পারুল হোক একটি সাহসের নাম
আলফা আরজু
প্রকাশ: ১২ মে ২০২০ | ০২:২০ | আপডেট: ১২ মে ২০২০ | ০৪:৪৭
সম্প্রতি আমরা দেখেছি- একজন সাংবাদিক যিনি অন্যের সঙ্গে ঘটে যাওয়া নির্যাতন-প্রতারণাসহ সমাজের প্রান্তিক, সুবিধাবঞ্চিত ও সংখ্যালঘুদের নানা বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন লিখে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করতেন। তিনি নিজেই এখন সংবাদের শিরোনাম।
সাজিদা ইসলাম পারুল, বর্তমানে দৈনিক সমকালের প্রতিবেদক ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক নারী বিষয়ক সম্পাদক। তিনি নির্যাতন ও প্রতারণার শিকার হয়ে থানায় 'যৌতুক, প্রতারণা ও ভ্রূণ হত্যা' মামলা করেছেন। অভিযুক্তের নাম- রেজাউল করিম প্লাবন। তিনি দৈনিক যুগান্তরের প্রতিবেদক।
পারুলকে আমরা যারা কিছুটা হলেও চিনি, তারা সবাই একবাক্যে স্বীকার করি যে, চরম নির্যাতন না হলে তিনি এই সিদ্ধান্তে আসতেন না। পারুল দেখতে যেমন সরল, মনেও তেমন। অনেকের মতে, এই যুগে পারুলদের এমন সরলতা মানায় না। অনেকে নানা মুখরোচক সমালোচনা করে চলেছেন। আমি বিশ্বাস করি, তাদের সমালোচনা পারুলকে আরও সুন্দর ও ভালো মানুষ হওয়ার পথ দেখাবে। তাকে শুধু বলব- কোনো সমালোচনায় থেমে যেও না। ভয় পেয়ো না বা মন খারাপ করো না। এইসব কিছুই তোমাকে আরও আত্মবিশ্বাসী হতে সহায়তা করবে।
পারুল যেহেতু নারী ও শিশু বিষয়ক রিপোর্টিং করেন, তাই নানা সময় নারীরা নির্যাতনের শিকার হয়ে পারুলের কাছে এসেছেন। আর পারুল তার সাংবাদিকতার বাইরেও সেই সব নারীর জন্য যতরকম সহযোগিতা করা যায়- নীরবে করেছেন ও পাশে থেকেছেন। সেইসব নির্যাতিত নারীদের আত্মবিশ্বাস ও স্বনির্ভর হতে সহযোগিতাও করেছেন।
এখন পারুল নিজেই একটা ট্রমার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন। এখন তার নিজেরই আত্মবিশ্বাসী হওয়া সবচেয়ে জরুরি। দেশে থাকতে প্রায়ই তাকে দেখতাম ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) কিংবা বিভিন্ন অ্যাসাইনমেন্টে। খুব একটা কথা হতো না। কিন্তু, সবসময়ই ভীষণ মিষ্টি হাসি আদান-প্রদান হতো। একদিন তাকে আমি ডিআরইউর বাগানে জিজ্ঞেস করেছিলাম- 'মেয়ে বিয়ে করবা না?' মিষ্টি মেয়েটি বলেছিলো- 'নাহ, আপু করবো না।' কারণটা এখানে আর নাইবা বর্ণনা করলাম।
পারুল খুব সুন্দর গান করেন, মঞ্চনাটকে অভিনয়ের সুবাদে নাচে ও অভিনয়ে দারুণ দক্ষ। তার লেখার হাত চমৎকার। বন্ধুবৎসল। সব মিলিয়ে আমরা তাকে খুব পছন্দ করি। প্রবাসে আসার পর মেসেঞ্জারে মাঝে মধ্যে কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে, যেবার তিনি ডিআরইউতে নির্বাচন করেন, তখন ঘনঘন কথা হতো।
পারুলের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক প্রতারণা ও নির্যাতনের পর যখন কথা হলো, আমি আরও মুগ্ধ হয়েছি। ওর সরলতা এখনও আছে, কিন্তু আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়েছে। এই আত্মবিশ্বাসই ওকে বর্বর নির্যাতনের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে সহযোগিতা করবে।
বলতে দ্বিধা নেই, পারুল আমাদের আলোকবর্তিকা। পারুল নিশ্চয়ই জানে কখন কতটা শক্ত হতে হয় বা নরম হতে হয়। তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সব নির্যাতন, নিপীড়ন, প্রতারণার বিচার হোক। তার ন্যয়বিচারপ্রাপ্তি অন্য নির্যাতিত নারীদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।
পারুলকে বলি- এই সময়ে আপনাকে অনেকে অনেকভাবে টলানোর চেষ্টা চালাবে। আপনার মনোবল ও আত্মবিশ্বাস টলানোর তালিকায় পাবেন চারপাশের চেনা-অচেনা অনেককেই। এমনকি তার মধ্যে পেশা ও পরিবারের মানুষকে পেলেও অবাক হবেন না। আমাদের দেশে বেশির ভাগ মানুষ আত্মবিশ্বাসী বা সাহসী নারীদের ভয় পায়। ভয় থেকেই আসে আজেবাজে গালিগালাজ এবং ব্যক্তিগত বিষয়াবলী নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু আপনাকে অটল থাকতে হবে। অনেকেই 'পাশে আছি' বলবে; কিন্তু জানবেন যে, যুদ্ধটা আপনাকেই করতে হবে। এই দীর্ঘ যুদ্ধের প্রস্তুতির মূল হাতিয়ার হচ্ছে শারীরিক-মানসিক সুস্থতা ও সততা। তাই, নিজের দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
নারী নির্যাতন এখনও 'নীরব ঘাতক'। এর বিরুদ্ধে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সবার হয় না। তাই নীরবে সহ্য করে চলে। পারুলের ক্ষেত্রেও দেখা যাবে, অনেক 'সচেতন' মানুষ ভ্রূণ হত্যার মতো অপরাধ, শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার ও প্রতারণা সত্ত্বেও বলবেন- সম্পর্কটা ঘরোয়াভাবে মধ্যস্থতা করে মিটিয়ে ফেলা যেতো, এটা দুনিয়ার মানুষকে জানানো ঠিক না, মামলা করা ঠিক না ইত্যাদি। তাদের পরোক্ষ উদ্দেশ্য রেজাউল করিম প্লাবনকে বাঁচানো। আর আজ প্লাবন রেহাই পেলে আরও অনেক প্রতারক-নির্যাতক দুঃসাহস দেখিয়েই চলবে।
আমি মনে করি, নারী নির্যাতনের নীরব ঘাতকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি নাম 'পারুল'। তাকে যেমন মেরুদণ্ড সোজা করে, মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, তেমনই তুলে ধরতে হবে অন্য পারুলদের কথা। এই সমাজে পারুলের সাহস, প্রজ্ঞা ও লেখনি খুবই প্রয়োজন। পারুলকে দেখে অন্যান্য নির্যাতিত নারী যেন সাহস পায়। নিপীড়ন নীরবে সহ্য করে তারা যেন মরার আগেই বহুবার না মরে। তারাও যেন পারুলের মতো উঠে দাঁড়িয়ে বলে- জীবনের চেয়ে সুন্দর কিছু নেই!
পারুল হোক একটি সাহসের নাম !
লেখক: প্রবাসী সাংবাদিক