জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে সোয়া কোটি শিশুর শিক্ষা ব্যাহত
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:১১
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চলে গত কয়েক দিন ধরে বৃষ্টি ও ঢলের পর স্কুলের মাঠজুড়ে পানি জমে আছে। কোথাও কোথাও বিদ্যালয়ে যাওয়ার সড়কও পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত। ফলে স্কুলে যাওয়া হয় না অনেক শিশুর। আবার দেশের হাওরাঞ্চলে বর্ষা এলে একই দৃশ্য। আকস্মিক বন্যায় স্কুল ডুবে যায়, বই-খাতা ভেসে যায়, পাঠদান বন্ধ থাকে সপ্তাহের পর সপ্তাহ। অনেক অঞ্চলে নদীভাঙনে বসতভিটা হারিয়ে পরিবারগুলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে বেড়ায়। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস ও অতিবৃষ্টির কারণে বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগব্যবস্থা। সব মিলিয়ে দেশের লাখো শিশুর শিক্ষাজীবন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দুর্যোগ এখন শুধু পরিবেশগত বা অর্থনৈতিক সংকট নয়। এটি শিক্ষার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাপী সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন ও আর্থসামাজিক সংকটের কারণে কোটি কোটি শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সেই তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থানও উদ্বেগজনক। জাতিসংঘের উদ্যোগে গঠিত বৈশ্বিক শিক্ষা তহবিল ‘এডুকেশন ক্যাননট ওয়েট’-এর সর্বশেষ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশে স্কুলগামী বয়সী প্রায় এক কোটি ২৭ লাখ শিশুর শিক্ষা বর্তমানে সংকটের মুখে। তাদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ জলবায়ুজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘এডুকেশন ক্যাননট ওয়েট’-এর হালনাগাদ গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২৫ কোটি ৮০ লাখ শিশু ও কিশোর-কিশোরী এমন পরিস্থিতিতে রয়েছে। যেখানে সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, জলবায়ু পরিবর্তন বা দীর্ঘস্থায়ী আর্থসামাজিক সংকট তাদের শিক্ষাকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করছে। মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে এ ধরনের সংকটে থাকা শিশুর সংখ্যা দুই কোটি ১০ লাখ বেড়েছে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব তীব্রতর হওয়া এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে এ সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বর্তমানে প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ শিশু স্কুল থেকে পুরোপুরি ঝরে পড়েছে। অর্থাৎ তারা কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত নেই। এটি বিশ্বের শিক্ষা খাতের জন্য এক গভীর সংকেত। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, শিক্ষা সংকটে থাকা বিশ্বের প্রায় ৬০ শতাংশ শিশু মাত্র ৯টি দেশে বসবাস করে। দেশগুলো হলো আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ইথিওপিয়া, মিয়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, সুদান ও ইয়েমেন।
গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে স্কুলে যাওয়া বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় চার কোটি ২৮ লাখ। তাদের মধ্যে এক কোটি ২৭ লাখ শিশুর শিক্ষা কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। এর মধ্যে ৯৮ দশমিক ১ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী করা হয়েছে প্রাকৃতিক দুর্যোগকে। মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ ক্ষেত্রে দায়ী আর্থসামাজিক সংকট। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিদ্যালয়ে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও দ্রুত বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থানই এ ঝুঁকির বড় কারণ। একদিকে বঙ্গোপসাগর, অন্যদিকে অসংখ্য নদনদী; পাশাপাশি বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অতিবৃষ্টি, নদীভাঙন, তাপপ্রবাহ ও খরার মতো দুর্যোগের পুনরাবৃত্তি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্রমাগত চাপে ফেলছে।
বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের শিক্ষাগত প্রভাব নিয়ে এর আগেও উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেছে ইউনিসেফ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত ‘লার্নিং ইন্টারাপটেড: গ্লোবাল স্ন্যাপশট অব ক্লাইমেট-রিলেটেড স্কুল ডিজরাপশন ইন ২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালে চরম আবহাওয়াজনিত বিভিন্ন ঘটনার কারণে বাংলাদেশের প্রায় তিন কোটি ৩০ লাখ শিশুর শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। গত বছরের এপ্রিল ও মে মাসে দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহের কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় সরকার। অনেক এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে। শিশুদের মধ্যে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যালয় বন্ধ করা ছাড়া বিকল্প ছিল না। এর পর মে মাসে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় রিমাল। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু বিদ্যালয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক স্কুল আশ্রয়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হওয়ায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। জুন মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। এতে প্রায় এক কোটি ৮৪ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭০ লাখ।
সিলেট অঞ্চলে পরিস্থিতি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। বন্যার কারণে বিদ্যালয় ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ছয় লাখের বেশি শিক্ষার্থীর পড়াশোনা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়। ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে শুধু সিলেট অঞ্চলের শিশুরা জলবায়ুজনিত কারণে প্রায় আট সপ্তাহ শিক্ষা কার্যক্রম থেকে বঞ্চিত ছিল। অন্যদিকে খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুর অঞ্চলের শিশুরা ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত স্কুল দিবস হারিয়েছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ বিদ্যালয় বন্ধ থাকা কেবল পাঠদানের ক্ষতি নয়; এর দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বিদ্যালয় দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে অনেক শিক্ষার্থী আর স্কুলে ফিরে আসে না। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের শিশুরা ঝরে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ছেলেশিশুরা অনেক সময় শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। মেয়েশিশুরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়। এতে একটি প্রজন্মের শিক্ষা, দক্ষতা ও ভবিষ্যৎ আয়ের সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো যখন জীবিকা সংকটে পড়ে, তখন সন্তানদের শিক্ষার ব্যয় বহন করাও কঠিন হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার পরিবর্তে জীবিকা টিকিয়ে রাখাই হয়ে ওঠে পরিবারের প্রধান অগ্রাধিকার।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকার শিক্ষার্থীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ছে। অনেক সময় শুধু স্কুল বন্ধ হয় না, শিক্ষার্থীদের বই-খাতা, শিক্ষাসামগ্রীও নষ্ট হয়ে যায়। পরিবারগুলো আর্থিক সংকটে পড়ে। ফলে শিশুরা পড়াশোনা থেকে পিছিয়ে যায়।
তিনি বলেন, দেশের সব অঞ্চলের বাস্তবতা এক নয়। উপকূল, হাওর, চর কিংবা পাহাড়ি এলাকার জন্য আলাদা পরিকল্পনা প্রয়োজন। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় অঞ্চলভিত্তিক একাডেমিক ক্যালেন্ডার চালু করা গেলে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন সমাজের প্রতিটি খাতে দৃশ্যমান। আমরা সাধারণত খাদ্য নিরাপত্তা, কৃষি বা পরিবেশের ক্ষতির কথা বলি। কিন্তু শিক্ষা খাতেও এর বড় প্রভাব পড়ছে। দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। শিশুরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারছে না। ফলে শিক্ষার মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে অভিযোজনভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে ক্ষতি অনেকাংশে কমানো যেতে পারে।
একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, বাংলাদেশের প্রায় দুই কোটি শিশু বিভিন্ন ধরনের জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।
তিনি বলেন, চরম আবহাওয়া, বন্যা, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সংকটের ফলে শিশুরা তাদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকলে কন্যাশিশুদের ঝরে পড়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি বাড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু শিক্ষা নয়, শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্য, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও শারীরিক সুস্থতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
- বিষয় :
- জলবায়ু
