ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬

নতুন শুরুর অপেক্ষায় টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড, বাড়ছে কর্মতৎপরতা

নতুন শুরুর অপেক্ষায় টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ড, বাড়ছে কর্মতৎপরতা
×

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২৬ | ০৭:৪৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের অন্ধকারতম ইতিহাস ২০০৫ সালে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডের ভয়াবহ বিস্ফোরণ। এই ঘটনার পর অতিবাহিত হয়েছে ২০ বছর। তবে আজও সেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের টেংরাটিলাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষ। 

এই বিস্ফোরণের ঘটনার দীর্ঘ দুই দশক পর আন্তর্জাতিক আদালতে ক্ষতিপূরণে দাবিকৃত জরিমানার চূড়ান্ত রায় এবং রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির নতুন করে গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগের মধ্যদিয়ে শ্মশানে পরিণত হওয়া ওই জনপদে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে।

২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি রাতে টেংরাটিলা গ্যাসফিল্ডে প্রথম দফায় বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনের প্রচণ্ড তাপে ওই রাতেই প্রোডাকশন কূপের রিগ ভেঙে আগুন ২০০ থেকে ৩০০ ফুট উঁচুতে উঠে যায়। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সেই আগুন ভস্মীভূত করে চার পাশ। তবে একই বছরের ২৪ জুন রাত ২টায় ঘটে দ্বিতীয় দফা ভয়াবহ বিস্ফোরণ। সে সময় নাইকোর পক্ষ থেকে লোকজনকে এলাকা ছেড়ে অন্তত তিন কিলোমিটার দূরে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। রাত সাড়ে ৩টায় দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠা আগুন প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়ায়।
দু’দফা বিস্ফোরণে সৃষ্ট এই অগ্নিকাণ্ডে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পুড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ধ্বংস হয় বড় একটি রিজার্ভ। এতে টেংরাটিলা, আজবপুর, গিরিশনগর, কৈয়াজুরি, টেংরাবাজার ও শান্তিপুর গ্রামের মানুষের ঘরবাড়ি, গাছপালা ও হাওরের ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হয়।

বিস্ফোরণের ২০ বছর পেরিয়ে গেলেও এলাকার পরিবেশ এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মাটির গভীরে মূল ছড়ায় এমন কোনো গাছ এখনও এ মাটিতে বাঁচে না। নানা রোগবালাই লেগেই আছে আশপাশের কয়েক গ্রামে। টিউবওয়েলের পানিতে সমস্যা থাকায় গ্রামবাসীকে আধা কিলোমিটার দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী আজও পাননি কাঙ্ক্ষিত ক্ষতিপূরণ। পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা গ্যাসফিল্ডটি এতদিন কেবলই হতাশার প্রতীক ছিল।

এদিকে দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সর্বশেষ ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এই বিস্ফোরণের দায়ে কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো রিসোর্সেস-এর বিরুদ্ধে ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) জরিমানার রায় দিয়েছেন আন্তর্জাতিক আদালত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তি-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আদালত (ইকসিড) ট্রাইব্যুনাল এই অর্থ বাংলাদেশকে প্রদানের নির্দেশনা দেয়। এর আগে ২০২০ সালেও একটি প্রাথমিক রায়ে নাইকোকে দায়ী করা হয়েছিল।

অপরদিকে দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত এই গ্যাসক্ষেত্রে এবার দুটি নতুন কূপ খননের পরিকল্পনাসহ বিপুল পরিমাণ গ্যাস আহরণের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ শুরু করেছে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই গ্যাসক্ষেত্রটি ছাতক পূর্ব ও ছাতক পশ্চিম নামে দুটি অংশে বিভক্ত। অগ্নিকাণ্ডে ছাতক পশ্চিম অংশের একটি স্তরের গ্যাস পুড়লেও অন্যান্য স্তর এবং ছাতক পূর্ব অংশের গ্যাস মজুত অক্ষত রয়েছে। এখানে সম্ভাব্য মজুত ২ থেকে ৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী মো. ফারুক হোসেন জানান, এখানে দুটি নতুন কূপ খননের প্রাথমিক অফিসিয়াল কাজ শুরু হয়েছে। কূপ খনন সফল হলে পুরো এলাকায় থ্রিডি সিসমিক সার্ভে (ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপ) করা হবে। সার্ভের ফলাফলে ভালো সম্ভাবনা পাওয়া গেলে পরবর্তী সময়ে আরও কূপ খনন করা হবে।
কোম্পানির ব্যবস্থাপক (সমন্বয়) মো. আব্দুর রহমান চৌধুরী জানান, বর্তমানে সেখানে থ্রিডি সিসমিক সার্ভের প্রস্তুতিমূলক কাজ চলছে। ভালো সম্ভাবনা পাওয়া গেলে দ্রুতই মূল কূপ খননের দিকে এগোনো সম্ভব হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, ২০ বছরের বঞ্চনা আর পরিবেশগত বিপর্যয়ের অবসান ঘটিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতের জরিমানার টাকা দ্রুত আদায় এবং নতুন করে গ্যাস উত্তোলন শুরু হলে এলাকার অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা স্থানীয়দের।
 

আরও পড়ুন

×