ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

কেইনদের পায়ে শিকল পরাল ঘানার জিজু!

কেইনদের পায়ে শিকল পরাল ঘানার জিজু!
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, ডালাস থেকে

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:২৬

ফুটবল মাঠে বিজ্ঞান আছে, ট্যাকটিস আছে, আর আছে থমাস টুখেলের নিখুঁত জ্যামিতিক ছক। বোস্টনের স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে যাওয়া ইংলিশ সমর্থক থেকে শুরু করে লন্ডনের ট্যাবলয়েড পত্রিকা– সব জায়গার বাতাসেই ম্যাচ শেষে ভাসছে একটি রহস্যময় শব্দ, ‘জিজু’ বা আফ্রিকান কালো জাদু! ঘানার ব্ল্যাক স্টারদের বিরুদ্ধে পেনাল্টি বক্সের সামনে এসে যেভাবে থমকে গেল হ্যারি কেইন কিংবা বুকায়ো সাকাদের আক্রমণ, তাতে অতি বড় নাস্তিকও বোধ হয় কাল রাতে একটু থমকে গিয়েছেন। থমাস টুখেলের শক্তিশালী ইংল্যান্ডকে ০-০ গোলে আটকে রাখার পর ফুটবলবিশ্বের অনেকেই রসিকতা করে বলছেন, লন্ডনের আধুনিক ফুটবল মস্তিষ্ককে কি তবে হারিয়ে দিল ঘানার আদিম কোনো ডাকিনিবিদ্যা?

ম্যাচের ঠিক আগেই ব্রিটেনের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ‘ডেইলি স্টার’ একটি চাঞ্চল্যকর খবর সামনে এনেছিল। ঘানার সবচেয়ে কুখ্যাত উইচ ডক্টর বা ওঝা, যাঁর নাম অনুবাদ করলে দাঁড়ায় ‘বুধবারের শয়তান’, সেই নানা কাঙ্কু বোনসাম নাকি হ্যারি কেইনকে স্তব্ধ করার জন্য বিশেষ জাদুটোনা বা ‘স্পেল’ কাস্ট করেছিলেন! এই সেই ওঝা, যিনি ২০১৪ বিশ্বকাপে পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর হাঁটুতে চোট লাগানোর পেছনেও নিজের জাদুর দাবি করেছিলেন!

বোস্টনের মাঠে কাল যখন ম্যাচের শেষ দিকে নিকো ও’রেইলির হেড পোস্টে লেগে ফিরে এলো এবং ফিরতি বলে ফাঁকা পোস্ট পেয়েও হ্যারি কেইন অবিশ্বাস্যভাবে বল বারের ওপর দিয়ে উড়িয়ে দিলেন, তখন ব্রিটিশ সাংবাদিকদের অনেকেই কপালে হাত দিয়ে বসেন। এই মিস দেখার পর সামাজিক মাধ্যমে একদল সমর্থক দাবি করতে শুরু করেছেন, টুখেলের স্ট্র্যাটেজি নয়, ঘানার ওঝার মন্ত্রই কাল হ্যারি কেইনের বুটে ভর করেছিল! 

আসলে এখানে কোনো জাদু ছিল না, ছিল স্রেফ ঘানার পর্তুগিজ কোচ কার্লোস কুইরোজের নিখুঁত রক্ষণাত্মক ‘মাস্টারক্লাস’। ঘানা দল পুরো ম্যাচে মাত্র ২২ শতাংশ বল দখলে রেখেছিল এবং পুরো দল মিলে মাত্র দুটি শট নিয়েছিল। তারা শুধু নিজেদের বক্সের সামনে চীনের প্রাচীর বা ‘লো ব্লক’ তৈরি করে বসেছিল। আর ইংল্যান্ডের ব্যর্থতা হলো, তারা ১৯টি শট নিয়েও ঘানার রক্ষণদুর্গ ভাঙতে পারেনি। শেষ মুহূর্তে হ্যারি কেইনের বারের ওপর দিয়ে বল উড়িয়ে দেওয়াটা কোনো ওঝার মন্ত্র নয়; ছিল তাঁর প্রচণ্ড মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও ফিনিশিংয়ের ব্যর্থতা।

মূল সত্যিটা ছিল ঘানার ডিফেন্স এবং ৫-৪-১ ফরমেশন। ঘানার গোলরক্ষক বেঞ্জামিন আসারে ও ডিফেন্ডার মারভিন সেনায়ারা যেন গোলপোস্টের সামনে আক্ষরিক অর্থেই প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়েছিলেন। ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক আক্রমণ করেও ডেক্লান রাইস কিংবা এবেরেচি এজেরা ঘানার এই রক্ষণদুর্গ ভাঙতে পারেননি। ম্যাচের পর ঘানার স্ট্রাইকার জর্ডান আইয়ু অত্যন্ত বিনম্রভাবে বলেন, ‘আমাদের কোনো জাদু নেই। আমাদের একমাত্র জাদু ছিল সুশৃঙ্খল ডিফেন্স এবং নিজেদের পরিকল্পনা মাঠে ঠিকঠাক বাস্তবায়ন করা।’

তবে টুখেল ম্যাচ শেষে হতাশ গলায় আক্ষেপ করে বলেছেন, ‘ফুটবলে ভাগ্য খুব সূক্ষ্ম সুতায় ঝোলে। শেষ মুহূর্তে ওই বলটা কীভাবে জালে জড়াল না, তা আমার মাথায় ঢুকছে না।’ টুখেল একে ‘ভাগ্যের পরিহাস’ বললেও কিছু ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড ইংলিশ সাপোর্টারদের উস্কে দিচ্ছে তাদের মুখরোচক জাদুবিদ্যার খবর বানিয়ে। 

আসলে থমাস টুখেলের তারকাখচিত বিলিয়ন ডলারের ইংল্যান্ড দল যখন ঘানার মতো কাগজে-কলমে পিছিয়ে থাকা দলের বিরুদ্ধে গোল করতে পারে না, তখন ব্রিটিশ মিডিয়ার পক্ষে হ্যারি কেইন বা জুড বেলিংহামদের নিখাদ ফুটবলীয় ব্যর্থতা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তখনই সামনে চলে আসে আফ্রিকান ফুটবলার ও তাদের সমর্থকদের কিছু ঐতিহ্যবাহী আচারের কথা। 

আফ্রিকান ফুটবলে ধর্ম, বিশ্বাস এবং ঐতিহ্যবাহী কিছু রীতিনীতি (যেমন– মাঠে নামার আগে বিশেষ তেল মালিশ করা বা প্রার্থনা করা) খুব সাধারণ বিষয়। ব্রিটিশ বা ইউরোপীয় মিডিয়া প্রায়ই এগুলোকে ‘অপবিদ্যা’ বা ‘কালো জাদু’ বলে ট্রোল করে থাকে। কিন্তু এদিন হ্যারি কেইনরা নিজেদের পায়ে নিজেরাই শিকল পরিয়েছেন, সেখানে ঘানার কোনো মায়াজাল ছিল না।

আরও পড়ুন

×