আইনশৃঙ্খলা
র্যাবের সাফল্য এবং আইনের শাসনের প্রতি আস্থার দায়
র্যাবের বর্তমান সাফল্য প্রশংসনীয়, এই সাফল্য টেকসই করতে হলে আইনের শাসনের প্রতি অবিচল থাকতে হবে
রবিউল ইসলাম
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৬ | ১৮:১৭
যে কোনো রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ভূমিকা সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে কিছু প্রতিষ্ঠান সময়ের নিরিখে কেবল বাহিনী হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের শক্তি, সংকট ও সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে ওঠে। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র্যাব তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। যদিও র্যাব মাঝপথে জড়িয়ে পড়েছিল বিতর্কের জালে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও এই বাহিনী নতুন করে নিজেদের পুনর্গঠনের মাধ্যমে সাফল্যের ধারায় ফিরতে শুরু করেছে– এমন একটি বাস্তবতা নিশ্চয়ই বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
২০০৪ সালের ২৬ মার্চ, স্বাধীনতা দিবসের প্যারেডে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করে র্যাব। সে সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল চরম অস্থির। সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক সহিংসতা– সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ছিল তীব্র। এই বাস্তবতায় দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল, গোয়েন্দানির্ভর এবং আধুনিক কৌশলে পরিচালিত একটি বাহিনীর প্রয়োজনীয়তা থেকেই র্যাবের জন্ম। আর জন্মের পরপরই তারা তাদের কার্যকারিতার মাধ্যমে মানুষের মনে এক ধরনের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়।
প্রথমদিককার অভিযানগুলোতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের সাফল্য এবং জঙ্গিবাদ দমনে দৃশ্যমান অগ্রগতি র্যাবকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে। জনমনে একটি বিশ্বাস তৈরি হয়, রাষ্ট্র এবার শক্ত হাতে অপরাধ দমনে নেমেছে। কিন্তু এই উত্থানের পথ খুব বেশি মসৃণ ছিল না। বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে র্যাবের কর্মকাণ্ড ঘিরে সমালোচনা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর র্যাব ধীরে ধীরে নিজেদের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার চেষ্টা শুরু করে। শক্তির প্রদর্শনের বদলে আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্য, প্রযুক্তিনির্ভর গোয়েন্দা তৎপরতা এবং জবাবদিহির দিকে মনোযোগ দেয় র্যাব। এই পরিবর্তনগুলো তাদের নতুন করে পথচলার ভিত্তি তৈরি করে।
এই পুনর্গঠনের ফল সাম্প্রতিক সময়ে তাদের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে র্যাব আবারও দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে শুরু করেছে। এক বছরের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তিন উল্লেখযোগ্য জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বও রয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে র্যাবের কার্যক্রম একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। একসময় জলদস্যুদের দখলে থাকা এই অঞ্চল ধীরে ধীরে নিরাপদ হয়ে ওঠে র্যাবের সমন্বিত অভিযানের ফলে। শত শত জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসেছে এবং তাদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে একটি মানবিক দৃষ্টান্তও স্থাপন করা হয়েছে। ফলে দমন ও পুনর্গঠন– এ দুয়ের সমন্বয়ে র্যাব একটি টেকসই সমাধানের পথ দেখিয়েছে।
অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধারের ক্ষেত্রেও র্যাবের কার্যক্রম ছিল উল্লেখযোগ্য। গত এক বছরে তারা শত শত অস্ত্রধারী অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি অস্ত্র, হাজার হাজার রাউন্ড গুলি ও বিস্ফোরক উদ্ধার করেছে। এ সাফল্য দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মাদকবিরোধী অভিযানে র্যাবের সাফল্য আরও বিস্তৃত। হাজার হাজার মাদক ব্যবসায়ীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং কোটি কোটি পিস ইয়াবা, হাজার হাজার কেজি গাঁজা, বিপুল পরিমাণ হেরোইন, ফেনসিডিল ও অন্যান্য মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
বিশেষ করে ‘আইস’ বা ক্রিস্টাল মেথের মতো নতুন ও বিপজ্জনক মাদক দমনে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই অভিযানের ফলে মাদক চক্রের ওপর একটি বড় ধাক্কা এসেছে, যদিও এই লড়াই এখনও দীর্ঘমেয়াদি।
এখানে একটি সত্য স্বীকার করতেই হবে যে চাঞ্চল্যকর হত্যা ও ধর্ষণ মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে র্যাব নতুন করে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। তাদের গোয়েন্দা ও সাইবার টিমের কার্যক্রমের ফলে বহু ক্লুলেস মামলার সমাধান হয়েছে এবং দীর্ঘদিন পলাতক থাকা আসামিরা গ্রেপ্তার হয়েছে। এতে জনমনে আইনের শাসনের প্রতি আস্থা যথেষ্ট পরিমাণে পুনরুদ্ধার হয়েছে।
মানব পাচার, প্রতারণা এবং সাইবার অপরাধের মতো আধুনিক অপরাধ দমনেও র্যাব সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। সংঘবদ্ধ মানব পাচারকারী চক্র ভেঙে দেওয়া, প্রতারণার জাল উন্মোচন এবং অনলাইন অপরাধ নিয়ন্ত্রণ– সব মিলিয়ে র্যাব নিজেদের একটি বহুমাত্রিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
কিশোর গ্যাং নির্মূলের ক্ষেত্রেও তাদের উদ্যোগ লক্ষণীয়। বিভিন্ন অভিযানের মাধ্যমে বহু কিশোর অপরাধীকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রমও চালানো হয়েছে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে সামাজিক অপরাধ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে হাজার হাজার মামলা নিষ্পত্তি এবং কোটি কোটি টাকা জরিমানা আদায়ের মাধ্যমে র্যাব প্রশাসনিক কার্যক্রমেও সক্রিয় ভূমিকা রাখছে।
প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের মাধ্যমে তাদের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও কার্যকর হয়েছে, যা আধুনিক আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।
র্যাবের বর্তমান সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু এই সাফল্য টেকসই করতে হলে তাদের অবশ্যই আইনের শাসনের প্রতি অবিচল থাকতে হবে।
রবিউল ইসলাম: সাংবাদিক
- বিষয় :
- র্যাব
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনী
