শেখ মনি: চতুর্মুখী প্রতিভাবান এক যুবনেতা
মাহবুবুর রহমান পলাশ
প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১২:১১ | আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২০ | ১৩:০৪
যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ ফজলুল হক মনি। চতুর্মুখী প্রতিভাবান এক যুবনেতা। মুক্তিযোদ্ধা এ নেতা একাধারে একজন সাংবাদিক, লেখক ও বাঙালি সংস্কৃতির একনিষ্ঠ ধারক। আমরা শেখ মনিকে জানি যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ১৯৭২ সালে যুবলীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি এ দেশে যুব রাজনীতির সূচনা করেন। যুবলীগের প্রথম চেয়ারম্যানও শেখ ফজলুল হক মনি। আজ যুব রাজনীতির আদর্শ এ নেতার জন্মদিন। ১৯৩৯ সালের ৪ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়ায় ঐতিহাসিক শেখ পরিবারে জন্ম নেন শেখ ফজলুল হক মনি। তার বাবা শেখ নূরুল হক বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও মা বঙ্গবন্ধুর বড় বোন আছিয়া খাতুন।
যুব রাজনীতির সঙ্গে লাখো যুবক যুক্ত থাকলেও শেখ মনি সম্পর্কে আমরা অনেক কিছুই জানি না। মুক্তিযুদ্ধে গঠিত মুজিব বাহিনীর বিমানবাহিনী গঠনের মূল চিন্তাধারা ছিল যে মানুষটির তিনি হলেন শেখ মনি। এছাড়া ষাটের দশক থেকেই সামরিক শাসনবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন তিনি। এ জন্য ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে মুজিব বাহিনী গঠনের ধারণার উন্মেষ ঘটে। সেই নিউক্লিয়াসের প্রাণপুরুষ শেখ মনি।
১৯৬০-১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ছয় মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৪ সালের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর ও পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর আবদুল মোনায়েম খানের কাছ থেকে সনদ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান এবং সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে সমাবর্তন বর্জন আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার ডিগ্রি প্রত্যাহার করে নেয়। পরবর্তী সময়ে তিনি মামলায় জয়লাভ করে ডিগ্রি ফিরে পান। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন এবং দেড় বছর কারাভোগ করেন। ১৯৬৬-এর ৬ দফা আন্দোলন তার রাজনৈতিক জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তার সম্পাদনায় সাপ্তাহিক বাংলার বাণী পত্রিকা দৈনিকে রূপান্তরিত হয়। ১৯৭৩ সালের ২৩ আগস্ট তিনি সাপ্তাহিক সিনেমা পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৭৪ সালের ৭ জুন তার সম্পাদনায় ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস প্রকাশিত হয়। তার রচিত গল্পের সংকলন 'বৃত্ত' ১৯৬৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। সম্প্রতি সংকলনটি আবারও প্রকাশিত হয়েছে 'গীতারায়' নামে। এ সংকলনের 'অবাঞ্ছিত' গল্পটি নিয়ে টেলিফিল্মও হয়েছে। শিশু-কিশোরদের সংগঠন শাপলা কুঁড়ির আসরেরও তিনি প্রতিষ্ঠাতা।
শেখ ফজলুল হক মনি, যিনি বাংলাদেশের যুব রাজনীতির পথিকৃৎ। কিন্তু বয়সের কারণে তাকে দেখার ভাগ্য হয়নি। যুব রাজনীতির এ প্রতিষ্ঠাতা সম্পর্কে জানার আগ্রহ তৈরি হয়, বর্তমানে ইন্টারনেটের কল্যাণে কিছুটা জানতে আগ্রহ আরও তৈরি হয় মনে এবং আশ্চর্য হই, অভিভূত হই- একজন মানুষ এত গুণের অধিকারী হন কী করে! মনে মনে খুঁজতে থাকি তার সমসাময়িক রাজনীতিক কে আছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট রেজাউর রহমান স্যারের কাছ থেকে মনি ভাই সম্পর্কে জানতে পারি। স্যার ছিলেন মনি ভাইয়ের একান্ত সহচর। যুবলীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য এবং পরে প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও মুজিব বাহিনীর অন্যতম সদস্য হন। স্যার বলেন, মনি ভাই ছিলেন এক কথায় জিনিয়াস। বঙ্গবন্ধু মনি ভাইয়ের মেধা মনন সাহসিকতা দেখেই তার আপন ভাগ্নেকে রাজনীতিতে এনেছিলেন। রেজা স্যার বলেন, 'ঘাতকরা ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর আগে কেন মনি ভাইকে হত্যা করেছিল তা জানো?' আমি মাথা ঝুঁকিয়ে না বলি। স্যার বলেন, 'চিন্তা করে দেখো উত্তর পাবে।' তিনি বলেন, 'মনি ভাইকে নিয়ে একটি স্মারক গ্রন্থ বানানো হবে। স্মারক গ্রন্থটি হলে বর্তমান প্রজন্ম মনি ভাই সম্পর্কে আরও জানতে পারবে।'
আমি বাংলাদেশের যুব রাজনীতির পথিকৃতকে নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার মানসিক শক্তি দিয়ে যত গভীরে যাচ্ছি ভয়ও পাচ্ছি, আবার এমন একজন গুণীজন সম্পর্কে লিখতে উত্তেজনাও অনুভব করছি! মনি ভাইকে নিয়ে কোথা থেকে শুরু করব তা বুঝতে অনেক সময় লাগল। তারপর এইভেবে শুরু করলাম অসাধারণ মানুষের বর্ণাঢ্য জীবনী, ইতিহাস, কাহিনি যেভাবেই লিখি তা মানুষ পড়বেই। কারণ, কে লিখছে পাঠক এ কথাটা ভুলে যাবেন।
- বিষয় :
- শেখ ফজলুল হক মনি
