সদস্যের মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত গোপন করছেন। অপরদিকে সামান্য উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণকারীর দেহেও করোনার উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপ আমেরিকার সঙ্গে বাংলাদেশের কভিড শনাক্তকৃত রোগীর তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরছেন। আর অজানা কারণে আড়াল করছেন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর টেস্টের সংখ্যা, যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে আর উদাসীন করে তুলছে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলের সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার ক্ষেত্রে। অথচ ২১ এপ্রিল ডব্লিউএইচও সাংবাদিকদের জানায়, কভিড-১৯-এর ভয়াবহতা আরও দীর্ঘ হতে পারে। তাই বিশ্ববাসীর উচিত নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগোনো। এমতাবস্থায়, সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন এই ভাইরাসটির বহু বৈশিষ্ট্য এখনও আমাদের অজানা থাকায় দ্রুততম সময়ে অধিকাংশ মানুষকে ল্যাবরেটরি টেস্টের আওতায় আনার কোনো বিকল্প নেই। তাই বিভ্রান্তিকর প্রচারণা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সক্রিয় হতে হবে। কভিড মোকাবিলায় এগোতে হবে সমন্বিত জন সম্পৃক্ত কর্মসূচির দিকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুততম সময়ে ল্যাবরেটরি টেস্টের আওতা সম্প্রসারিত করতে হবে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত। প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি করে এবং বিভাগীয় শহরগুলোয় একাধিক ল্যাবে কভিড-১৯ শনাক্তকরণের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার সম্ভাব্য সন্দেহভাজনকে ল্যাবরেটরি টেস্টের আওতায় এনে দেশের করোনা পরিস্থিতির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সবাইকে অবহিত করতে হবে, যাতে মানুষ বাস্তবতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থেকে সঠিক পথে চলতে পারেন। আক্রান্তদের চিকিৎসার মানসম্মত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে, চিকিৎসা কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্মত সুরক্ষা সরঞ্জামসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। লকডাউনের কারণে দারিদ্র্যের কবলে পড়া প্রান্তিক মানুষের নূ্যনতম খাদ্য ও আর্থিক সহায়তার জোগান দিতে হবে। তবে এ জন্য প্রয়োজন হবে বিপুল পরিমাণ অর্থের। আশার কথা হচ্ছে, কভিড মোকাবিলায় বিভিন্ন জরুরি ব্যয় মেটাতে প্রয়োজনে উন্নয়ন বাজেটের এক লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের সময়োপযোগী পরিকল্পনার কথা ১৮ এপ্রিল জাতীয় সংসদকে অবহিত করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। সেইসঙ্গে তিনি সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সর্বাত্মক সহযোগিতার আহ্বান জানান। আমরা বিশ্বাস করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি অংশীজনরা সুচিন্তিত ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ে এগিয়ে আসবেন।

অন্ততপক্ষে কার্যকর কোনো ওষুধ বাজারে আসার পূর্ব পর্যন্ত, উন্নত দেশগুলোর মতো আমাদেরও মূল ফোকাস থাকবে, করোনার সংক্রমণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখায়। সেক্ষেত্রে স্বল্পমেয়াদি লাভ-ক্ষতির হিসাবে আটকে না থেকে, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবকে প্রাধান্য দিতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে তড়িঘড়ি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন যেন কোনোভাবেই দীর্ঘমেয়াদি দুর্ভোগ ডেকে আনতে না পারে। সেই লক্ষ্যে ইউরোপ আমেরিকার অভিজ্ঞতা সামনে রেখে, জাতীয়ভাবে বলবৎযোগ্য যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে, এর সম্ভাব্য ফলাফল গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে হবে। 'জনসাধারণের ঘরে থাকা' নিশ্চিত করতে পারলে, সীমিত সামর্থ্যের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে মহামারির প্রকোপ লাঘব করা অনেকাংশই সহজতর হবে। তাই প্রয়োজনে কারফিউ জারি করে নিশ্চিত করতে হবে আমাদের ঘরে থাকা।

আশা করা যায়, এসব সমন্বিত উদ্যোগ আমাদের কভিড-১৯ সংক্রমণের দুর্বিষহ সময়কে অতিক্রম করে চতুর্থ শিল্প বিপল্গবের কর্মমুখর স্বপ্নিল দিনগুলোতে পৌঁছে দেবে।

সহকারী অধ্যাপক (হিসাববিজ্ঞান), ময়মনসিংহ সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ।
[email protected]

আরও পড়ুন

×