ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

তাহিরপুরে ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগে হামলা

অভিযুক্ত যুবক কারাগারে আতঙ্কে হিন্দু সম্প্রদায়

অভিযুক্ত যুবক কারাগারে আতঙ্কে হিন্দু সম্প্রদায়
×

সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে তরুণ দীপ্ত রায়ের বাড়ি ভাঙচুর করা হয় সমকাল

 সুনামগঞ্জ ও তাহিরপুর প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৮:২৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে অভিযুক্ত তরুণ দীপ্ত রায় ওরফে প্রিন্স রায়কে (১৮) গতকাল বুধবার জেলহাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। এর আগে গত মঙ্গলবার রাতেই পুলিশ বাদী হয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের দায়ে তাঁর বিরুদ্ধে সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করে। এ ঘটনায় আতঙ্কে রয়েছেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ। 
দীপ্ত বাদাঘাট বাজার পার্শ্ববর্তী গড়কাটি গ্রামের বাসিন্দা নিখিল রায়ের ছেলে। সে এবার এইচএসসি পরীক্ষার্থী। মঙ্গলবার বিকেলে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে ফেসবুকে তার আপত্তিকর মন্তব্য ঘিরে তাহিরপুরের বাদাঘাট বাজারসহ আশপাশের এলাকায় উত্তেজনা ছড়ায়। বিক্ষুব্ধ লোকজন বাদাঘাট বাজারে ও গড়কাটি গ্রামে বাড়িঘর, তিনটি মন্দির এবং দুটি দোকান ভাঙচুর করে। গতকাল বুধবার বিকেলে পুলিশ সুপারসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

গতকাল সকালে দীপ্ত রায়ের গড়কাটির বাড়িতে গিয়ে সাংবাদিকরা দেখতে পান, সেখানে সুনসান নীরবতা। তার মা কেতকী রানী রায় ঘরের ভেতরে বসে কান্নাকাটি করছিলেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার বিকেলে শত শত মানুষ তাদের বসতঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। ঘরে থাকা আসবাব, পানির মোটর, ট্যাঙ্কসহ মালপত্র লুট করে নিয়ে গেছে তারা।
তিনি বলেন, দুপুরে কয়েকজন ছেলে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে নিয়ে যায়। পরে জানতে পারি, ফেসবুকে কিছু লেখার কারণে পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আশপাশ এলাকার শত শত মানুষ বাড়িতে এসে ভাঙচুর চালায়। বাড়ির সামনের ভুসিমালের দোকানও ভাঙচুর করে। 

কেতকী আরও জানান, ঘটনার পর থেকে তাঁর আরও তিন ছেলে, পুত্রবধূ এবং স্বামী ভয়ে বাড়িছাড়া। সন্ধ্যার পর পুলিশ বাড়িতে আসে।
স্থানীয় মন্দিরে গিয়েও ভাঙচুরের দৃশ্য দেখা গেছে। তবে কারা এ হামলা চালিয়েছে, এই বিষয়ে ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চাননি। দীপ্ত রায়ের বাড়ির পাশের বাসিন্দা অরুণ রায় জানান, তিনি পাশের বাদাঘাট বাজারে দোকানে ছিলেন। সন্ধ্যার দিকে তাঁর বাদাঘাট বাজারের দোকানে ২০ থেকে ৩০ জন লোক ঢুকে হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এর পর বাজারের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন দোকানপাট বন্ধ করে চলে যান।
তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে আমরা ভয়ের মধ্যে আছি। যে অপরাধ করেছে তার বিচার হোক, আমরাও চাই। একজনের অপরাধের জন্য যেন অন্যদের বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা যেন না হয়, সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর দেওয়া প্রয়োজন।

বাদাঘাট বাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক হারুন মিয়া জানিয়েছেন, বুধবার বিকেলে ক্ষতিগ্রস্তরা এসে দোকানপাট খুলেছেন।
গ্রামের স্কুলশিক্ষক রিপন রায় জানান, এ ঘটনার পর থেকে এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন আতঙ্কে রয়েছেন। তবে এই বিষয়ে স্থানীয় কেউ আর কিছুই জানাতে পারেননি।
তাহিরপুর উপজেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক এবং বাদাঘাট কালীমন্দিরের সাংগঠনিক সম্পাদক গণেশ তালুকদার বলেন, ঘটনার পর তিনটি মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি বাদাঘাট কালীমন্দির, গড়কাটির কালীমন্দির এবং দুর্গামন্দির। এই মন্দিরগুলোর সামনে থাকা নাটমন্দিরও ভাঙচুর হয়েছে। 

তিনি জানান, মঙ্গলবার রাত ৮টায় খবর পান, বাদাঘাট কালী মন্দিরে হামলা করার চেষ্টা হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল শিকদারকে বিষয়টি অবহিত করেন। বুধবার সকালে বাদাঘাট কালীমন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, দরজার তালা নেই। কালী প্রতিমা ভাঙা এবং ভোগ মন্দিরের কাঁসার থালাবাসন কিছুই নেই। মন্দিরের অফিস কক্ষের চেয়ার-টেবিল সবই ভাঙচুর করা। 
পরে স্থানীয় সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল মন্দিরের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেছেন, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার ঘটনা যে ঘটিয়েছে, তাকে আইনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। পরে যারা মন্দির ভাঙচুর করেছেন, তারাও আইনের আওতায় আসবে।
বাদাঘাট ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি নজরুল শিকদার বলেন, রাতে বাদাঘাট কালীমন্দিরের সাংগঠনিক সম্পাদক মন্দিরে ভাঙচুর হতে পারে জানালে আমি সঙ্গে সঙ্গে ওখানে গিয়ে কাউকে পাইনি। বুধবার সকালে মন্দিরে গিয়ে অবস্থা দেখে তাহিরপুর থানার ওসিকে জানাই। 
দুপুরে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার এবিএম জাকির হোসেন অভিযুক্ত দীপ্ত রায়ের বাড়ি, দোকান, স্থানীয় মন্দিরসহ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরে বাদাঘাট বাজারে আলেম-ওলামা, হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি, বাজার কমিটি এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন।

আরও পড়ুন

×