ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন
শেষবেলায় বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:০৪ | আপডেট: ২৭ জানুয়ারি ২০২০ | ১৫:১৭
আর মাত্র দু'দিন। এর পরেই শেষ হচ্ছে ঢাকার দুই সিটি ভোটের প্রচারাভিযান। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী বৃহস্পতিবার মধ্যরাতের পর প্রচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের মধ্য দিয়ে ১০ জানুয়ারি শুরু হয়েছিল এ কার্যক্রম। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রচারের উত্তাপ যেমন বেড়েছে, তেমনি তার আড়ালে হরেক মার্কার পোস্টারে ছেয়ে যাওয়া রাজধানীর ঈশান কোণে উঁকি দিচ্ছে সংশয়ের মেঘমালা। বিশেষ করে প্রচারের শেষবেলায় এসে গত কয়েকদিনের সংঘর্ষের ঘটনায় উৎসবের আমেজে কিছুটা হলেও দাগ লেগেছে। ভোটের দিন ঘিরে ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। গণসংযোগের সময় বড় দুই রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের একাধিক সংঘর্ষে জনমনে আতঙ্ক বাড়ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেছেন, ভোটের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ছোটখাটো ঘটনা ধর্তব্য নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচারে এসব সংঘাত-সংঘর্ষ সাধারণ ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে। এদিকে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি গতকাল সোমবার নির্বাচন কমিশনে (ইসি) গিয়ে নির্বাচনকে ঘিরে তাদের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার কথা জানিয়েছে।
সিইসি বলেছেন, নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড আছে। দু'দলের অভিযোগ অভিন্ন। দু'দলকেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। দুটি ঘটনা ঘটেছে এত বড় শহরে- এ থেকে নির্বাচন বানচাল, ব্যাহত বা বিনষ্ট হওয়ার কোনো কারণ নেই।
আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির ভোট অনুষ্ঠিত হবে। দু-একটি সংঘর্ষ ছাড়া শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় থাকলেও আচরণবিধি প্রতিপালনে তেমন ভূমিকা রাখতে দেখা যায়নি ইসিকে। উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর শঙ্কায় আছেন ভোটাররা। নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ৬৫ প্লাটুন বিজিবি মাঠে থাকবে। বিজিবির টিমের সঙ্গে ৩০ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত একজন করে উত্তর সিটিতে ৫৪ জন এবং দক্ষিণ সিটিতে ৭৬ জনসহ ১৩০ জন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট থাকবেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে মাঠে নামছেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরাও। ঢাকার দুই সিটিতে বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারে হামলা ও সংঘর্ষের পরও ভোটের পরিবেশ নির্বাচন কমিশনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে দাবি করেছেন সিইসি। টিকাটুলীতে সেন্ট্রাল উইমেন্স কলেজে ইভিএমের ভোট গ্রহণ প্রশিক্ষণ পরিদর্শন শেষে তিনি এ দাবি করেন। তবে এক দিন আগেই নির্বাচন কমিশনেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই বলে অভিযোগ করেন খোদ নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। তার এ বক্তব্য দেওয়ার এক দিন পরই নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি।
নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক শেষে আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান এইচ টি ইমাম বলেছেন, গোপীবাগে বিএনপি মেয়র প্রার্থীর প্রচারে হামলার যে অভিযোগ, তা পুরোপুরি সাজানো ও পূর্বপরিকল্পিত। নির্বাচন বানচালের জন্য ইশরাকের ক্যাডাররা আমাদের ওপর হামলা করেছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলছেন উল্লেখ করে বিএনপির অভিযোগকে 'চোরের মায়ের বড় গলা' বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে নির্বাচনী পরিবেশ সুষ্ঠু ও ঢাকাবাসীর নিরাপত্তার লক্ষ্যে সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করার অনুরোধ জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে প্রতিনিধি দলটি গতকাল সোমবার বিকেলে সিইসি ও অন্য নির্বাচন কমিশনাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে বৈঠকের আগে বিএনপির ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠক করে কমিশন। বৈঠক শেষে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, দেশে যে রাজনীতি চলছে, সেখানে বিএনপি আওয়ামী লীগকে আক্রমণ করেছে- এটা বিশ্বাস করার কোনো কারণ আছে? রোববার বিএনপি কর্মীদের পেটানোর পর আওয়ামী লীগ আবার উল্টো মামলা করেছে। এখন নতুন নিয়ম হয়েছে যে আগে পেটাবে, পরে মামলা দেবে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনের সব আইনকানুন অমান্য করছে। বিএনপি আইন মেনেই প্রচার চালাচ্ছে।
দু'দলের সঙ্গে বৈঠকে পাল্টাপাল্টি অভিযোগের পর সোমবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেন, আওয়ামী লীগ রোববারের ঘটনার জন্য বিএনপিকে দায়ী করেছে। তাদের বক্তব্য, এ সুযোগে বিভিন্ন জায়গা থেকে সন্ত্রাসী দল ঢাকায় ঢুকে পড়বে। নির্বাচনের সময় নির্বাচন প্রক্রিয়া ব্যাহত করবে- ইসি যেন ব্যবস্থা নেয়। আমরা বলেছি, নির্দিষ্ট যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেটা বলতে হবে। আর কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স থাকলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে আইনগত সহযোগিতা করার কথাও বলা হয়েছে। ভোটের দিন আইনশৃঙ্খলা অবনতির আশঙ্কা নেই বলেও জানান তিনি।
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের ভোটে সবচেয়ে বড় আলোচিত ঘটনা আচরণবিধি লঙ্ঘন। প্রার্থীরা পাল্টাপাল্টি অভিযোগ জমা দিয়েছেন প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা চলছেই। রূপনগর শিক্ষা-স্বাস্থ্য সহায়তা ফাউন্ডেশনের (রিহাফ) চেয়ারম্যান এ এম আবদুর রাজ্জাক বলেন, তার দৃষ্টিতে বিধিনিষেধ উপেক্ষা করছেন প্রার্থীরা। শোডাউনের ব্যাপারে বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না। আর্থিক বিধিও মানা হচ্ছে না। পোস্টার ছেঁড়ার ঘটনাও ঘটছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী বা তার লোকজন প্রভাব বেশি খাটাচ্ছে। জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান অধ্যাপক নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ বলেন, সব পক্ষ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে- এটা একটা ইতিবাচক দিক। যথেষ্ট উৎসাহ আছে ভোটারদের মধ্যে। অংশগ্রহণমূলক ভোটে কিছু ব্যতিক্রম-বিচ্ছিন্ন ঘটনা বাদে মোটাদাগে ক্যাম্পেইন সুন্দরভাবেই চলছে।
নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, এত বড় শহরে সীমিত সংখ্যক নির্বাহী হাকিম আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি দেখছেন। অনেককে সতর্ক করা হয়েছে, অনেককে জরিমানাও করা হয়েছে। কিন্তু কোটি মানুষের নগরে অপ্রতুল লোকবল দিয়ে দৃশ্যমানভাবে কাজ করা কতটুকু সম্ভব? তিনি বলেন, বাস্তবতা মানতে হবে। কমিশনের হাতে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতা রয়েছে। তবে সেটা কারও মৌখিক অভিযোগে করা সম্ভব নয়। অভিযোগ আসতে হবে, তদন্ত করতে হবে, তারপর কমিশন সিদ্ধান্ত নেবে- এটা একটা প্রক্রিয়া।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এবারের ভোটে ইসির দৃঢ় কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। ফলে অতীতে তাদের বিষয়ে সাধারণ ভোটার, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন মহলে যে নেতিবাচক ধারণা ও আস্থার সংকট তৈরি হয়েছিল, তাতে কোনো পরিবর্তন আসছে বলে মনে হয় না। এর প্রভাব ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির ওপর পড়তে পারে। তিনি বলেন, সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইভিএম নিয়ে আরও বেশি প্রচার চালানোর প্রয়োজন ছিল। কিন্তু কমিশনকে এসব পদক্ষেপ নিতে খুব বেশি আন্তরিক মনে হয়নি।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, প্রচারে প্রার্থীদের এসব সংঘাত-সংঘর্ষ চলতে থাকলে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে বাধ্য। ইসিকে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকার মাধ্যমেই ভোটারদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ বলেন, প্রচারে এ পর্যন্ত দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পরিস্থিতি ভালোই বলা যায়। তবে ভোটের আগে যাতে বড় কোনো অঘটন না ঘটে, সেদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি ম্যাজিস্ট্রেটদের তৎপরতা বাড়াতে হবে। প্রত্যেকে যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে হবে। তিনি বলেন, প্রার্থীদের ওপর আক্রমণ দুঃখজনক। নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টিতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এ বিষয়ে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
ভোটের দিন ঢাকায় সাধারণ ছুটি :ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভোটের দিন সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি শনিবার এই ছুটি ঘোষণা করে সোমবার আদেশ জারি করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। তবে ভোটের দিন নির্বাচনী এলাকায় কোনো পাবলিক পরীক্ষা থাকলে পরীক্ষার কেন্দ্র ও পরীক্ষা-সংশ্নিষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তারা সাধারণ ছুটির আওতার বাইরে থাকবেন বলে আদেশে বলা হয়েছে। ঢাকা সিটি ভোটের কারণে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা ইতোমধ্যে দু'দিন পিছিয়ে দিয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে নতুন সূচি প্রকাশ করা হয়েছে।
